আল-হোসেন রেস্টুরেন্ট, ব্যাংকক
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ভ্রমণকাহিনি। ২১ নভেম্বর ২০২৫
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে এসে সুকুমভিটের নানা প্লাজার সয়াই থ্রিতে পা রেখেছেন, অথচ আল-হোসেন রেস্টুরেন্টে একবারও বসে খাননি; এমন মানুষকে খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।
আমি নিজেও এই রেস্টুরেন্টের পুরোনো খদ্দের। বারবার এসেছি, বারবার খেয়েছি। প্রতিবারই দেখেছি, বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষের ঢল। কেউ চিকিৎসা করাতে এসেছেন বামরুণগ্রাদ হাসপাতালে, কেউ বেড়াতে, কেউ ব্যবসা করতে; শেষমেশ সবাই এসে ঠেকেন এখানে।
এবারেও রেস্টুরেন্টটা যেন ছোট্ট বাংলাদেশ। হঠাৎ বাইরের টেবিলে চোখ পড়তে দেরি হলো না, আমার খুব চেনা একটা মুখ বসে আছে। ছোটবেলার পাড়ার ভাই, রাসেল। অনেক বছর আগে সপরিবারে থাইল্যান্ডে চলে গিয়েছিল। এখন দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে ব্যাংককেই সেটেল।
আমি দূর থেকে হাত নাড়তেই ও চিনতে পেরে উঠে দাঁড়াল। “জাহিদ ভাই?!” চিৎকার করে ছুটে এল। জড়িয়ে ধরল এমনভাবে যে পাশের টেবিলের লোকজনও হেসে ফেলল। ওর ছোট মেয়ে, বছর আটেক হবে, লজ্জা পেয়ে বাবার পেছনে লুকাল, কিন্তু চোখ দুটো কৌতূহলে ঝকঝক করছে।
“ভাই, আপনি কবে এলেন? কতদিন থাকবেন? কোথায় উঠেছেন?” প্রশ্নের বন্যা। আমিও ওদের খবর নিলাম। জানলাম, ও এখন সুকুমভিটেই একটা ছোট্ট বিজনেস করে। ছেলে থাই স্কুলে পড়ে, মেয়ে বাংলা-ইংরেজি-থাই তিন ভাষায় কথা বলে। ওর বউ থাই মেয়ে, কিন্তু বাংলা বোঝে, একটু একটু বলতেও পারে। “আঙ্কল আসছেন?” বলে মেয়েটা আমাকে হাত ধরে টানল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমরা দুই টেবিল জুড়ে বসে পড়লাম। রাসেল বলল, “ভাই, আজ আমার ট্রিট। আপনি শুধু খান।” আমি হাসতে হাসতে বললাম, “তোর বয়স হয়েছে আমার ট্রিট খাওয়ার?” শেষে দুজনেই হাসতে হাসতে হেরে গেলাম।
ওর মেয়ে আমার প্লেট থেকে আলু ভর্তা চুরি করে খেতে খেতে বলল, “আঙ্কল, বাংলাদেশে কি সবাই এত ঝাল খায়?” আমি হেসে ওর নাক টিপে দিলাম। রাসেল বলল, “দেশে গেলে ওর মা ওকে ঝাল খেতে দেয় না, এখানে এসে বাংলাদেশি হয়ে যায়।”
সেই পনেরো-কুড়ি মিনিটের আড্ডা যেন বছর দশেক পেছনে টেনে নিয়ে গেল। বিদেশের মাটিতে হঠাৎ পুরোনো পাড়ার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভরে যায়। মনে হয়, আমরা যত দূরেই যাই, একটা অদৃশ্য সুতোয় সবাই বাঁধা আছি।
বিদায়ের সময় রাসেল বলল, “ভাই, পরশু আবার আসবেন। বাসায় নিয়ে যাব।” আমি শুধু মাথা নাড়লাম। চোখ দুটো একটু ভিজে গিয়েছিল বলে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
টেবিলে বসতেই চারদিকে বাংলা কথার ফুলঝুরি। পাশের টেবিলে গুলশান-বনানীর এক পরিবার। সবার গালগোপ্পা নাদুসনুদুস, হাসিঠাট্টায় মুখর। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি মেয়েরা যেন আরেকটু বেশি খোলামেলা হয়ে যান, যা ইচ্ছা পরেন, যেমন ইচ্ছা হাসেন। দেখে মনে মনে হাসি।
রেস্টুরেন্টের মালিক একজন বাংলাদেশি ভাই, বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। স্ত্রী থাই। ছেলে থাই সেনাবাহিনীতে চাকরি করে। আগে নিজে এখানে কর্মচারী ছিলেন, পরে পুরো ব্যবসা কিনে নিয়েছেন। এখনো দেখি কাউন্টারে দাঁড়িয়ে নিজের হাতে হিসাব করছেন, গ্রাহকদের সঙ্গে হেসে কথা বলছেন।
তিনি মধ্যপ্রাচ্যের আরবি খাবারের পাশাপাশি বাঙালির জিভের স্বাদকে এত যত্নে ধরে রেখেছেন যে, মনে হয় দেশেই বসে আছি। ওয়েটাররা বহুভাষী। বাংলাদেশি মুখ দেখলেই বাংলায় এসে বলে, “কী খাবেন ভাই?” বিদেশে মাতৃভাষা শুনে বুকটা যেন ঠান্ডা হয়ে যায়।
বসতেই প্রথমে আসে পানি, তারপর সালাদ আর সেই বিখ্যাত লাল ঝাল চাটনি; এক চামচ মুখে দিলেই লালা ঝরে! আমরা মেনু দেখিনি, মুখে মুখেই অর্ডার। আলু ভর্তা ছাড়া কি চলে? আল-হোসেনের আলু ভর্তা এখন লিজেন্ড।
আমার বিশেষ পছন্দ টমেটো পেস্টে তাজা তেলাপিয়া ভুনা। রান্না হতে প্রায় আধ ঘণ্টা লাগে, কিন্তু অপেক্ষার প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। মাছের টুকরো মুখে দিতেই চোখ বুজে আসে; যেন মায়ের হাতের রান্না।
ওয়েটার ভাইয়েরা অসাধারণ। একজন বললেন, “ভাই, তেলাপিয়াটা অনেক বড়, দুজনে একটা খেয়েও শেষ করতে পারবেন না।” আরেকদিন রাতে রুটি-সবজি খেতে গিয়ে শুনি, “এক বাটি সবজিতেই হয়ে যাবে, মুগডাল বাদ দেন।” সত্যি কথা; আমরা খেতে খেতে হেরে গিয়েছিলাম!
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিদের এত সাফল্য দেখলে বুক ভরে যায়। মনে হয়, একদিন হয়তো পৃথিবীর সব রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ডে বাংলা নামই জ্বলবে। সেই স্বপ্ন এখানে বসে একটু একটু করে সত্যি হতে দেখি।
যারা ব্যাংকক আসবেন, সয়াই থ্রির সেই ছোট্ট গলিতে একবার ঢুকে পড়বেনই। সন্ধ্যা নামলেই জায়গা পাওয়া দায়। কিন্তু একবার বসলে আর উঠতে ইচ্ছে করবে না। কারণ এখানে শুধু খাবার নয়, এক টুকরো বাংলাদেশ পরিবেশন করা হয় প্লেট ভর্তি করে।
#আলহোসেন_রেস্টুরেন্ট #ব্যাংকক_ডায়েরি #বাংলাদেশি_স্বাদ_বিদেশে #সয়াইথ্রি #বাঙালির_ঠিকানা #থাইল্যান্ড_ভ্রমণ #মোহাম্মদজাহিদহোসেন #বাংলা_খাবার_ব্যাংকক #হালাল_ফুড #প্রবাসী_জীবন #বাংলাদেশি_প্রবাসী
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।