পর্ব ২:
হোটেলের সকালের আলো ও রিনপুঙ গোম্পা ট্রেক
সকালটা যেন ভিন্ন এক পৃথিবী থেকে উঠে আসা। হোটেলের বারান্দায় দাঁড়াতেই চোখে পড়ল পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা অপার্থিব রূপ। সূর্যের প্রথম আলো ধীরে ধীরে মেঘ ছেদ করে পাহাড়ের গায়ে পড়ছিল—মনে হচ্ছিল, সবুজ পাহাড় যেন সোনালী আভায় স্নান করছে। দূরের নদী তার কোলাহল ভেঙে কলকল শব্দে বয়ে চলেছে, আর পাখিরা ডানা মেলে যেন নতুন দিনের ঘোষণা দিচ্ছে।
আমি হাতে গরম কফির কাপ, আর টেবিলে রাখা ধোঁয়া ওঠা ভুটানি চা। সকালের নাস্তা হিসেবে স্থানীয় রুটি, ঘি আর সামান্য মধু। প্রতিটি কামড়ে যেন মিশে ছিল পাহাড়ি সতেজতার স্বাদ। বারান্দা থেকে তাকিয়ে দেখছিলাম, দূরে গ্রামগুলো ছোট ছোট বিন্দুর মতো ছড়িয়ে আছে, আর তার মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা ধারা বয়ে গেছে। পাহাড়ি বাতাসে মিশে থাকা অরণ্যের ঘ্রাণ যেন আত্মাকে ভরে তুলছিল।
রিনপুঙ গোম্পার পথে
আজকের পরিকল্পনা ছিল রিনপুঙ গোম্পায় একটি ছোট্ট ট্রেক। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং তাদের আত্মার আশ্রয়।
হোটেল থেকে বের হয়েই শুরু হলো আমার পাহাড়ি পথ চলা। পথটি খাড়া, তবে চারপাশের সৌন্দর্য যেন সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিল। ডান পাশে বয়ে চলা নদীর স্রোত, বাঁ পাশে ঘন জঙ্গলে পাখিদের ডাক, আর মাথার ওপর ঝিরিঝিরি বাতাসের ছোঁয়া—সব মিলিয়ে পথ যেন এক সুরেলা গানের মতো লাগছিল। মাঝে মাঝে পাহাড়ি ফুলের ঘ্রাণ এসে নাকে লাগছিল, যা মনকে আরও প্রফুল্ল করে তুলছিল।
প্রায় আধঘণ্টার পথ পেরিয়ে যখন উপরে উঠলাম, তখন সামনে খুলে গেল এক স্বর্গীয় দৃশ্য। উঁচু পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে লাল ও সোনালি রঙে সজ্জিত রিনপুঙ গোম্পা। নিচে সবুজ ধানক্ষেত, তার পাশেই ছোট ছোট গ্রাম, যেখানে শিশুরা খেলে বেড়াচ্ছে। দৃশ্যটি এমন ছিল যেন ক্যানভাসে আঁকা কোনো চিত্রকর্ম—জীবন্ত অথচ প্রশান্ত।
গোম্পার ভেতরের নীরবতা
গোম্পার ভেতরে প্রবেশ করতেই এক গভীর নীরবতা আমাকে আচ্ছন্ন করল। মোমবাতির আলো, দেয়ালে আঁকা ধর্মীয় চিত্র, আর ভক্তদের প্রার্থনার সুর যেন চারপাশে এক পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। স্থানীয় এক ভিক্ষুর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো। তিনি জানালেন, প্রতিদিন ভোরে এখানকার মানুষজন গোম্পায় আসে, প্রার্থনা করে, এবং শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দেয়। তাদের চোখে আমি যে শান্তি দেখলাম, তা যেন সারাজীবনের জন্য মনে গেঁথে থাকবে।
চায়ের কাপে বিশ্রাম
ট্রেক শেষে আমি থামলাম পাহাড়ের একটি ছোট্ট ক্যাফেতে। কাঠের টেবিল, জানালা দিয়ে ঢুকে আসা রোদ, আর বাইরে নীল পাহাড়ের সারি। এক কাপ গরম পাহাড়ি চা আর মোলায়েম চিজ কেক ক্লান্ত শরীরকে মুহূর্তেই সতেজ করে দিল। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল—যেন এটাই জীবনের প্রকৃত সুখ, যেখানে নেই কোনো কোলাহল, নেই কোনো প্রতিযোগিতা, আছে শুধু প্রকৃতি, মানুষ আর শান্তি।
সেদিন সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে আসার সময় আকাশে তখন সূর্যাস্ত। পাহাড়গুলো লালচে আলোয় মোড়া, আর আকাশে ভেসে যাচ্ছে মেঘের নরম টুকরো। মনে হচ্ছিল, রিনপুঙ গোম্পার নীরবতা এখনও আমার ভেতরে বাজছে।................(চলবে...)
#আমারভুটানভ্রমণ #ভ্রমণকাহিনী #ParoValley #RinpungDzong #BhutanTravel #পাহাড়িভ্রমণ #TravelDiary #MountainTrek #ভ্রমণপ্রেমী #TravelWithZahid #BhutanDiaries #NatureAndPeace #LiteraryTravel #পাহাড়িনীরবতা #SpiritualJourney #মোহাম্মদজাহিদহোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।