প্রয়োজন ফুরোলেই পরিচয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
১ নভেম্বর ২০২৬
একসময় লোকটা ফোন করলেই ওপাশ থেকে হাসিমুখে উত্তর আসত। কোনো কাজে আটকে গেলে দু-চারজনকে বলার আগেই একজন এগিয়ে আসতেন। পারিবারিক অনুষ্ঠানে তাঁর জন্য চেয়ার রাখা হতো, মতামত জানতে চাওয়া হতো, তাঁর উপস্থিতিতে কথাবার্তাও জমে উঠত।
তারপর একদিন তাঁর সেই সামর্থ্যটা আর থাকল না। যে কাজগুলো তিনি সহজে করে দিতে পারতেন, সেগুলো আর পারলেন না। কারও প্রয়োজনে টাকা ধার দেওয়া বন্ধ হলো, কারও বিপদে ছুটে যাওয়ার শক্তি কমে গেল। আশ্চর্যজনকভাবে, তাঁর ফোনের ওপাশের কণ্ঠগুলোও ধীরে ধীরে বদলে গেল। কেউ ব্যস্ত, কেউ পরে কথা বলবে, কেউ আবার ফোন ধরার প্রয়োজনই মনে করল না।
কেউ তাঁকে অপমান করেনি। কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণাও দেয়নি। শুধু আগের মতো আর কেউ তাঁকে খুঁজল না।
মানুষের বদলে যাওয়ার কিছু কিছু গল্প এভাবেই ঘটে। কোনো ঝগড়া হয় না, কোনো বিদায়ের দৃশ্য থাকে না। একদিন মানুষ বুঝতে পারে, তার চারপাশে লোকজন ছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের অনেকের কাছে তার উপস্থিতির চেয়ে তার উপযোগিতার মূল্য বেশি ছিল।
উষ্ণতার সম্পর্ক
শীতের সকালে মানুষ রোদ পোহাতে বসে। সূর্যের আলো গায়ে লাগলে ভালো লাগে, ঠান্ডা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু দুপুরে রোদ যখন অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন সেই মানুষই ছায়া খোঁজে।
প্রকৃতির এই স্বাভাবিক আচরণকে মানুষের সম্পর্কের সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যায় না। সূর্যের কাছে মানুষের কোনো প্রত্যাশা নেই, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয় অনুভূতি, স্মৃতি, দায়িত্ব ও পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্য দিয়ে।
তবু তুলনাটির মধ্যে একটি অস্বস্তিকর সত্য আছে। অনেকেই মানুষের সান্নিধ্য পছন্দ করেন, যতক্ষণ সেই মানুষটি তাঁদের জীবনে স্বস্তি, সুবিধা কিংবা আনন্দ এনে দেন। তিনি সাহায্য করলে উদার, সময় দিলে আপন, সমস্যা সমাধান করলে নির্ভরযোগ্য। কিন্তু তাঁর নিজের যখন সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তখন সম্পর্কের ভাষা বদলে যেতে পারে।
যে মানুষটি এত দিন সবার সমস্যা শুনেছেন, তাঁর সমস্যার কথা শোনার সময় কারও থাকে না। যিনি অন্যের বিপদে নিজের কাজ ফেলে ছুটে গেছেন, তাঁর বিপদের দিনে সবাই নিজের ব্যস্ততার হিসাব দেখান।
তখন কষ্টটা শুধু সাহায্য না পাওয়ার নয়। কষ্টটা হলো, যাদের আপন ভেবেছিলেন, তাদের কাছে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নতুন করে জানতে পারা।
উপকারের আড়ালে সম্পর্ক
আগে যার ফোন এলে ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে বলা হতো, ‘কী খবর ভাই?’ এখন সেই ফোন দেখেও অনেকে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কখনো ফোন ধরলেও কথাটা ছোট হয়ে আসে—‘এখন একটু ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব।’
সেই পরে আর আসে না।
অথচ কিছুদিন আগেও এই মানুষটির এক ফোনেই কত কাজ হয়ে যেত। কারও বিপদে টাকা লাগলে তিনি ব্যবস্থা করতেন, কোথাও আটকে গেলে ছুটে যেতেন, দরকার পড়লে নিজের কাজ ফেলে অন্যের কাজ সামলাতেন। তখন তাঁকে ঘিরে ব্যস্ততার অভাব ছিল না।
এখন তিনি নিজেই একটু সাহায্য চাইলে উত্তর আসে, ‘দেখি কী করা যায়।’ কথাটা শুনতে খারাপ নয়, কিন্তু যিনি একসময় অন্যের প্রয়োজনে এত কিছু করেছেন, তাঁর কাছে এই সামান্য দূরত্বও অনেক কিছু বলে দেয়।
সবাই যে ইচ্ছে করে এমন করেন, তা নয়। কারও সত্যিই অসুবিধা থাকে, কারও নিজের জীবনের চাপ সামলানোর ক্ষমতা থাকে না। কিন্তু যখন বারবার একই ঘটনা ঘটে, তখন বোঝা কঠিন হয় না—কিছু মানুষ আসলে আপনাকে নয়, আপনার কাছ থেকে পাওয়া সুবিধাটুকুকেই আপন করে নিয়েছিলেন।
প্রয়োজন শেষ, মানুষ শেষ নয়
মানুষের জীবনে এমন সময় আসতে পারে, যখন সে আগের মতো উপার্জন করতে পারে না, কাউকে সাহায্য করতে পারে না, সামাজিকভাবে আগের অবস্থানে থাকে না। বয়স, অসুস্থতা, ব্যর্থতা কিংবা পরিস্থিতির পরিবর্তন তার সামর্থ্য কমিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু সামর্থ্য কমে যাওয়া আর মানুষের মূল্য কমে যাওয়া এক কথা নয়।
একজন মানুষ হয়তো আর কাউকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে পারেন না। হয়তো তাঁর নিজেরই এখন অন্যের সাহায্য দরকার। সেই সময় তাঁকে কতটা মর্যাদা দেওয়া হয়, সেখানেই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়।
সব সময় সবার পাশে থাকা সম্ভব নয়। কেউ সাহায্য করতে না পারলেই তাকে স্বার্থপর বলা যায় না। কিন্তু সাহায্য করতে না পারা আর কাউকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা এক বিষয় নয়। সামর্থ্যের অভাবে পাশে দাঁড়ানো সম্ভব না হলেও, মানুষটির খোঁজ নেওয়া কিংবা তাঁর সঙ্গে আগের মতো সম্মান নিয়ে কথা বলা অসম্ভব নয়।
যে পরিচয় থেকে যায়
কিছু সম্পর্ক প্রয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হলেও পরে আন্তরিক হয়ে ওঠে। আবার কিছু সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে আপনি কতটা কাজে লাগছেন তার ওপর। যত দিন আপনার কাছে যাওয়ার কারণ থাকে, তত দিন খোঁজখবরও থাকে, আন্তরিকতাও থাকে। কারণটা হারিয়ে গেলে সম্পর্কের উষ্ণতাও কমে যায়।
এই পার্থক্যটা আগে বোঝা যায় না। কারণ, প্রয়োজনের সময় সবাই আপনজনের মতো আচরণ করতে পারে। আসল পার্থক্য ধরা পড়ে তখন, যখন আপনার আর দেওয়ার কিছু থাকে না।
তবু সবাই এক রকম নয়। কেউ কেউ তখনও খোঁজ নেন, পাশে বসেন, কোনো কাজের দরকার ছাড়াই কথা বলেন। তাঁদের কাছে আপনার সামর্থ্য নয়, আপনিই গুরুত্বপূর্ণ। এমন মানুষ হয়তো অনেক নন, কিন্তু তাঁদের কাছে সম্পর্কের অর্থটা নতুন করে বুঝতে হয় না।
একসময় যে লোকটার ফোন এলে সবাই ব্যস্ততা ভুলে কথা বলত, তিনি এখন ফোনটা হাতে নিয়ে পুরোনো নামগুলো দেখেন। কাউকে ফোন করতে গিয়েও থেমে যান। কী বলবেন? যে মানুষগুলো একসময় তাঁকে ছাড়া চলতে পারত না, তাদের কাছে এখন তাঁর বলার মতো কোনো জরুরি কথা নেই।
ফোনটা এখনো তার কাছেই আছে। শুধু ওপাশ থেকে আর কেউ খোঁজে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।