ফুরাবে বসন্ত, ফুরবে না ব্যথার দহন—
— রফিক আতা—
এক সময়ের বাগানবিলাসী গেটফুল গাছটি এখন আর নেই। কোনো এক বসন্তের পাতা ঝরা দিনে মাহিনকে ছেড়ে বিদায় নিয়েছিল সে-ও।
সেই গিয়ার সাইকেল—যা নিয়ে গ্রামের আঁকাবাঁকা পথে কত শত অপরাহ্ন পার করেছে মাহিন। আজ তা পড়ে আছে ধুলো জমে, পেছনের পুরনো ঘরে। যেখানে এখন কেবল মাকড়সার জাল আর নীরব কোলাহল।
সাইকেলটি কেনার জন্য কতদিন বাবার সঙ্গে রাগারাগি করেছিল মাহিন। অভিমানে কত বেলা ভাত না খেয়ে থেকেছিল মায়ের ওপর রাগ ঝেড়ে। বাবা বলেছিলেন—
“বেতনের টাকা হাতে পেলেই তোকে সাইকেল কিনে দেব।”
কিন্তু মাহিন মানেনি। সে বলেছিল—
“আমার সব বন্ধু সাইকেলে করে স্কুলে যায়, আমি কেন হেঁটে যাব?”
এদিকে মদি দোকানের বাকির খাতার ভার প্রতিদিন বাবাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। একদিকে ছেলের সাইকেলের চাপ, অন্যদিকে দোকানির তাগাদা। কিন্তু সেসব নিয়ে চিন্তার সময় কোথায় মাহিনের?
যাকগে সে কথা! অভিমান করার জন্য সেই মা, রাগ দেখানোর জন্য সেই বাবা—আজ আর কেউ বেঁচে নেই। কেবল ব্যথা জিইয়ে রেখেছে তাদের স্মৃতি।
সংসারের টানাপোড়েন দেখে একদিন মা টিকতে পারলেন না। দাদির রেখে যাওয়া একটি অলংকার—যা ছিল পারিবারিক উত্তরাধিকার, জাহানারা বেগমের শেষ স্মৃতি—অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিক্রি করে দিলেন। সেই টাকা দিয়ে বাবার নাম কাটা গেল মদি দোকানের বাকির খাতা থেকে, আর বাকি অংশে কেনা হলো মাহিনের সেই কাঙ্ক্ষিত সাইকেল।
কারণ মা জানতেন, বাবার সামান্য বেতনে না সাইকেল কেনা সম্ভব, না হালখাতার দেনা শোধ করা।
কিন্তু বাবার কষ্ট, মায়ের ত্যাগ—তার প্রতিদান দিতে পারলো না মাহিন। ধীরে ধীরে খারাপ সঙ্গের অন্ধকারে তলিয়ে গেল। দিনদিন নেশার জগতে ডুবে যেতে লাগলো। রাত গভীর হলে ফিরতো, কখনো নেশাগ্রস্ত, কখনো অশালীন সঙ্গ নিয়ে।
বাবা একদিন ডাকতে গিয়েছিলেন, উত্তরে পেয়েছিলেন ছেলের হাতের আঘাত। মা বাধা দিয়েছিলেন, তাই নিষ্ঠুরভাবে ধাক্কা খেয়েছিলেন। চোখের সামনে আদরের ছেলেটাকে অন্ধকারে হারাতে দেখেও বাবা-মা অসহায় ছিলেন।
এক রাতে অফিস থেকে ফিরে হঠাৎ বাবার শরীরে চাপ বেড়ে গেল। প্রেশার, সঙ্গে হার্টের ব্যথা। বিছানায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি। তখন মাহিন ছিল না ঘরে। একা মা অনেক চেষ্টা করেও গাড়ি পেলেন না। সেভাবেই বাবার শরীর নিথর হয়ে গেল।
বাবার মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেন মা। অথচ সান্ত্বনা দেবার মতো পাশে ছিল না একমাত্র সন্তানটিও। স্বামীর শোকে ক্ষতবিক্ষত হৃদয় নিয়ে কিছুদিন পর তিনিও নিভে গেলেন।
যখন খবর এলো—মা নেই—তখনই যেন ঘোর কাটলো মাহিনের। ছুটে এসে দেখলো, মায়ের নিথর দেহ পড়ে আছে মেঝেতে। সেই দেহ বুকে চেপে ধরলো, কিন্তু কান্না এল না। কেবল শুকনো চোখে, ভেতরে ভেতরে ভাঙতে লাগলো।
এগুলো এখন বহু আগের ঘটনা। তখন বসন্তকাল ছিল। বাবা-মা দু’জনকেই হারালো মাহিন বসন্তেই। তারপর একে একে ফুরিয়েছে আরও বারোটি বসন্ত।
২০২৫ সাল। এখন মাহিন প্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ। ভালো চাকরি করেছে, সংসার গড়েছে, সন্তান হয়েছে। তবু হঠাৎ একদিন তার ইচ্ছে হলো, ফিরে যাবে সেই পুরনো জরাজীর্ণ ঘরে—যেখানে তার শৈশব, বাবা-মায়ের স্মৃতি গাঢ় হয়ে আছে।
ঘরে ঢুকে কোণে পড়ে থাকা সেই পুরনো সাইকেলটির কাছে গেল মাহিন। হাঁটু গেড়ে বসলো। হঠাৎ করেই ফেটে পড়লো অঝোর কান্নায়—আকাশ প্রকম্পিত করা চিৎকার।
শব্দ শুনে ছুটে এলো স্ত্রী-সন্তান।
“আব্বু! কী হয়েছে? তুমি কাঁদছ কেন?” —বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো ছেলে।
মাহিন তখন বিড়বিড় করে বলতে লাগলো—
“আমিই আমার বাবা-মাকে হত্যা করেছি। আমিই তাদের মেরেছি… হ্যাঁ! আমিই তাদের হত্যাকারী…”
তখন বসন্তকাল ছিল। বাবা-মায়ের মৃত্যুতে সেই বসন্ত ফুরিয়ে গিয়েছিল। এরপর একে একে বারোটি বসন্ত চলে গেছে। এখনো ২০২৫-এর বসন্ত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মাহিনের হৃদয়ে জেগে থাকা ব্যথার ঝড় ফুরোয়নি। সে জানে—আরো শত শত বসন্ত ফুরাবে, কিন্তু তার বুকে বয়ে চলা দহনের আগুন কোনোদিন নিভবে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।