চাকরি নামের বৃষ্টি কবে নামবে?
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণঃ বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ
তারিখঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৫
রোদ জানে না বৃষ্টি কবে নামবে, আমরাও জানি না জীবনের ঠিকানা কবে মিলবে। কখনও মনে হয়—রোদও বুঝি আজকাল ক্লান্ত হয়ে গেছে।
আকাশে মেঘ জমে, কিন্তু বৃষ্টি নামে না।
আমাদের জীবনটাও যেন তেমন—প্রস্তুতি আছে, পরিশ্রম আছে, কিন্তু ফল নেই।
চাকরি আজ শুধু জীবিকার প্রশ্ন নয়—এটি এখন অস্তিত্বের স্বীকৃতি। প্রতিদিন সকালে শত শত তরুণ ঘুম থেকে ওঠে একটা আশায়,
আজ হয়তো কোথাও একটা ফোন আসবে,
কোনো ইন্টারভিউ ডাকবে,
কোনো সুযোগের দরজা খুলে যাবে।
কিন্তু দিনের শেষে তারা ফিরে আসে সেই একই জায়গায়, নীরব, ক্লান্ত, অথচ পরাজিত নয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS, ২০২৪) তথ্য বলছে,
প্রতি বছর প্রায় আট থেকে নয় লক্ষ তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে বের হয়, কিন্তু স্থায়ী চাকরি মেলে মাত্র দেড় থেকে দুই লক্ষের হাতে।
সংখ্যাটা কাগজে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার ভেতরে আছে একেকটি ভাঙা হৃদয়,
একেকটি পরিবারের নীরব অশ্রু, আর একেকটি তরুণের অসম্পূর্ণ স্বপ্নের চিৎকার।
রাতে যখন কেউ সিভি পাঠিয়ে ঘুমাতে যায়, তখন তার চোখে ঘুম থাকে না, থাকে কেবল অজানা এক ভয়, যেন ভবিষ্যৎ নামের দানবটা ওঁত পেতে আছে দরজার ওপারে।
চাকরি না থাকা মানে শুধু বেকারত্ব নয়—এটা এক ধরণের নীরব মানসিক ক্ষয়।
পরিবারের মানুষ জিজ্ঞেস করে,
“তুই এখনও কিছু পেলি না?”
বন্ধুরা একে একে ব্যস্ত হয়ে যায়,
সামাজিক মাধ্যম হয়ে ওঠে হিংসার আয়না।
একসময় নিজের মধ্যেই জন্ম নেয় সন্দেহ,
“আমি কি সত্যিই যোগ্য না?”
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা (২০২৩) বলছে,বাংলাদেশে ৬৮% বেকার তরুণ মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপে ভোগে। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে যে কান্নাগুলো লুকিয়ে থাকে, সেগুলো কোনো রিপোর্টে লেখা হয় না।
তবুও তারা হাসে, গল্প করে, আবার চেষ্টা করে, কারণ তারা জানে, হাল ছেড়ে দিলে সব শেষ।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় জ্ঞান আছে, কিন্তু প্রস্তুতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয় শেখায় তত্ত্ব, কিন্তু বাস্তব শেখায় না।
আর নিয়োগদাতারা চায় অভিজ্ঞতা, যাদের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগই হয়নি, তাদের কাছেই।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা সংখ্যার খেলা বোঝে,
কিন্তু বোঝে না এক তরুণের হতাশার রাত,
যখন সে ভাবে—“আমার জীবনটা কবে শুরু হবে?”
বাংলাদেশ অর্থনীতি পর্যালোচনা (২০২৪) জানায়, বেসরকারি খাতে ৬০% বিজ্ঞপ্তিতে ‘অভিজ্ঞতা প্রয়োজন’ লেখা থাকে, যেখানে আবেদনকারীদের ৮০%ই সদ্য স্নাতক। এ যেন নতুনদের জন্য তৈরি এক অভিজ্ঞতার ফাঁদ।
এই অপেক্ষা কি বৃথা? না। অপেক্ষা বৃথা নয়।
চাকরি না পাওয়া মানে ব্যর্থতা নয়—এটি এক প্রস্তুতির সময়, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের শক্তি খুঁজে নেয়।
যেমন রোদ জানে না কখন বৃষ্টি হবে,
তবুও সে আলো দেয়, আমরাও তেমনি থেমে থাকতে পারি না।
যে তরুণ আজ বেকার, সে-ই হয়তো কাল নিজের পথ নিজেই তৈরি করবে। কারণ ইতিহাসে বড় পরিবর্তন এনেছে সেইসব মানুষ, যাদের একসময় সমাজ “অযোগ্য” ভেবেছিল।
এই প্রজন্ম ক্লান্ত, কিন্তু নিঃশেষ নয়। তারা পরাজিত নয়, তারা শুধু অপেক্ষমাণ।
যেদিন সুযোগের আকাশে মেঘ জমবে, সেদিন তাদের চোখের আগুনই সেই মেঘকে বৃষ্টি বানাবে।
চাকরি নামের বৃষ্টি দেরি করলেও, এ প্রজন্ম জানে,
রোদে জ্বলে থাকাই একদিন বৃষ্টির জন্ম দেয়।
তথ্যসূত্রঃ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), Labour Force Survey 2024
বাংলাদেশ অর্থনীতি পর্যালোচনা, অর্থ মন্ত্রণালয়, ২০২4
BRAC University Center for Development Studies, Youth Mental Health & Unemployment Survey, 2023
The Daily Star, Youth Unemployment and Skills Gap in Bangladesh, June 2024
#চাকরিনামেরবৃষ্টি #তরুণপ্রজন্ম #অপেক্ষাররোদ #বেকারত্বসংকট #মনোবিশ্লেষণ #enolej_idea #বাংলাদেশবাস্তবতা #সমাজওঅর্থনীতি #YouthStruggle #BangladeshFuture
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।