ঘরে ফেরার আগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাত সাড়ে দশটা। অফিস শেষ হয়েছে অনেক আগে। লোকটা বাসার সামনে গাড়ি থামিয়ে বসে আছে। ইঞ্জিন বন্ধ। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। নামছে না।
বাসায় তার স্ত্রী আছে। সন্তান আছে। নিজের বিছানা আছে। যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গাও নেই। তবু আরও কয়েক মিনিট গাড়ির ভেতর বসে থাকাটাই তার কাছে স্বস্তির।
কারণ সে জানে, দরজা খুললেই হয়তো সেই চেনা কথাগুলো শুরু হবে।
‘আবার ফোন ধরোনি? কার এত দরকার পড়ল?’
‘এত দেরি হলো কেন?’
‘টাকাগুলো কোথায় খরচ করলে?’
কথাগুলো আলাদা করে খুব বড় কিছু নয়। সংসারে রাগারাগি হয়, অভিমান হয়, প্রশ্নও ওঠে। কিন্তু একই সন্দেহ, একই জেরা আর একই রাগ যখন দিনের পর দিন ফিরে আসে, তখন কথাগুলো আর শুধু কথা থাকে না। মানুষ নিজের আচরণ নিয়ে হিসাব করতে শুরু করে।
কখন বের হবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কতক্ষণ বাইরে থাকবে—সবকিছুর আগে মনে হয়, বাড়ি ফিরে এর ব্যাখ্যা কী দিতে হবে।
একসময় নিজের ঘরেই মানুষ সাবধানে হাঁটতে শেখে।
পুরুষের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও কঠিন। ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো হয়, পুরুষ মানে দায়িত্ব। আয় করবে, সংসার চালাবে, সন্তানের খরচ দেবে, বাবা-মায়ের পাশে থাকবে। স্ত্রী রাগ করলে সামলাবে, সন্তান বিপদে পড়লে পথ দেখাবে।
কিন্তু সেই মানুষটির নিজের ক্লান্তি কোথায় যাবে, এই প্রশ্নটা খুব কমই করা হয়।
সে যদি বন্ধুকে বলে, ‘আমার সংসারে শান্তি নেই’, উত্তর আসে, ‘সংসারে এসব থাকেই।’
কেউ বলে, ‘বউকে একটু সময় দাও।’
আর কেউ বলে, ‘সন্তানের জন্য মানিয়ে নাও।’
এই শেষ কথাটাই অনেক পুরুষকে বছরের পর বছর একই সংসারে রেখে দেয়।
সন্তানের জন্য।
একজন বাবা হয়তো বুঝতে পারেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা অনেক আগেই বদলে গেছে। কথা হয় প্রয়োজনের জন্য। একই ঘরে থাকা হয় অভ্যাসে। একসঙ্গে বসে খাওয়ার সময়ও দুজনের মন থাকে অন্য কোথাও। অনেক দিন কোনো আন্তরিক স্পর্শ নেই, নেই একে অন্যের কাছে মনের কথা বলার আগ্রহ।
তবু বিচ্ছেদের কথা ভাবলেই সন্তানের মুখটা সামনে আসে।
সন্তান কার সঙ্গে থাকবে? বাবাকে কি আগের মতো পাবে? স্কুলে কেউ কিছু বলবে না তো? আত্মীয়রা কী বলবে? সন্তান কি একদিন বাবাকেই দায়ী করবে?
তাই সে থেকে যায়।
এক বছর। দুই বছর। পাঁচ বছর।
তারপর একদিন বুঝতে পারে, সংসারটা সে আর সুখের জন্য টেনে নিচ্ছে না। টেনে নিচ্ছে দায়িত্বের জন্য।
সকালে অফিস। সন্ধ্যায় বাসা। মাস শেষে বেতন। বাজারের ব্যাগ। সন্তানের স্কুলের খরচ। বিদ্যুৎ বিল। ওষুধের খরচ।
সবকিছু চলছে।
শুধু মানুষটা আগের মতো নেই।
তবে সম্পর্কের অশান্তি সব সময় একপক্ষের কারণে হয় না; কিন্তু নিয়মিত অপমান, অকারণ সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ আর ভয়কে স্বাভাবিক দাম্পত্য বলে মেনে নেওয়ারও কোনো কারণ নেই।
কাউকে ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রতিদিন বড় কোনো ঘটনা লাগে না।
কখনো একটা প্রশ্নই যথেষ্ট।
‘কার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছিলে?’
কখনো একটা মন্তব্য।
‘আজকাল তোমার বাইরে থাকতেই ভালো লাগে।’
তারপর মানুষটা বদলাতে শুরু করে। অফিস শেষে বন্ধুর সঙ্গে চা খাওয়া কমে যায়। কোথাও যাওয়ার আগে ফোন করার কথা মনে পড়ে। ফোন বাজলে ধরার আগে কয়েক সেকেন্ড পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাসায় ফেরার সময় অকারণে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে।
বাইরে থেকে এসব ছোট পরিবর্তন।
কিন্তু দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ছোট থাকে না। ঘুম নষ্ট হয়, কাজে মন বসে না, নিজের শরীরের যত্ন কমে যায়। কেউ ধূমপান বাড়িয়ে দেয়, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দেয়, কেউ মানুষের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
তবু মুখে বলে,
‘কিছু না।’
কারণ সন্তান যেন কিছু বুঝতে না পারে।
একজন বাবা অনেক সময় নিজের সুখের চেয়ে সন্তানের নিরাপত্তাকে বড় করে দেখেন। তিনি ভাবেন, আমি সহ্য করি। আমার কষ্টে অন্তত সন্তানের জীবনটা যেন না বদলায়।
কিন্তু শিশুরা ঘরের সব কথা না বুঝলেও ঘরের পরিবেশ বুঝতে পারে। বাবার চুপ হয়ে যাওয়া, মায়ের রাগ, দুজন মানুষের একসঙ্গে থেকেও আলাদা হয়ে থাকা—এসব তাদের চোখ এড়ায় না।
তাই শুধু একই ছাদের নিচে থাকা মানেই সন্তান একটি সুস্থ পরিবারে বড় হচ্ছে, এমন নয়।
আবার সম্পর্ক ভেঙে ফেললেই সব সমস্যার সমাধান হবে, সেটাও নয়।
সমাধান অনেক সময় শুরু হয় আরও আগে। দুজন মানুষ যখন একে অন্যকে প্রতিপক্ষ না ভেবে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখে। রাগের সময় একটু থামে। সন্দেহ হলে অপমান না করে প্রশ্ন করে। ‘তুমি এমনই’ না বলে বলে, ‘তোমার এই কথাটা আমাকে কষ্ট দিয়েছে।’
সংসার শুধু দায়িত্বের হিসাব নয়। সেখানে শান্তিতে থাকার জায়গাটাও থাকতে হয়।
কারণ মানুষ একদিনে ক্লান্ত হয় না। দিনের পর দিন জমে থাকা অস্বস্তি, না-বলা কথা, সন্দেহ, অপমান আর একাকিত্ব একসময় তাকে নিজের ভেতরেই গুটিয়ে দেয়।
তারপর সে আর ঝগড়া করে না।
আমরা ভাবি, সংসারে শান্তি ফিরেছে।
আসলে সে হয়তো শুধু কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে।
রাত সাড়ে দশটার সেই মানুষটিও শেষ পর্যন্ত গাড়ি থেকে নামবে। দরজা খুলে ঘরে ঢুকবে। হয়তো সন্তানের ঘরে একবার উঁকি দেবে।
তারপর প্রশ্ন আসবে,
‘এত দেরি করলে কেন?’
সে বলবে,
‘জ্যাম ছিল।’
হয়তো সত্যিই রাস্তায় জ্যাম ছিল।
কিন্তু তার ভেতরে জমে থাকা ক্লান্তির কোনো নাম নেই।
তারপরও সে থাকবে।
হয়তো সন্তানের জন্য।
হয়তো এই আশায়, একদিন ঘরটা আবার এমন হবে, যেখানে ফিরতে তার ভয় করবে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।