“শিক্ষাই আলো, শিক্ষাই মুক্তি—কিন্তু আলো যখন নিভে যায়, মুক্তি তখন পরিণত হয় শৃঙ্খলে।”
বাংলাদেশ, যে ভূখণ্ড রক্ত দিয়ে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতার জন্য, যে জাতি স্বপ্ন দেখেছিল অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ার—আজ সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের কিনারায়। শিক্ষার নামে কাগজে-কলমে সনদ বাড়ছে, কিন্তু জ্ঞান, প্রজ্ঞা, গবেষণা—সবই যেন কফিনবন্দি। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে হতাশার কালো ছায়া নেমে এসেছে।
১. বিশ্বের মানচিত্রে লজ্জার অবস্থানঃ
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নেই QS World University Rankings 2024 কিংবা টাইমস হায়ার এডুকেশন-এর শীর্ষ ৫০০–তে। অথচ ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড—আমাদের প্রতিবেশীরাই ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশ আজ পিছিয়ে পড়ার প্রতীক, এক লজ্জার নাম। শিক্ষা যে জাতির মেরুদণ্ড, সেই মেরুদণ্ড আজ ভেঙে গেছে, চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।
(সূত্র: QS World University Rankings 2024)
২. একাদশ মানে সপ্তম শ্রেণিঃ
বিশ্বব্যাংক (2023) বলছে, আমাদের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীর মান আন্তর্জাতিকভাবে সপ্তম শ্রেণির সমান। ভাবুন, একাদশে পড়া একটি ছেলে-মেয়ে যে স্বপ্ন দেখে চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী হওয়ার, আসলে সে জ্ঞানে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোরের প্রাথমিক স্তরে। তখন ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে এক বিভীষিকা—এক প্রজন্ম আটকে যায় অন্ধকার গহ্বরে।
(সূত্র: World Bank Education Report 2023)
৩. স্নাতকের সনদ—হাসির খোরাকঃ
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত স্নাতক ডিগ্রি বিদেশে গিয়ে কেবল “ফাউন্ডেশন কোর্স” বলে গণ্য হয়। চার বছর পড়াশোনা, লাখো টাকা ব্যয়, স্বপ্নের ত্যাগ—সবকিছু সেখানে এক প্রাথমিক স্তরের সমান! একজন স্নাতক যখন বিদেশে গিয়ে শুনে তার সনদ আসলে কেবল শুরু মাত্র, তখন তার বুক ভেঙে যায়, তার চোখে জলের নদী বয়ে যায়।
(সূত্র: Singapore Education Board, 2022)
৪. চিকিৎসা শিক্ষার অন্ধকারঃ
আমাদের চিকিৎসকরা রাত জেগে বই পড়েন, মানুষের জীবন বাঁচানোর স্বপ্ন দেখেন। অথচ বিদেশে গেলে তাদের সনদ কার্যত অচল—কারণ WFME এখনো বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা স্বীকৃতি দেয়নি। এক তরুণ ডাক্তার, যে হয়তো শপথ নিয়েছিল মানবসেবার, বিদেশে গিয়ে দাঁড়ায় প্রত্যাখ্যানের দেয়ালে।
(সূত্র: WFME Official Report, 2023)
৫. রাজনীতির বিষাক্ত শেকড়ঃ
শিক্ষক সমাজ একসময় ছিলেন জাতির দিশারি। এখন তারা বিভক্ত রাজনৈতিক দলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা জ্ঞানচর্চার জায়গা না হয়ে পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক ব্যানার, মিছিল, স্লোগানের মঞ্চে। যেখানে গবেষণাগারগুলো উজ্জ্বল হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন রাজনীতির ধোঁয়া। ছাত্র-শিক্ষকরা হয়ে উঠেছেন বিভাজনের ক্রীতদাস।
৬. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেদনাদায়ক চিত্রঃ
সরকারি প্রতিষ্ঠানের অস্থিরতা মানুষকে ঠেলে দিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানে শিক্ষা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
একটি সাধারণ স্নাতক ডিগ্রির জন্য খরচ হয় ১০–১৫ লাখ টাকা।
অনেক পরিবার ভিটেমাটি বিক্রি করে সন্তানকে পড়ায়।
কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে নুয়ে পড়ে।
অথচ ডিগ্রি হাতে নিয়েও চাকরির বাজারে অবজ্ঞা ছাড়া কিছু মেলে না।
এভাবে শিক্ষা ধনীকে আরও ধনী করছে, গরিবকে ঠেলে দিচ্ছে আরও হতাশার খাদে। শিক্ষা যখন বাণিজ্যে রূপ নেয়, তখন সমাজ ভেঙে পড়ে বৈষম্যের ভারে।
৭. কেন এমন হলো?
বাজেটের দারিদ্র্য: শিক্ষাখাতে বরাদ্দ মোট জাতীয় বাজেটের মাত্র ২%–এর সামান্য ওপরে। অথচ ইউনেস্কোর মান ৬%।
(সূত্র: Bangladesh Education Budget 2024)
গবেষণার মৃত্যু: ল্যাবরেটরি মরিচায় ভরা, লাইব্রেরি খালি তাক।
রাজনীতির বিষ: যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয় বড়।
শিক্ষার বাণিজ্যীকরণ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা পরিণত হয়েছে টাকার খেলায়।
মুখস্ত বিদ্যার দাসত্ব: সৃজনশীলতা হারিয়ে গেছে, সার্টিফিকেটই এখন একমাত্র পরিচয়।
৮. কীভাবে উদ্ধার সম্ভব?
১. শিক্ষাকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে।
২. শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের অন্তত ৬% করতে হবে।
৩. গবেষণা-ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে।
৪. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি নিয়ন্ত্রণ ও স্কলারশিপ বাড়াতে হবে।
৫. পাঠ্যক্রম আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে।
শেষকথাঃ
বাংলাদেশের শিক্ষা আজ মৃত্যুশয্যায় শুয়ে। যে শিক্ষা একদিন জাতিকে মুক্তির আলো দেখাবে ভেবেছিলাম, সেটিই আজ অন্ধকারে কাঁদছে।
“একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করো।”— নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
আমরা কি তবে নিজের হাতে নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি? যদি এখনই শিক্ষা সংস্কারের আগুন না জ্বলে, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না—বরং আমাদের অভিশাপ দেবে।
তথ্যসূত্রঃ
1.QS World University Rankings 2024
2.World Bank Education Report 2023
3.Singapore Education Board 2022
4.WFME Official Report 2023
5.Bangladesh Education Budget 2024
#বাংলাদেশের_শিক্ষা #শিক্ষার_অবক্ষয় #জাতীয়_লজ্জা #শিক্ষা_সংস্কার #WFME #UniversityRanking #বেসরকারি_বিশ্ববিদ্যালয় #Research #মোহাম্মদজাহিদহোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।