একটি ফোন কল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২৬
(বাস্তব ঘটনার আলোকে)
জন্মদিন—এই শব্দটা বেশিরভাগ মানুষের কাছে আনন্দের সমার্থক। কেউ মনে মনে বুকে ভরে নেয়, শুভেচ্ছা, হাসি।
কিন্তু আমার জীবনে জন্মদিন কখনও উৎসব হয়ে ওঠেনি। ৭ই ফেব্রুয়ারি আামার জন্মদিন, চিন্তার আগেই ৭ই ফেব্রুয়ারি শুধু একটা তারিখ—যেটা আসে, আর চলে যায়। কোনো আয়োজন হয় না, কোনো প্রত্যাশা গড়ে ওঠে না। দিনটি এসে যায়—অন্য দশটি সাধারণ দিনের মতোই।
তবে আমার জন্মদিনের সাথে একটি অদ্ভুত নিয়ম জুড়ে ছিল। নিয়মটা ছিল আমার বাবার।
২০০০ সালের পর থেকে, যখন আলাদা বাসায় থাকা শুরু করলাম, তখন থেকেই প্রতি বছর ৬ই ফেব্রুয়ারি রাত ঠিক ১২টা ০১ মিনিটে আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠত। কার দিক থেকে তাকানোর দরকার হতো না, কলার আইডি দেখার প্রয়োজন পড়ত না। আমি জানতাম—এই ফোনটা বাবার।
বাবা কখনো বলেননি, “শুভ জন্মদিন।” ওই শব্দগুলো তার মুখে মানা যায় না। কিংবা ভালোবাসা প্রকাশের জন্য তার আলাদা কোনো ভাষা ছিল না।
ফোন করে তিনি বরাবরই সাধারণ কথা বলতেন—কেমন আছি, শরীর ঠিক আছে কি না, কাজকর্ম কেমন চলছে। তারপর, কথার একদম শেষে, যেন হঠাৎ মনে পড়ে এমন ভঙ্গিতে বলতেন, “কাল তোর জন্মদিন। বাসায় এস টাকা নিয়ে যাস। আর কাল ওদের নিয়ে—বৌমা আর মেয়েগুলোকে—বাইরে ভালো কিছু খাওয়াস।”
এই ছিল বাবার জন্মদিনের শুভেচ্ছা। সংক্ষিপ্ত, নিরাভরণ, অথচ আশ্চর্য রকমের উষ্ণ।
আমি কোনো দিন বলিনি, “বাবা, তুমি কেন আমাকে শুভ জন্মদিন বলো না?”
কারণ আমি বুঝতাম—এই কথাগুলোর ভেতরেই তার সব কথা হয়ে যায়। কিছু মানুষ শব্দে ভালোবাসে না, তারা দায়িত্বে ভালোবাসে।
এই নিয়ম ভাঙলাম ১২ বছর পরে—২০১২ সালে।
সেই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে আমি আর নিজের ঘরে ছিলাম না।
ছিলাম হাসপাতালের আইসিইউতে। হার্ট অ্যাটাক আমাকে এক মুহূর্তে জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানি কোনো এক অচেনা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। শরীর তখন নিস্তেজ, মুখে ভেন্টিলেটরের পাইপ, চারদিকে যন্ত্রের একটানা শব্দ। সময়ের কোনো ধারণা ছিল না। দিন না রাত—কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
হঠাৎ কপালে এক ধরনের ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করলাম। ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকালাম। ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখলাম—বাবা। তিনি আমার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ দুটো লাল, ফোলা। সেই চোখে জমে থাকা জল আর লুকোনোর নেই।
তিনি খুব আস্তে আমার কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন। যেন আমি ভেঙে পড়ি, এমন আশঙ্কায়। তার চোখের জল গড়িয়ে এসে ভিজিয়ে দিলো আমার কপাল। তিনি দ্রুত নিজের হাত দিয়ে তা মুছে দিলেন—যেন আমি কষ্ট না পাই।
খুব অস্থির, প্রায় ফিসফিস করে বললেন,“জাহিদ… তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠ। বাসায় গিয়ে তোর জন্মদিন পালন করব।”
সেই মুহূর্তে আমার বুকের ভেতর কী যে হলো, তা ভাষায় ধরার মতো শক্তি এখনো আমার নেই। আমি চিৎকার করে বলতে চেয়েছিলাম—
“বাবা, আমি তোমাকে অসীম ভালোবাসি।”
বলতে চেয়েছিলাম—
“আমি ভয় পাচ্ছি, আমাকে ছেড়ে যেও না।”
কিন্তু পারলাম না। গলার ভেতরের প্রতিটি শব্দ আটকে গেল। আমার না বলা কথাগুলো তখন চোখের জল হয়ে বেরিয়ে এলো। একের পর এক ফোঁটা। বালিশ ভিজিয়ে গেল। আইসিইউর সেই ভয়ংকর নীরবতা আমার কান ঝাঁকরি দিচ্ছিল।
আমি অসহায় চোখে দেখলাম, বাবা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। হয়তো পাশেই পেছেন ছিলেন। হয়তো তাকালে ভেঙে পড়তেন। সেই দৃশ্যটা আজও আমার চোখে গেঁথে আছে।
সময় থেমে থাকে না। আমি বেঁচে ফিরেছি। জীবন আবার চলতে শুরু করেছে। কিন্তু কিছু অপেক্ষা, কিছু অভিমান—কখনো শেষ হয় না।
বাবা আমাকে একা করে, সমস্ত চিন্তা আর চেতনাকে পাশ কাটিয়ে ২৭শে অক্টোবর ২০২২ সালে আমাকে না বলেই চলে গেলেন ওপারে।
আজ আবার ফেব্রুয়ারি এসেছে। আবার বাবার ফেব্রুয়ারি। রাত নামছে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে। ঠিক ১২টা ০১ মিনিট।
আমি জানি, এবার আর ফোনটা বাজবে না। স্ক্রিন নিঃশব্দ থাকবে। কোনো নাম ভেসে উঠবে না। অথচ বুকের ভেতর উঠবে এক অদ্ভুত শব্দ—বিশ্রামের কালে হঠাৎ নেমে আসা কলবৈশাখীর মতো। সেই শব্দের শেষে থাকবে শুধু চোখের লোনা জল।
তবুও আমি অপেক্ষা করব।
কারণ কিছু মানুষ চলে গেলেও, তাদের ভালোবাসা সময়ের মতো কল দিয়ে যায়।
আর কিছু ফোন কল—কখনো বন্ধ হয় না, শুধু শোনা যায় না।
#১২টা০১মিনিট #একটিফোনকল #বাবারভালোবাসা #নীরবভালোবাসা
#হারানোবাবা #ফেব্রুয়ারিরস্মৃতি
#বাংলাছোটগল্প #মানবিকগল্প #FatherLove
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।