জীবনের নতুন অধ্যায়
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বাস্তব কাহিনী
| ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
৯ ফেব্রুয়ারি ২০১২। সে দিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। অফিসে গেলাম, কাজ চলছিল স্বাভাবিক গতিতে। দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে হঠাৎ বুকের বাঁ দিকে একটা অচেনা, চাপা ব্যথা অনুভব করলাম। প্রথমে মনে হলো গ্যাসের সমস্যা হয়েছে বোধহয়। দুপুরের খাবার খেলাম—সবজি আর মাছ। পেট ভরল, কিন্তু বুকের অস্বস্তি কমল না, বরং বাড়তে লাগল। ওষুধের দোকান থেকে গ্যাসের ট্যাবলেট কিনে খেলাম, কোনো লাভ হলো না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, তবু নিজেকে বোঝালাম সব ঠিক হয়ে যাবে। সারাদিন এভাবেই কাটল। বিকেলে সামান্য নাস্তা করলাম, কিন্তু ব্যথা তখনো অটুট।
সন্ধ্যায় গুলশান থেকে বাসার দিকে রওনা দিলাম। রাস্তায় ভয়ানক যানজট, ধুলোবালি। গাড়ির এসি পুরোদমে চললেও শরীর ঠান্ডা হচ্ছিল না। সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাসায় পৌঁছলাম। ভাবলাম গোসল করলে হয়তো আরাম পাব। গোসল করলাম, এসির ঘরে এলাম—কিছুই হলো না। বরং বুকের ব্যথা ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠল, সারা শরীর দিয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল। ছোট ভাইকে খবর দিলাম। সে গ্যাসের লিকুইড নিয়ে এলো, তার ধারণা এটা গ্যাসের ব্যথা। খাটে বসে ছিলাম। তার ডাকে পা বাড়াতে গিয়ে দেখি পা দুটো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। কিছুতেই নড়াতে পারছি না। ধীরে ধীরে ঘাড়ও শক্ত হয়ে আসছে, ঠোঁট কাঁপছে। নিজের ভেতরে একটা অজানা আতঙ্ক জন্ম নিল।
এত কিছুর মাঝেও স্ত্রী পুরোপুরি নির্বিকার। সে বুঝতেই পারছিল না কী হচ্ছে। তার চোখে অজানা ভয় লাল হয়ে উঠছিল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম—হাসপাতালে যেতে হবে। স্ত্রী সঙ্গে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু রাত গভীর হয়ে যাওয়ায় তাকে মেয়েদের কাছে রেখে বেরোলাম। বললাম, “মেয়েদের দিকে খেয়াল রাখো।” রাত তখন সাড়ে এগারোটা।
ছোট ভাই আর ড্রাইভার আমাকে ধরে নিচে নামাল। হাত-পায়ে কোনো শক্তি ছিল না। বাসার কাছেই প্যান প্যাসিফিক হাসপাতাল। সাত মিনিটে পৌঁছে গেলাম। বুকের তীব্র ব্যথায় দম আটকে আসছিল।
জরুরি বিভাগে ঢুকতেই ডাক্তার প্রেশার চেক করলেন। তার মুখ শুকিয়ে গেল। তারপর ইসিজি। আমার তখনো কিছুটা চেতনা ছিল। ডাক্তার ছোট ভাইকে বললেন, “বিট পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক মিনিটের মধ্যে কার্ডিয়াক সেন্টারে নিয়ে যান।” ট্রলিতে করে গাড়িতে তোলা হলো।
রাজারবাগ থেকে শাহবাগের দিকে গাড়ি ছুটল। মৎস্য ভবনের সামনে পৌঁছতেই মনে হলো সব শেষ। বুকের ভেতর কোনো রগ ছিঁড়ে গেছে যেন। মাথা ঘুরছে, পৃথিবী ঘুরছে। রাস্তার আলোগুলো দূরে সরে যাচ্ছে, শব্দগুলো দূর থেকে আসছে। চোখের সামনে সব রঙ মিলিয়ে এক ধূসর অচেনা জগৎ। তারপর সব স্তব্ধ।
এরপর যা জানি, তা স্ত্রীর মুখে শোনা। মৎস্য ভবনের পর থেকে আমার চেতনা ছিল না। রাত বারোটা তিন মিনিটে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে পৌঁছলাম। সেদিন প্রচণ্ড রোগীর চাপ। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা চলছিল। এর মধ্যে স্ত্রীও পৌঁছে গেল।
চেতনা না থাকায় জরুরি বিভাগে নেওয়া হলো। হার্টবিট পাওয়া যাচ্ছিল না। ডাক্তাররা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। আইসিইউ-সিসিইউতে সিট নেই। খালাতো বোনের জামাই হাসপাতালে চাকরি করেন—তার সহযোগিতায় জরুরি বিভাগেই একটা লাইফ সাপোর্ট বেডের ব্যবস্থা হলো।
একের পর এক শক। ছয়টা শকের পর নাকি একটু নড়েছিলাম, তারপর আবার নিস্তেজ। ডাক্তাররা বলে দিয়েছিলেন, মৃত্যুর পরের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে। আঘাতটা ছিল মেইন আর্টারিতে—ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।
হঠাৎ দূর থেকে হালকা গুনগুন শব্দ ভেসে এলো। চোখ মেলতেই আলো জ্বালা করল। ডাক্তাররা আনন্দে দিশেহারা। কেউ বলছে, “যাক, সাড়া পাওয়া গেছে!” মাথার কাছে স্ত্রী বসে। তার গড়িয়ে পড়া চোখের পানি কপালে শীতল স্পর্শ দিচ্ছে। চোখ লাল, মুখ শুকনো। সারারাত পানি ছোঁয়নি। কান্নায় ভেজা মুখে এক ফালি হাসি—দিগন্তজয়ী হাসি। তার চোখে তাকাতেই বুকের ব্যথা আবার চেতনা কেড়ে নিল।
ভোরে চেতনা ফিরল। চারপাশে অপারেশনের রোগী। সময় সাড়ে আটটা। ডাক্তার এসে বললেন, “প্রেশার অনেক হাই। তাড়াতাড়ি ওটিতে নিতে হবে।”
ট্রলিতে তোলা হলো। ওটির দিকে যেতে যেতে বাইরে ব্যাংকের সহকর্মীরা দাঁড়িয়ে। সান্ত্বনা দিচ্ছে। মুখে কিছু বলতে পারিনি—চোখের লোনা পানিই ছিল তাদের প্রতি ভালোবাসার জবাব। স্ত্রীর ফোলা লাল চোখ, মেয়ে দুটোর অঝোর ধারা—সব মিলে বুক ভেঙে যাচ্ছিল।
ওটি রুমে ঢুকলাম। বিশাল লাইট, সাজানো যন্ত্রপাতি। পায়ে ইনজেকশন, তারপর অজ্ঞান। অজ্ঞানের আগে পায়ে গরম কিছু টের পেলাম—রক্ত বেরোচ্ছে।
পরে জানলাম, রিং লাগানো হয়েছে। তারপর সিসিইউ। কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম জানি না। হঠাৎ কপালে শীতল স্পর্শে চোখ মেললাম। ছোট মেয়ে (তখন ১১ বছর) হাত বুলিয়ে দাঁড়িয়ে। তার ছলছল চোখ।
সেই মুহূর্তে প্রথম বুঝলাম শর্তহীন ভালোবাসা কী। বেঁচে থাকার আকুলতা গ্রাস করল। আঁধার ঠেলে নতুন সোনালি দিনের উদয় হলো। হিমবাহ গলে নদী হয়ে উঠল ভালোবাসার রসায়নে। তার চোখের জলে শুকনো পাতায় আগুন জ্বলে, পুড়ে গেল মৃত্যুর অহংকার।
এটাই জীবনের নতুন অধ্যায়।
যে অধ্যায়ে বোঝা যায়—বেঁচে থাকা কোনো অধিকার নয়, এ এক অনুগ্রহ।
#জীবনের_নতুন_অধ্যায় #মৃত্যুর_দুয়ার_থেকে_ফিরে #হার্টঅ্যাটাক_থেকে_বেঁচে_ফেরা #শর্তহীন_ভালোবাসা #বাস্তব_জীবনের_গল্প #হৃদয়ের_কথা #জীবনের_মূল্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।