রেপিং পেপারে মোড়ানো উপহার
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরনঃ ছোটগল্প
তারিখঃ ২৮ অক্টোবর ২০১৮
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ করে। জানালার কাচে ছোট ছোট ফোঁটা জমে আছে—
যেন কারও অজান্তে কেঁদে ফেলা চোখের জল শুকিয়ে গিয়ে দাগ রেখে গেছে।
সিসিইউ-র হালকা আলোয় শুয়ে আছে অভিক। মুখে রঙ নেই, শরীরে প্রাণের আভাসটুকু যেন টিমটিম করে জ্বলছে।
মনিটরের প্রতিটা টিক শব্দ এখন তার নিঃশ্বাসের মতো—
একটা যায়, একটা আসে… তবু জীবন এগোয় না।
সকালে আসে নিশি। সঙ্গে দুই মেয়ে।
ছোটটি, পরী, চুপচাপ মায়ের আঁচল আঁকড়ে থাকে।
তার চোখে একরকম ভয়—যে ভয়টা শব্দে বোঝানো যায় না,
শুধু অনুভব করা যায় বুকের গভীরে।
অভিক কষ্টে বলে,
“হাসপাতালের খরচই সামলাতে পারছি না, নিশি… ডাক্তার বলেছে এনজিওগ্রাম করতে হবে। এত টাকা কোথা থেকে আনব?”
নিশি চুপ করে থাকে।
চোখদুটো শুধু তাকিয়ে থাকে অভিকের দিকে—
সেই দৃষ্টিতেই যেন আছে সব প্রশ্ন, আবার সব উত্তরও।
দুপুরে সে মেয়েদের নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়।
করিডোরে তখনও বৃষ্টির গন্ধ লেগে আছে—
একটা অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা, যা হাসপাতালের দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ে।
রাতে অভিক ফোনে ফেসবুক খুলে পোস্ট দেয়।
নিজের জীবনের জন্য… একটু সাহায্যের আবেদন।
কমেন্টে আসে অসংখ্য শব্দ—
সহানুভূতি, প্রার্থনা, ‘আল্লাহ ভরসা’ টাইপের কথাবার্তা।
কিন্তু কেউ হাত বাড়ায় না।
রাত বাড়ে। হঠাৎ মনিটর বেজে ওঠে জোরে।
ডাক্তাররা আসে, ইনজেকশন দেয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই সব আবার নিঃশব্দ।
তখন অভিকের ফোনে হালকা ভাইব্রেশন।
কষ্টে হাত বাড়িয়ে ফোনটা তোলে।
“হ্যালো…”
ওপাশে এক কোমল কণ্ঠ,
“ভাইয়া, আমি অনিমা। আপনার পোস্টটা দেখেছি… কেমন আছেন এখন?”
অভিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “ভালো নেই।”
“ভাইয়া, আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টটা দিন। একটু সাহায্য পাঠাতে চাই।”
অভিক কিছু না ভেবেই নম্বরটা পাঠিয়ে দেয়।
তার বুকের ভেতর ছোট্ট এক আলো জ্বলে ওঠে—
যেন কেউ অন্ধকার ঘরে এসে নিঃশব্দে হাত রাখল কাঁধে।
পরের দিন সে অপেক্ষা করে।
তারপর আরেক দিন।
টাকাটা আসে না।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে ভাবে,
মানুষের কাছে শব্দ কত সহজ,
কিন্তু সহানুভূতির ভেতর হাত বাড়ানোটা কত কঠিন।
শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরে আসে অভিক।
ডাক্তার বলেছে—ওপেন হার্ট সার্জারি ছাড়া বাঁচার উপায় নেই।
কিন্তু সেই সার্জারির খরচ তার কাছে যেন কোনো কল্পলোকের মতো দূরের কিছু।
রোজা চলছে।
ছোট মেয়ে পরী বলে,
“আব্বু, এবার ঈদে আমার জামা লাগবে না।”
অভিক কিছু বলে না। শুধু তার গলা ভার হয়ে আসে।
জানালার বাইরে চাঁদ উঠছে, কিন্তু আলোটা যেন ঘরে ঢোকে না।
রাতে আবার ফোন আসে।
ওপাশে সেই পরিচিত কণ্ঠ, অনিমা—
“ভাইয়া, মন খারাপ করবেন না। আপনার মেয়েদের জন্য জামা কিনেছি।
রেপিং পেপারে মুড়ে রেখেছি… কাল পাঠাব।”
অভিকের চোখে জল এসে যায়।
ছোট মেয়েকে ডেকে বলে,
“মা, কাল তোমার নতুন জামা আসবে।”
কিন্তু পরের দিন যায়, আরেক দিনও।
কিছু আসে না।
ঈদের আগের রাত—শহরজুড়ে আলো, দোকানে ভিড়, বাচ্চাদের হাসি।
অভিকের ঘরে শুধু নীরবতা।
নিশি জানালার পাশে বসে আছে,
পরী চুপচাপ তার কোলে মুখ গুঁজে।
ওদের ঘরে নেই কোনো জামা, নেই কোনো শব্দ,
শুধু অপেক্ষা।
অভিক জানে—এই সমাজে মানুষ দুঃখে সহানুভূতি দেয়,
কিন্তু সাহায্যের হাত খুব কম বাড়ায়।
রেপিং পেপারে মোড়ানো উপহার হয়তো আসে,
কিন্তু সেগুলো কেবল প্রতিশ্রুতির রঙ—ভালোবাসার নয়।
আজও অভিক সেই প্যাকেটটার অপেক্ষায়।
হয়তো আসবে না কখনও।
তবু তার মনে একটুখানি আলো রয়ে গেছে—
যে আলো নিভে না সহজে।
আমি যখন এই গল্পটা লিখছি,
অভিক তখন জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে ভাসছে
শান্ত মুখে, নীরব চোখে।
হয়তো সে জানে,
সব উপহার আসে না…
তবু অপেক্ষা করাটাই সবচেয়ে মানবীয় কাজ।
#রেপিং_পেপারে_মোড়ানো_উপহার #মানবিক_ছোটগল্প #নিশি_ও_অভিক
#বাবা_ও_মেয়ের_বন্ধন #অসহায়তার_বেদনা
#জীবনের_ছায়া #মোহাম্মদ_জাহিদ_হোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।