চিকিৎসা মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | জানুয়ারি ২৯, ২০২৬
“মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় ভয় দারিদ্র্য নয়।
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া। এই গল্পটা কোনো পরিবারের না। এই গল্পটা আমাদের।”
“সব যুদ্ধ বন্দুক দিয়ে হয় না। কিছু যুদ্ধ হয় বিল দিয়ে। এই গল্পটা সেই যুদ্ধের।”
“আপনার পরিবারে কেউ হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হলে, আপনি কতদিন টিকে থাকতে পারবেন?”
নিশি তার পুরনো কাঠের আলমারি খুলল।
তৃতীয় শেলফে, সাদা সুতি কাপড়ে মোড়ানো একটি ফাইল।
ভেতরে: মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশন লেটার (কপি), মেয়ের ভবিষ্যৎ পড়াশোনার হিসাব, অভিকের প্রভিডেন্ট ফান্ডের কাগজ—আর নিচে, গত পাঁচ বছরের মেডিকেল বিলের স্ট্যাপল্ড কপিগুলো।
ফাইলটা টানতেই নিশির কবজিতে টান লাগল।
মনে হলো, কাগজ না—সে যেন একটা শরীর তুলছে।
তার গলা শুকিয়ে এল। হঠাৎ প্রশ্নটা মাথায় পড়ল—
“এই ফাইলের ওজন কি আমার সারা জীবনের সঞ্চয়ের চেয়ে ভারী?”
২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬। সকাল ১০টা।
ন্যাশনাল হাসপাতালের কনসালটেশন রুম।
ডাক্তার বললেন,
“মিস্টার অভিক, আপনার হার্টের আবার ব্লক। দ্রুত অপারেশন দরকার।”
ঘরটা হঠাৎ ছোট হয়ে গেল।
নিশির কানে শব্দ ঢুকছিল, কিন্তু অর্থ ঢুকছিল না।
নিশি অভিকের হাত ধরল। হাত ঠান্ডা। ভেজা।
তার নিজের আঙুলে কেমন যেন অবশ অবশ লাগল—রক্ত যেন আর ঠিকমতো পৌঁছচ্ছে না।
ওই মুহূর্তে কানে বাজল গত রাতের কথা—
অভিক: “নিশি, যদি কিছু হয়ে যায়…”
নিশি: “কিছু হবে না।”
অভিক: “শুনে রাখো… ফিক্সড ডিপোজিটের টাকাটা যেন মেয়েদের পড়াশোনায় দিও।”
নিশি: “চুপ করো। তুমি বাঁচবে।”
কিন্তু নিশির মাথার ভেতর অন্য হিসাব চলছিল—
অভিকের মাসিক বেতন: ২৫,০০০ টাকা
অপারেশন খরচ: ৪,৫০,০০০ টাকা
মানে আঠারো মাসের বেতন।
আঠারো মাসের জীবন।
চোখের সামনে হালকা অন্ধকার নামল।
সে চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে ধরল, যেন পড়ে না যায়।
বাসায় ফেরার পথে অটোরিকশায় বসে নিশি আবার হিসাব কষে।
গহনা বিক্রি করলে: প্রায় ১,০০,০০০
মোট জমানো: ৩,৭০,০০০
ঘাটতি: ২,৭০,০০০
প্রতিটি শূন্য বুকের ভেতর ঢুকে ভারী হয়ে বসে।
ভাড়া দিতে গিয়ে নিশি ব্যাগ খুলল।
অটোরিকশা চালক হাত তুলল।
“আপা, আজ না হয় লাগবে না।”
নিশির বুকের ভেতর হঠাৎ একটা শব্দ হলো—কিছু ভাঙার শব্দ।
সে জানালার বাইরে তাকাল, যেন লোকটার মুখ না দেখলেই সহজ হবে।
ভাবল—“একজন অচেনা মানুষের দয়া ছাড়া আর কিছুই কি অবশিষ্ট নেই?”
পরের তিনদিন ফোন নিশির হাতেই।
ভাই: “আপু, আগের ধারই এখনো মেটাতে পারিনি…”
অভিকের অফিস: “নিয়ম অনুযায়ী তিন মাসের অগ্রিমের বেশি সম্ভব না।”
সরকারি হাসপাতাল: “বেড পেতে এক মাস লাগবে।”
প্রতিবার ফোন নামানোর পর নিশি টের পায়—তার কাঁধ দুটো একটু একটু করে নেমে যাচ্ছে।
রাতে মেয়ের ঘরে ঢোকে নিশি। টেবিলে ছড়ানো বই। পাশে খোলা নোট। মেয়েটা পড়তে পড়তে কলমের মাথা কামড়ায়—ছোটবেলা থেকে অভ্যাস।
দেয়ালে টেপ দিয়ে লাগানো কাগজ:
“একদিন আমি নিজেই নিজের খরচ চালাব।”
নিশি মেয়ের কপালে হাত রাখে। মেয়ের কপাল গরম। নিশির তালু ঠান্ডা।
সে ফিসফিস করে বলে—
“হয়তো কোচিং বন্ধ করতে হবে। বাবাকে বাঁচাতে… তুমি কি বুঝবে?”
মেয়েটা ঘুমের মধ্যেই ভ্রু কুঁচকে পাশ ফিরে শোয়।
নিশির বুকের ভেতর শব্দটা আবার বাজে।
প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি।
করিডোরে বিলের কাগজ।
রুম রেন্ট
ডাক্তার ফি
অ্যানেসথেশিয়া
মেডিকেল সাপ্লাইজ
মোট: ১,১০,০০০ টাকা
(অপারেশনের আগেই)
কাউন্টারে দাঁড়িয়ে নিশি ফর্ম পূরণ করে।
“রোগীর পেশা” ঘরে সে কলম থামায়।
লিখে—“চাকুরিজীবী”
তারপর কেটে আবার লেখে—“অসুস্থ।”
পাশে একজন মহিলা কাঁদছে। কিডনি প্রতিস্থাপন। পনেরো লাখ টাকা।
হাসপাতালের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা চলছে।
কারো সময় থামে না।
নিশির মনে হয়—“আমার ঘরটাই কি শেষ ভরসা?”
ডাক্তার বলেন—অপারেশন সফল।
“মাসে ওষুধ লাগবে আট হাজার টাকা।”
অভিক জেগে উঠে প্রথম প্রশ্ন করে—“কত খরচ?”
নিশি চোখ নামিয়ে বলে—“বেশি না।”
অভিক কিছু বলে না।
হাসপাতালের দেয়ালের রঙ মিথ্যা বলে না।
এক মাস পর—
মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ
মেয়ের ভর্তি স্থগিত
ওষুধের বিল জমছে
ধার বাড়ছে
দোকানদার বলে—
“আল্লাহ ভরসা।”
নিশির বুকের ভেতর ফাঁকা শব্দ—
“আমি কি ভরসা, নাকি বোঝা?”
ডায়েরিতে সে লেখে—
“স্বামী হাঁটছে। কিন্তু মাস শেষে ঘাটতি ৮,০০০ টাকা। এই যুদ্ধ কি কখনো শেষ হবে?”
নার্স ফোন করে জানায়—সরকারি হাসপাতালে ফ্রি অপারেশন, কিন্তু ইনফেকশনের ঝুঁকি। নতুন খরচ।
নিশি বোঝে—
সরকারি হাসপাতালে সময়ের যুদ্ধ।
প্রাইভেট হাসপাতালে টাকার যুদ্ধ।
মধ্যবিত্ত সব যুদ্ধেই হারে।
একদিন মেয়ে বলে—
“আমি টিউশনি করবো। নিজের খরচ নিজে চালাব।”
মেয়েটা কথাটা বলার সময় চোখ সরায়নি।
এই প্রথম। নিশির চোখ ভিজে যায়। সব যুদ্ধ হারা নয়।
অফিস থেকে জানায়—
অভিকের চাকরিটা আর থাকছে না।
মেডিক্যাল আনফিট।
নিশি ফোন নামিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে।
মনে হয়—মেরুদণ্ডটা আর শরীর টানতে পারছে না।
আরেকটা পরাজয়।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়ে যায়—
“জীবনের শেষ গন্তব্য কোথায়?”
রাতে আলমারি খোলে নিশি।
পুরনো ফাইলটার পাশে নতুন খাতা রাখে।
শিরোনাম লেখে—
“মধ্যবিত্তের চিকিৎসা যুদ্ধ।”
কাউন্টারের ফর্মটা তার চোখে ভাসে।
“রোগীর পেশা”
“চাকুরিজীবী” কেটে “অসুস্থ”।
নিশি লিখতে থাকে—
“আমরা হার্টের রোগী নই।
আমরা অর্থনীতির রোগী।
আমাদের রোগের নাম: অসহায়তা।
প্রতিকার: সাশ্রয়ী চিকিৎসা।
অপারেশন ডেট: আজ থেকে এখনই।
অপারেশন থিয়েটার: সকল সরকারি হাসপাতাল।
সার্জন: রাষ্ট্রের ইচ্ছা।
এনেসথেশিয়া: মানুষের মর্যাদা।”
কলম থামে।
শেষ লাইনে নিশি লেখে—
“আমরা রোগী নই।
আমরা ব্যবস্থার ভুক্তভোগী।
আমাদের চিকিৎসা দরকার।
করুণা নয়।”
#মধ্যবিত্ত_যুদ্ধ #চিকিৎসা_আতঙ্ক
#স্বাস্থ্য_বাস্তবতা #বাংলা_গল্প
#অভিক_নিশির_গল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।