এমন তো কথা ছিলোনা না
—রফিক আতা—
হঠাৎ করেই
চারপাশে তাকিয়ে দেখি সব উধাও।
সখের বন্ধু, প্রাণের শৈশব, খেলার সঙ্গী—
সব! সব উধাও।
এমন তো কথা ছিল না।
কথা ছিলো আমরা সবে মিলে
চলবো সময়ের সাথে হাতে হাত রেখে,
কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না আমাদের।
তবে আজ কী হলো!
এই উঠান, বাড়ি, এই চেনা পথ, রথ—
বসন্তের হাওয়া, বর্ষার ঝমঝম,
হেমন্তের শিশির, শীতের কুয়াশা—
সবকিছু কেন এমন খা-খা শূন্যতায় ডুবে গেল।
কোথায় আজ শিমুল, আশিক!
কোথায় সায়মা,আর চঞ্চল শশি!
কোথায় সেই দিনগুলো—
যখন একসঙ্গে মেতে উঠতো ছোট্টবেলা,
কোলাহলের ঝড়ে ভাসতো পুরো বাড়ি।
আমরা কি তবে সত্যিই বিচ্ছিন্ন?
নাকি শুধু দূরত্ব এসেছে মাঝখানে—
শরীরের দূরত্ব, জীবনের ব্যস্ততা।
মন তো এখনো সেই উঠানে বসে
আমাদের পুরনো গল্প শুনছে,
আর চুপচাপ চোখের কোণে জমাচ্ছে
এক ফোঁটা নোনতা স্মৃতি।
রফিক আতা
ত্রিশ, বারো, পঁচিশ ইং
মঙ্গলবার।
খুব কম লেখা বা কবিতাই আছে যা লিখতে গিয়ে চোখ জোড়া ছিঁড়ে অঝোর ধারায় অশ্রু নামে। এই কবিতাটি ঠিক তেমনি একটি। লিখতে লিখতে আমি যেন হারিয়ে গেলাম এক অচেনা সময়ের গভীরে—যে সময়টা আমার ছিল, আমাদের ছিল, কিন্তু এখন শুধু স্মৃতির পাতায় বন্দি।
পুরো শৈশবটা যেন হঠাৎ চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। দেখতে পেলাম সেই উঠানে দৌড়ে বেড়ানো আমাদের ছোট্ট ছোট্ট পায়ের ছাপ, শুনতে পেলাম হাসির কলরোল, চিৎকার, ডাকাডাকি—যেন বাতাস এখনো সেই শব্দগুলো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য আমি আবার ছোট হয়ে গেলাম। সেই ছোট্ট রফিক, যার পকেটে দুটো কাঁচা আম আর একটা ছেঁড়া ঘুড়ি। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে দেখি—কেউ নেই। কেউই নেই।
আমি ডাক দিলাম—
“শিমুল! আশিক! সায়মা! শশি!”
ডাকটা উঠানে উঠানে ঘুরে, গাছের পাতায় পাতায় লেগে, পুরনো বাড়ির দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে শেষে আমার কানেই ফিরে এল। প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল। যেন বলছে, “আমরাও তোমায় খুঁজছি।”
চোখ বন্ধ করলে এখনো দেখি—বর্ষার দিনে আমরা সবাই মিলে কাগজের নৌকা ভাসাচ্ছি নর্দমায়, বসন্তে শিমুলের লাল ফুল কুড়োচ্ছি, শীতে আগুন জ্বালিয়ে গল্প করছি। কিন্তু চোখ খুললেই শুধু শূন্যতা। একটা গভীর, ঠান্ডা, নিঃসঙ্গ শূন্যতা।
এই কবিতা লিখতে গিয়ে বুঝলাম—আমরা কখনো বড় হই না সত্যিকারের। শরীর বড় হয়, দায়িত্ব বাড়ে, দূরত্ব বাড়ে, কিন্তু মনের ভিতরে সেই ছোট্ট বাচ্চাটা থেকে যায়। সে এখনো উঠানে বসে অপেক্ষা করে—যদি কেউ ফিরে আসে, যদি কেউ হাত ধরে বলে, “চল, আবার খেলি।”
কিন্তু কেউ আসে না।
শুধু আসে একটা হালকা হাওয়া, যার মধ্যে মিশে থাকে পুরনো হাসির গন্ধ।
আর আমি চুপচাপ বসে থাকি, চোখের কোণে জমিয়ে রাখি সেই নোনতা স্মৃতির ফোঁটাগুলো—যেগুলো কখনো শুকোয় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।