আমার মালদ্বীপ ভ্রমণ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ভ্রমণ কাহিনি | ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬
ঢাকার দিনগুলো যেন একটা অদৃশ্য চাপের বল, যা ক্রমাগত গড়িয়ে চলেছে আর থামার কোনো লক্ষণই দেখায় না। সকাল সাতটা থেকে রাত এগারোটা অবধি অফিসের চক্রে আটকে থাকি—মিটিংয়ের পর মিটিং, ক্লায়েন্টের ফোন যেন কখনো থামে না, ইমেইলের ঝাঁক আর ডেডলাইনের ছুরি সবসময় গলায় ঝুলে থাকে। সপ্তাহে ৭০-৭৫ ঘণ্টা কাজের পর বাসায় ফিরে দেখি আরিফ আর মায়া ঘুমিয়ে পড়েছে, আর রিয়া রাতের অন্ধকারে ফিসফিস করে বলে, “তুমি তো আর এখানে নেই জাহিদ, শুধু তোর গায়ের গন্ধটা লেগে থাকে শার্টে।” কথাটা বুকে লাগে, কিন্তুক কী বলবো—‘সরি, কাজ’?
আবার কাজ?
যেন সবকিছুর উত্তরই কাজ।
ছুটি চাইতে গেলে বসের মুখ দেখে মনে হয় আমি কোনো অসম্ভব দাবি করছি, যেন ছুটি মানে কোনো অপরাধ। “এখন তো পিক টাইম,” বলে ঘুরিয়ে দেয়। তবু ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি টিকিট কেটে ফেললাম। মালদ্বীপ। রিসোর্ট নয়। Maafushi আর Fulhadhoo—যেখানে টুরিস্ট কম, মানুষের জীবনটা ছুঁয়ে দেখা যায়। বসকে বলিনি। ইমেইলে out-of-office দিলাম, কিন্তু ভুল তারিখ লিখলাম—একদিন পরে। কেউ খেয়াল করলো না, অথবা করলেও বললো না।
বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে বসের মেইল দেখলাম: “কাল চারটায় কল, প্রিপার করো।” বুকের ভেতরটা একবার চেপে ধরল, যেন কোনো অদৃশ্য হাত আমাকে পিছু টানছে। ভাবলাম—তখন তো আমি অন্য কোথাও। বিমানে পাশে বসলেন রশীদ। পঞ্চাশের কাছাকাছি, চোখে হালকা হাসি। তিনি ব্যাগ থেকে ছোট একটা বাক্স বের করে দিলেন। “বাড়িতে বানানো শুকনো মাছের চাটনি। খেয়ে দেখো।” মুখে দিতেই লবণের তীব্রতা জিভ পুড়িয়ে দিল, কিন্তু স্বাদটা থেকে গেল—রোদে শুকানো মাছের গন্ধ, সমুদ্রের একটা দূরের ছোঁয়া। প্রথমবার মনে হলো—আমি শুধু কাজ করি না, জীবনও পাই। কিন্তুক কী দিয়ে বিনিময় করছি, সেটা তখন ভাবলাম না।
ভেলানায় নামতেই উষ্ণ, লবণমাখা বাতাস মুখে এসে লাগল। চারদিকে নীল—আকাশ, জল, দূরে মেঘ। স্পিডবোটে Maafushi-এর দিকে যাত্রা করলাম, জল ছিটকে গালে, চোখে—ঠান্ডা আর লবণাক্ত। একটা বিন্দু ঠোঁটে এসে লেগে মিষ্টি লাগল, কিন্তু তখনই মনে পড়ল—এই একই জলে কোটি কোটি টাকার প্রজেক্ট ডুবেছে আমার হাতে। হেসে ফেললাম। পাশের লোকটা তাকাল, কিছু বলল না। আমিও না।
দ্বীপে নেমে পায়ের তলায় সাদা বালু—নরম, গরম, কিন্তু স্যান্ডেলে ঢুকে চলতে কষ্ট হলো। এক লোক এগিয়ে এলো, “গেস্টহাউস?” আমি হ্যাঁ বললাম, যদিও নাম জানতাম না। “Kaani?” বলল সে। মাথা নাড়লাম। রাস্তা সরু। দুপাশে ছোট রঙিন বাড়ি, দরজায় শুকনো মাছের গন্ধ ভেসে আসছে। একটা কুকুর রাস্তার পাশে শুয়ে—চোখ খুলে আমাকে দেখল, আবার বন্ধ করে দিল। আমাকে গুরুত্ব দিল না। ভালো লাগলো।
হোটেল তিনতলা, নীল রং ফিকে হয়ে গেছে। রিসেপশনে গরম নারিকেল জল দিল। খেলাম—মিষ্টি-লবণ মিশ্রিত, গলায় আটকে গেল। রুমে জানালা খুললাম—সমুদ্র দূরে, আকাশের নীল আর জলের নীল মিলেমিশে একাকার। ছবিতে কাছে দেখেছিলাম, এখন দূরে। নিচে বাচ্চারা ফুটবল খেলছে—তাদের পায়ের ধুলো উড়ছে, হাসির শব্দ ভেসে আসছে। ঘরে এসি চালু করলাম, কিন্তু বন্ধ ঘরের গন্ধ যায় না। বাথরুমে টাইলস ফাটা, পানি ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে—ঠান্ডা থেকে গরম হয়ে যাচ্ছে। তোয়ালে ছোট, শরীরে জলের ফোঁটা লেগে থাকল। বিছানায় শুয়ে এসি চালালাম—ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগল। বন্ধ করলাম—ঘরের গরম আর সমুদ্রের লবণের গন্ধ ফিরে এলো। এই ছুটি?
বিকেলে বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখার চেষ্টা করলাম। পাশের বিল্ডিং আড়াল করে দিল। উঠে দাঁড়ালাম, পুরোটা দেখতে গেলাম না। ক্লান্ত ছিলাম, কিন্তু কেন ক্লান্ত—জানি না। কাজ তো করছি না। রাতে ছাদে উঠলাম। ঢেউয়ের একটানা গর্জন কানে লাগছে। হাতে চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, খেয়াল ছিল না। ইন্টারনেট নেই। নিচে বাচ্চাদের খেলার শব্দ ভেসে আসছে। একটা বল ছাদে এসে পড়ল। নামিয়ে দিলাম। তারা ডাকল। নেমে খেললাম। পা বালিতে ডুবে যাচ্ছে, হাঁপ ধরছে—তারা হাসছে। আমিও হাসলাম, কিন্তু শ্বাস নিতে পারছিলাম না। ভাষা না বুঝলেও হাসির তাপ অনুভব করলাম। পরে ছাদে ফিরে গেলাম। চা আরও ঠান্ডা।
পরের সকালে বিছানায় বালুর দানা। কোথা থেকে এলো—জানালা বন্ধ ছিল। হয়তোবা গতকাল, হয়তোবা আমি। ঝেড়ে ফেললাম, কিন্তু কিছুই থেকে গেল। বাজারে হাঁটলাম। তাজা মাছের গন্ধ, রোশির তেলের ঝাঁঝ, হেডিকার মিষ্টি। এক দোকানে কারি খেলাম—মুরগির, মাছের নয়, যদিও মাছের দোকানে বসেছিলাম। পাশে আলী। “দ্বীপ দেখাব?” বাইক ভাড়া করে ঘুরলাম। রাস্তা খারাপ, পাথর। মাঝে মাঝে লাফ দিতে হলো। পেটে কিছু ঠেকল, কিন্তু চিৎকার করলাম না—লজ্জা, আর আলীর কাছে কমপ্লেইন করতে ইচ্ছে করলো না। সূর্যাস্তের সৈকতে স্নরকেলিং। জলে মুখ ডুবিয়ে নিজের শ্বাসের শব্দ শুনলাম—ঠান্ডা জল গালে লাগছে, মাছের ঝাঁক পাশ দিয়ে যাচ্ছে। একটা বড় মাছ এলো, ভয় পেলাম, যদিও সে কিছু করলো না। আলী বলল—দ্বীপের মানুষ সমুদ্রের সাথে লড়াই করে বাঁচে। আমি ভাবলাম, আমি তো লড়াই করি অফিসের সাথে। কী বাঁচি, সেটা জানি না।
মাফুশির দিনশেষে মনে হলো, এই দ্বীপের রঙিন হাসিও যেন আমার ধূসর ক্লান্তিকে ঢাকতে পারছে না। চারপাশের পর্যটকদের হাসি-আনন্দ আমাকে আরও একলা করে দিচ্ছিল। প্রবল ইচ্ছে হলো ভিড় থেকে দূরে, জনমানবহীন কোথাও চলে যাই।
সন্ধ্যায় আলী বলল, “Fulhadhoo যাবে? শান্ত জায়গা।” প্রাইভেট বোটে গেলাম। দাম বেশি ছিল, কিন্তু বললাম না—আলীর সামনে দর কষতে লজ্জা। Fulhadhoo-এ নেমে বাতাসে লবণ কম, শান্তি বেশি। একটা মেয়ে কলসি নিয়ে হাঁটছে—পানির ছলছল শব্দ। ছবি তুলতে গেলাম, সে মুখ ঢেকে ফেলল। তুললাম না, কিন্তু ক্যামেরা হাতে রাখলাম। জানি না কেন।
রাতে জেলেদের নৌকায়। পানি ঢুকছে, হাতে বাঁশ দিয়ে তোলা—হাত জ্বলে যাচ্ছে। ছোট মাছ ধরলাম—পিচ্ছিল, জলে পড়ে গেল। কেউ কিছু বলল না। একা বালুকাময় দ্বীপে বসলাম। জলে নীল আলো জ্বলছে। হাত ডুবালাম—আলো ছড়িয়ে পড়ল। গায়ে ঠান্ডা হাওয়া, চোখে তারা। নিজেকে ছোট মনে হলো, আবার অদ্ভুতভাবে বড়ও। এই অনুভূতির নাম জানি না, কিন্তু ডায়েরিতে লিখলাম—“বড় আর ছোট একসাথে।” পরে পড়লাম, বুঝলাম না কী লিখেছি।
ডাইভিং-এ মান্তা রে—বিশাল ছায়া। নার্স শার্ক পাশ দিয়ে। জলের চাপ কানে লাগছে, হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনছি। একজন বলল কামড়ায় না। বিশ্বাস করলাম, যদিও জানি না সত্যি কি না। পিকনিকে স্থানীয়দের গান—গিটারের তারে দুঃখের ছোঁয়া। আমি শুনলাম, কিন্তু কাঁদলাম না। কাঁদতে পারতাম, কিন্তু পারলাম না। দুপুরে ঝড়। বজ্রের শব্দ, বাতাসের ধাক্কা। ছাদে বসে শুনলাম। ভয় পেলাম, কিন্তু দেখালাম না। পাশের লোকটা বলল কিছু, বুঝলাম না, মাথা নাড়লাম। ঝড় থামলে শান্তি ফিরল—আকাশ পরিষ্কার, বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। এই শান্তি কতক্ষণ, জানি না। কিন্তু তখন ছিল।
একা সমুদ্রের ধারে বসে ভাবলাম—এই অনুভূতি কি টিকবে? Fulhadhoo-এর এক পরিবার কোরাল দেখাল—সাদা, মরা। “গরম, প্লাস্টিক,” বলল ছেলেটা। আমার ফ্লাইটের কথা মনে পড়ল। কিছু করলাম না। তাদের সাথে খেলাম—মাছের গন্ধ, রোশির কড়কড়ে শব্দ। ডায়েরিতে লিখলাম—কালি ফেটে হাত কালো হয়ে গেল। পরে পড়লাম, কিছু বুঝলাম না। তবু লিখলাম।
শেষ দিন মালে। ফ্রাইডে মসজিদের সামনে দাঁড়ালাম—সাদা দেয়ালে সূর্যের আলো। ভেতরে ঢুকলাম না। প্যান্ট ছোট ছিল, লজ্জা। বাজারে শুকনো মাছ কিনলাম—গন্ধ ব্যাগে লেগে থাকল। এখনো আছে, ঢাকায়। ব্যাগ খুললে গন্ধ আসে, কিন্তু খুলতে ইচ্ছে করে না। খাইনি, ফেলিনি। যেন খেলে স্মৃতিটা শেষ হয়ে যাবে, আর ফেললে সেটা স্বীকার করতে হবে যে আমি বদলাইনি। তাই রেখে দিয়েছি। হয়তোবা কোনোদিন খাবো। হয়তোবা না। কিন্তু আছে। থাক।
ঢাকায় ফিরে গন্ধ চিনলাম—ধুলো, ঘাম, রাস্তার ধোঁয়া। বাড়িতে রিয়া বলল, “তোর চোখে কী যেন আছে।” কিছু বললাম না। বলতে পারতাম—“তুমি ঠিক বলেছিলে, গায়ের গন্ধটা লেগে থাকত শার্টে। এখন আর নাই।” কিন্তু বললাম না। কী বলবো, নিজেই জানি না। সোমবার অফিসে গেলাম। বসের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো—আমি কি সত্যিই বদলাতে পারব? কিন্তু মুখে “না” বেরিয়ে গেল। অতিরিক্ত প্রজেক্ট। হাত কাঁপছিল, কিন্তু শব্দটা বের হয়ে গেছে। বস তাকাল, কিছু বলল না। আমিও না। বাসায় গিয়ে রিয়া বলল, “আজ রাতে কথা বলবো?” বললাম, “হ্যাঁ।” গত ছয় মাসে প্রথম। জানি না কতদিন টিকবে। কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে, মালদ্বীপের নীলটা এখনো চোখে লেগে আছে। আর ব্যাগে শুকনো মাছের গন্ধ—যেটা খাইনি, ফেলিনি। হয়তোবা কখনো খাবো। হয়তোবা না। কিন্তু আছে। থাক।
#মালদ্বীপ_ভ্রমণ #লোকাল_মালদ্বীপ #Fulhadhoo #Maafushi #সমুদ্রের_ছোঁয়া #বাংলা_ভ্রমণকাহিনি #প্রকৃতি_ও_আমি #দ্বীপের_গল্প #বাস্তব_অভিজ্ঞতা #ঢাকা_থেকে_মালদ্বীপ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।