শৈশবের দরদমাখা গদ্য
‘রঙিন মখমল দিন’ নিয়ে কিছু কথা
—রফিক আতা—
হিমেল, হেমন্তময় ডিসেম্বরের এই প্রথম বিকেলটা কীভাবে পাড়ি দেব— ভেবে পাচ্ছিলাম না। ভাবতে ভাবতেই মনে পড়লো বর্ষার কোনো এক মধ্যাহ্নে সংগ্রহ করা এক নান্দনিক বইয়ের নাম— “রঙিন মখমল দিন”। শৈশব-নির্ভর এই অনবদ্য আত্মজীবনী’র রচয়িতা সময়ের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও অনন্য গদ্যশৈলীর জাদুকর— মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ।
বইটির নামলিপিতে কাজি যুবাইর মাহমুদ তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন—
“তিনি ম্যাগাজিনের পাতায় উঠে এলেন সম্পূর্ণ নতুন এক গদ্যশৈলী নিয়ে— অন্যরকম, একেবারেই আনকোরা। ইসলামি ধারার সাহিত্যে যেন এক নতুন বিপ্লবের ইশতেহার। প্রচলিত আটপৌরে গদ্যকে সরিয়ে প্রকাশোন্মুখ ভাষাকে দিলেন কোমল ও দরদি এক রূপ। শুধু চিন্তায় নয়, প্রকাশভঙ্গিতেও বিদ্ধ করলেন পাঠকের হৃদয়। ইসলামি ধারার যে অল্প কয়েকজন লেখক নতুন রেনেসাঁর সূচনা করেছেন— শরীফ মুহাম্মদ তাঁদের অন্যতম।”
সাহিত্যচর্চার এই সুবাতাসময় সময়ে শরীফ মুহাম্মদকে না চেনে— এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কেউ যদি থেকে থাকেন, অন্তত এখান থেকে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও অবস্থানের এক ঝলক নিশ্চয়ই দেখে নিতে পারবেন।
এবার বইটার প্রসঙ্গে আসি। ডিসেম্বর মানেই শৈশবের হাসি-খেলাভরা স্মৃতি, মধুর কোলাহল ও বেদনার দীর্ঘ ছায়া— এমনই এক মুহূর্তে “রঙিন মখমল দিন” যেন স্মৃতির অবারিত রোমন্থন; শান্তির হিল্লোল।
প্রথম বইটি দেখি এক সহপাঠীর স্টাডি টেবিলে। নামেই ছিল এক অদ্ভুত সম্মোহন। হাতে নিতেই পড়তে শুরু। প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি বাক্যে—অবাক হয়ে দেখি, নিজের শৈশবেরই প্রতিচ্ছবি। ছোট ছোট শব্দ, মেদহীন বাক্য— যেন ভাষার ভাঁজেই শৈশবের ডাক।
মাকতাবায় অর্ডার দিলে তারা বইটি আমাকে ঢাকা থেকে কুরিয়ার করে দেয়। সেই বই নিয়েই আজকের এই বিকেল। আমার ভাঙা কলমে এই বইকে নিয়ে রিভিউ লেখা— নিঃসন্দেহে দুঃসাহসের ব্যাপার। তাই বরং বইটির ফ্ল্যাপ কপি থেকে সালাহউদ্দিন জাহাঙ্গীরের অসামান্য কলামের উদ্ধৃতি রাখাই শ্রেয়—
“অনন্য গদ্যশৈলীর জাদুকর শরীফ মুহাম্মদ লিখেছেন তাঁর মখমল রঙিন শৈশবের আত্মজীবন। স্মৃতি হাতড়ে তুলে এনেছেন ফেলে আসা জীবনের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, স্বপ্ন-উৎকণ্ঠা। দরদে তড়পানো এক ঘোরলাগা গদ্যে বয়ান করেছেন সব, দুরন্ত শৈশবের সকল কিছু। ব্যক্তিত্বের আড়ালে ঘুমিয়ে থাকা এক শিশু খলবলিয়ে কথা বলেছে স্মৃতির বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
অতীতের রেহালে স্মৃতি সাজিয়ে একে একে বলে গেছেন তাঁর মায়ার শহর ময়মনসিংহের রোদেলা সকাল, ঘুরন্ত শহরের অলি-গলি, প্রথম পাঠ, পড়ালেখার জন্য ঢাকায়, মায়ের বিরহে আত্মরোদন, টুকরো প্রেম, কিংবদন্তির সাক্ষাৎ এবং আলো হাতে ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর এক সদ্যকিশোরের জীবনযাপন।
এ যেন কিছুটা আত্মজীবন, অনেকটা শৈশব...!
শরীফ মুহাম্মদ-এর মখমলরঙা শৈশবে আপনাকে স্বাগতম!”
এই উদ্ধৃতিই বইটির পূর্ণ পরিচয় নির্দেশ করে। এর বাইরে আর কিছু যোগ করার প্রয়োজন বোধ করছি না।
—নিচে আমি তুলে ধরবো সেইসব অংশ, যেগুলো প্রথম পাঠেই হৃদয় তোলপাড় করে দিয়েছে; যেখানে বিস্তৃত হয়ে উঠেছে বইটির প্রকৃত রূপ—শৈশবের ঝরনাধারার মতোই।
❑ভয় ভয় মন—
লাল ইটের লম্বা দালান। বাসা থেকেই দেখা যেত। উঁচু সীমানাপ্রাচীর। জেলখানা। ছোট্ট বাঁশঝাড়ের পর সারি সারি ধানখেত। তারপরই জেলখানা। আমাদের কাছে রহস্যজগৎ। ভেতরে কী আছে, জানি না। কোনো দিন ঢুকিনি। ছোট্টকালের মন। শিশুচিন্তার দিন। জেলখানায় চোর থাকে। অনেক চোর। চোরদের ধরে ধরে এনে জেলখানায় রাখা হয়। চোর দেখতে কেমন? চোরেরা কি মানুষের মতো! চোরেরা কি বাঘ-ভালুক কিংবা বানরের মতো! মানুষের কাছাকাছি চেহারার কোনো জন্তু! অদ্ভুত কল্পনার জাল! অদ্ভুত ভাবনার ভয়! চোর যদি সামনে চলে আসে! কী হবে তখন! কত বড় বিপদ!
(রঙিন মখমল দিন—৩৭)
❑কিছু দৃশ্য কিছু সুর—
নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালে মন থেমে যেত। ওপারে ছিল চর। ধু ধু মাঠ। ঘরবাড়ি, গাছপালা কিছুই ছিল না। বহু দূরে গাছের সবুজ। অন্ধকার সবুজের সারি। আকাশ সেখানে নেমে এসেছে। ঘাটে বড় নৌকা। এপার-ওপার করছে মানুষ। মানুষগুলো চরে গিয়ে কোথায় তাদের বাড়িতে উঠছে? মনে জমত আকুল করা প্রশ্ন। ওই পারে কি বাড়িঘর আছে? দূরে কোথাও? কতটুকু দূরে? কাউকে জিজ্ঞেস করা হতো না। মনে হতো, ওই তো শেষ। যেখানে আকাশ নেমে এসেছে। যেখানে সবুজের কালো সারি। এরপর আর কিছু নেই। কোনো বাড়িঘর নেই। বসতি নেই। দেশের সীমানা শেষ! দুনিয়ার সীমানা শেষ! এরপর অন্য কিছু। ওপারের চরকেই মনে হতো অন্তহীন এক সীমানা। কাউকে জিজ্ঞেস করার দরকারই মনে হতো না। নিজে নিজেই শেষের হিসাব মিলিয়ে বসে থাকতাম। নদীর পাড়ে এলেই মনে হতো, শেষ প্রান্তে চলে এসেছি।
(রঙিন মখমল দিন—৪৬)
❑শিউলির ঘ্রাণে ঘ্রাণে—
আমরা যখন শিউলি কুড়াতে থাকতাম, তখনো একটি-দুটি করে ফুল ঝরে পড়তে থাকত। ঘাসের ওপর শিউলি পড়ার কি কোনো শব্দ হতো? আমার মনে হতো 'টুপ' করে যেন একটা শব্দ হতো। ঘাসের সঙ্গে ফুলের ঘষা লাগার শব্দ। এক হাতে 'টোনা' ধরে রাখতাম। অন্য হাতে ফুল কুড়াতাম। মাঝে মাঝে নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ শুঁকতাম। এরপর বাসায় ফুলগুলো রেখে মক্তবে ছুটতাম। মক্তব থেকে ফিরে এসে দেখতাম, সব শিউলি নেতিয়ে গেছে। পেছনের হলুদ ডাঁটাটা ঠিক আছে। কিন্তু ছোট্ট ধবধবে পাপড়িগুলো পানসে হয়ে গেছে। ঘ্রাণটাও যেন বদলে গেছে। চেনা দৃশ্য। প্রতিদিনই দেখা যেত। কিন্তু যখনই এ দৃশ্যটা দেখতাম, মনটা কেমন করে উঠত। তবে সেটা কিছুক্ষণের জন্যই। এতে মোটেও দমে যেতাম না। পরদিন ভোরে আবার শিউলিতলায় ছুটতাম।
(রঙিন মখমল দিন—২০)
কি লিখেছেন! কোন কলমে এঁকেছেন!
কোন মনের জ্যোতি তুলে ধরেছেন লেখক! এমন স্বর্ণ-শব্দের সুষমিত সিঁড়ি—যার প্রতিটি ধাপে উঠলে হৃদয় থমকে দাঁড়ায়, ওঠে ভাবনার ঢেউ, মন মুগ্ধতার সুরে দুলতে থাকে। শৈশবের নির্মল উল্লাস, প্রথম ভয়ের আঁচ, আবিষ্কারের আলো-ছায়া, আর বিস্ময়ে ভেজা অচেনা সকাল। শিশুকালের সরল স্মৃতি আর নির্মল অনুভূতির এমন উপস্থাপনা—প্রশংসার ভাষা এখানে এসে সত্যিই থমকে যায়।
প্রিয় পাঠক! শিরোনামগুলো নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন?
“ভয় ভয় মন”, “কিছু দৃশ্য কিছু সুর”,
“শিউলির ঘ্রাণে ঘ্রাণে”, “ঈদের পদধ্বনি”,
“মুগ্ধতার নতুন ঘোর”—
কতোটা নান্দনিক প্রতিটি নাম! একবার নীরবে উচ্চারণ করে দেখুন—দেখবেন দেহ পুলকিত হয়, হৃদয় শিহরিত হয়ে ওঠে।
পুরো বই জুড়েই যেন লেখক তাঁর রঙিন শৈশবকে আঁকছেন আপনমনে—হৃদয়ের তাপ ও উত্তাপ মেখে, স্বপ্নের আলিঙ্গন রেখে, সরল অথচ হৃদয়ছোঁয়া গদ্যে।
প্রিয় পাঠক!
চাইলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন শরীফ মুহাম্মদের রঙিন মখমল দিন থেকে। মনে রাখবেন—শৈশবের স্মৃতি কখনো হারায় না, শুধু লুকিয়ে থাকে হৃদয়ের গভীরে। রঙিন মখমল দিন সেই লুকোনো দরজাটাই খুলে দেয় নিভৃতে। লেখক তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার গল্প বলতে বলতে আমাদেরও ফিরিয়ে নিয়ে যান নিজেদের ভোর, নদীর পাড়, ভয়-ভরা কৌতূহল আর শিউলির সুগন্ধে ভেজা সেই দিনগুলোর কাছে। সরল শব্দে আঁকা সেই স্মৃতিলেখা পাঠশেষে মনে হয়—আহা! শৈশব তো এমনই ছিল।
যদি কখনো মনে হয়, জীবনে আপনি অতিরিক্ত বড় হয়ে গেছেন, তাহলে এই বই আপনাকে আবার ছোট করে দেবে। ফিরিয়ে নিবে—
মায়ায়, স্মৃতিতে, শৈশবে।
পাঠানুভূতি—
এক, বারো, পঁচিশ ইং!!
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।