অভিকের শেষ সংগ্রাম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | জানুয়ারি ২২, ২০২৬
অভিকের ঘরটা ছোট, কিন্তু আজ তা শুধু ছোট নয়, শ্বাসরুদ্ধকর। জানালার ফাঁক দিয়ে দুপুরের আলো ঢোকে, কিন্তু সেই আলো তার চোখে পৌঁছায় না। শুয়ে আছে খাটের একপাশে। বুক ওঠা-নামা করছে কষ্ট করে। হার্টের জটিল অসুখ তাকে এমন জায়গায় নিয়ে এসেছে, যেখানে প্রতিটা শ্বাসই যেন যুদ্ধ।
দুটি কন্যা সন্তান—দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে—মেঝেতে বসে আছে। কেউ কথা বলছে না। বড় মেয়েটা বারবার ব্যাগের ভেতর থেকে একটা কাগজ বের করে আবার ভাঁজ করে রাখে। ছোট মেয়েটা জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, যেন বাইরে তাকালে ভেতরের ভাঙনটা দেখা যাবে।
অভিক জানে ওই কাগজটা কী।
বড় মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি—মোট ১৮,০০০ টাকা।
এই একটিমাত্র সংখ্যাই আজ তার বুকের ওপর পাহাড় হয়ে বসে আছে।
একসময় তার ছোট্ট ব্যবসা ছিল। খুব বেশি কিছু নয়, কিন্তু দিন চলত। মেয়েরা হাসত, খেত। সে রাতে ঘুমোতে পারত। তারপর অসুখ এলো। ধীরে ধীরে সব গিলে ফেলল—ব্যবসা, শক্তি, আত্মসম্মান। এখন অনেক দিন ঠিকমতো খেতে পারে না। মেয়েদের সামনে না খাওয়ার ভান করে বলে, “আমি পরে খাব।”
আজ আর ভান ধরে রাখা যায় না। শ্বাস নিতে গেলে গলা শুকিয়ে আসে। বুকের ভেতরে কেমন একটা চাপ। মনে হয়, এই বুঝি সব থেমে যাবে। কিন্তু থামতে পারছে না—কারণ পাশে বসে আছে দুই কন্যা।
“বাবা…”
বড় মেয়েটা কথা শুরু করেও থেমে যায়।
অভিক চোখ খুলে তাকায়। মেয়ের চোখে ভয়, কিন্তু সে সেটা লুকাতে চায়। কাঁপা হাতে তার মাথায় হাত রাখে।
“সময়টা একটু খারাপ যাচ্ছে,” অভিক ধীরে বলে, “কিন্তু তুই পড়াশোনা ছাড়বি না।”
এই কথাটা বলতে গিয়ে অভিক নিজেই জানে—সে মিথ্যে বলছে না, আবার সত্যও বলছে না।
রাত নামে। ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দেওয়া হয়। মেয়েরা শুয়ে পড়ে, কিন্তু ঘুম আসে না। অভিক ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মাথার ভেতর চিন্তাগুলো ঘুরতে থাকে।
যদি ফি জমা না দেওয়া যায়—যদি বড় মেয়েটার পড়াশোনা এখানেই থেমে যায়—যদি সে নিজেই আর বেশি দিন না বাঁচে—
তাহলে কী হবে?
এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, এই সবকিছুর একটাই সমাধান—সব শেষ হয়ে যাওয়া। শ্বাস বন্ধ হলে আর কোনো হিসাব থাকবে না, কোনো লজ্জা থাকবে না।
ঠিক তখনই ছোট মেয়েটা উঠে এসে বাবার পাশে বসে। কিছু বলে না। শুধু ধীরে ধীরে বাবার বুকের ওপর মাথা রাখে। তারপর ফিসফিস করে বলে, “বাবা, আমরা তো আছি। তুমি একা নও।”
অভিকের চোখ ভিজে ওঠে। সে ভাবতে থাকে—“আমি যদি না থাকি, ওরা কাকে ডাকবে ‘বাবা’ বলে?”
পরদিন সকালে অভিক উঠে বসে। শরীর সাড়া দিতে চায় না, তবু উঠে বসে। একের পর এক দরজায় কড়া নাড়ে। কোথাও আশ্বাস, কোথাও করুণ দৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ নীরবতা। কিন্তু টাকা আসে না।
সময় শেষ হয়ে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত দিনের সকালে বড় মেয়েটা ব্যাগ গুছিয়ে বসে। অভিক কিছু বলে না। বলার মতো শব্দ নেই।
“বাবা,” মেয়েটা ধীরে বলে,
“আমি এক সেমিস্টার পরে নেব।”
কথাটা বলার সময় তার গলাটা কাঁপেনি।
কিন্তু চোখ দুটো ফাঁকা—যেন সে নিজেই কথাটার ভেতরে নেই।
রাত নেমে আসে। অভিক ঘুমোতে পারেনি। শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। বুকের ভেতর শব্দ হচ্ছে—মেশিনের মতো। হঠাৎ তার চোখ পড়ে টেবিলের ওপরে খোলা খাতার দিকে। কাগজে লেখা তার হাতের লেখা, কাঁপা।
“বাবা,
আমি জানি তুমি ভেঙে পড়েছ।
আমি জানি তুমি নিজেকে দোষ দিচ্ছ।
কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার কষ্টটা শুধু পড়াশোনা থেমে যাওয়ার নয়।
এই থেমে যাওয়াটা আমাকে প্রতিদিন বোঝাচ্ছে—
আমি আর এগোতে পারছি না।”
অভিকের হাত কাঁপতে থাকে। সে উঠে বসার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে। তার মনে হয়, এই শেষ শ্বাসটা আরও একটু ধরে রাখতে হবে—মেয়েদের জন্য। সে চোখ বন্ধ করে, মেয়েদের মুখ মনে করে। শ্বাস নিতে গিয়ে বুকটা ফেটে যাওয়ার মতো লাগে। চিন্তা ঘুরতে থাকে—যদি আমি চলে যাই, ওরা কী করবে? কে ওদের স্বপ্নের হাত ধরবে?
অতিরিক্ত শান্তি ঘরে নেমে আসে। হঠাৎ ছোট মেয়েটা পাশে এসে বাবার কাঁধে মাথা রাখে। বড় মেয়েটা চুপ করে বসে থাকে। চোখ খোলা। ভয় নেই। শুধু ভয়ংকর শান্তি।
অভিকের শ্বাস শেষ পর্যন্ত থেমে আসে।
তার মাথার ভেতর শুধু একটাই কথা ঘোরে— সে নিজের শ্বাস ধরে রেখেছিল মেয়েদের জন্য,
আর বড় মেয়েটা শ্বাস ছেড়ে দিল বাবার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে।
ছোট মেয়েটা কাঁদছে না, শুধু বাবার পাশে বসে আছে। ঘরের প্রতিটি কোণ নীরব।
বড় মেয়েটা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে, যেন ঘুমিয়ে যাচ্ছে—কিন্তু শান্ত নয়। মনে হচ্ছে, সে জানে—তার জীবনও একরকম থেমে গেছে।
এই পৃথিবীতে কিছু ঋণ শোধ হয় না।
শুধু মানুষ ভাঙে।
#শ্বাসেরঅশ্রু #অভিকেরসংগ্রাম #দুইকন্যা #অধরা_স্বপ্ন #পিতৃত্ব #দারিদ্র্য #মানবিকগল্প #বাংলাসাহিত্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।