#বউ_আমার_ঝগড়ার_রানী ❤️
#পর্ব: ১৮
#লেখক_মিস্টার_পেন্সিল
সকালে ঘুম থেকে উঠেই জারা নওশীন সিদ্ধান্ত নিল, আজ সে কোনোভাবেই রুদ্র রহমানের কথায় গলবে না।
একদম না!
ছেলেটা নাকি আজ নাটকের মঞ্চে স্ক্রিপ্টের বাইরে একটা সত্যি কথা বলবে। কথাটা কী, সেটা জারা জানে না। কিন্তু তার মনে হচ্ছে, রুদ্র আবার এমন কিছু বলবে, যার উত্তর দিতে গিয়ে তাকে নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে।
জারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে নিজেকে বলল,
— আমি ভয় পাই না। আমি কাউকে ভয় পাই না। আর রুদ্রকে তো একদমই না!
ঠিক তখনই মিমির ফোন এল।
— সুপ্রভাত, ভবিষ্যৎ ভাবি!
জারা চোখ বন্ধ করল।
— তুই কি কোনো দিন স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবি না?
— পারব। যেদিন তুই রুদ্র ভাইকে ভালোবাসিস বলে স্বীকার করবি।
— তাহলে তোকে সারা জীবন অপেক্ষা করতে হবে।
মিমি হেসে বলল,
— ঠিক আছে। আমি অপেক্ষা করছি। তবে একটা কথা বল—আজ রুদ্র ভাই যদি সবার সামনে বলে, সে তোকে ভালোবাসে, তখন কী করবি?
জারা চুলের বাঁধনটা শক্ত করতে করতে বলল,
— বলব, নাটকের সংলাপ ভালো হয়েছে!
— আর যদি বলে, নাটক শেষ হলেও সে তোর সঙ্গে থাকতে চায়?
জারার হাত থেমে গেল।
মিমি এবার নরম স্বরে বলল,
— দেখ, তোকে কেউ জোর করছে না। কিন্তু নিজের মনকে সবসময় ঝগড়া দিয়ে চুপ করিয়ে রাখিস না।
জারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— ফোন রাখ। দেরি হচ্ছে।
মিমি হেসে বলল,
— যা, ঝগড়ার রানী। আজ তোর রাজ্যে প্রেমের বিচার বসুক!
জারা ফোন কেটে দিয়ে বিড়বিড় করল,
— এই মেয়েটাকে একদিন সত্যি সত্যি বিচার করতে হবে!
কিন্তু নিজের অজান্তেই সে হাসছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম আজ রঙিন আলো, ফুল আর ব্যানারে সাজানো হয়েছে। সামনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক—সব মিলিয়ে বেশ বড় আয়োজন।
জারা মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে স্ক্রিপ্টের পাতা উল্টাচ্ছিল। যদিও সে সংলাপ মুখস্থ করে ফেলেছে, তবু বারবার একই পাতা দেখছে।
রুদ্র পাশে এসে দাঁড়াল।
— এতবার স্ক্রিপ্ট দেখছিস কেন? নতুন কোনো সংলাপ লিখবি নাকি?
জারা চোখ না তুলেই বলল,
— নিজের কাজ কর।
— নিজের কাজই করছি। নায়িকার খোঁজ নিচ্ছি।
— নায়িকা ঠিক আছে। নায়ককে দেখে মনে হচ্ছে, তার মাথায় সমস্যা আছে।
রুদ্র হাসল।
— নায়িকার কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার আশায় আছি। মাথার একটু সমস্যা তো হবেই।
জারা এবার তার দিকে তাকাল।
— তুই কি আজও স্ক্রিপ্টের বাইরে কথা বলবি?
রুদ্রের মুখের হাসিটা একটু শান্ত হলো।
— হ্যাঁ।
— কী বলবি?
— সেটা আগে বলে দিলে তো আর চমক থাকবে না।
জারা বিরক্ত হয়ে বলল,
— আমি চমক পছন্দ করি না।
— জানি। তুই সবকিছুর আগে ঝগড়া পছন্দ করিস।
— রুদ্র!
— আচ্ছা, আর বলছি না।
সে চলে যেতে উদ্যত হলে জারা হঠাৎ বলে উঠল,
— শোন!
রুদ্র ফিরে তাকাল।
— কী?
জারা একটু ইতস্তত করে বলল,
— যা-ই বলিস, আমাকে যেন সবার সামনে বিব্রত হতে না হয়।
রুদ্র এবার পুরোপুরি গম্ভীর হয়ে গেল।
— কথা দিচ্ছি। তোর সম্মান বা স্বস্তির চেয়ে আমার কোনো সংলাপ বড় নয়। তুই অস্বস্তিতে পড়িস, এমন কিছু আমি করব না।
জারা তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর সে মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে।
রুদ্র মৃদু হাসল।
— আর একটা কথা?
— আবার কী?
— আজ কিন্তু তুই খুব সুন্দর লাগছিস।
জারা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— তোর চোখ পরীক্ষা করা দরকার!
রুদ্র হেসে চলে গেল।
জারা মনে মনে বলল, ‘ছেলেটা এমন কেন? এক মুহূর্তে রাগিয়ে দেয়, পরের মুহূর্তেই সব রাগ ভুলিয়ে দেয়!’
নাটক শুরু হলো সন্ধ্যা ছয়টায়।
প্রথম কয়েকটি দৃশ্য বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে গেল। দর্শক হাসল, হাততালি দিল। তন্ময় মঞ্চের পাশ থেকে জারাকে থাম্বস-আপ দেখাল। মিমি সামনের সারিতে বসে এমনভাবে হাসছিল, যেন নাটকের গল্পের চেয়ে নায়ক-নায়িকার বাস্তব সম্পর্ক নিয়েই তার আগ্রহ বেশি।
অবশেষে এল শেষ দৃশ্য।
নাটকে জারার চরিত্রটি দীর্ঘদিন ধরে নায়ককে ভুল বুঝেছে। নায়ক বারবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু মেয়েটি নিজের ভয় আর অভিমানের কারণে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেনি।
শেষ মুহূর্তে নায়ক তার সামনে এসে দাঁড়াল।
রুদ্র সংলাপ শুরু করল,
— তুমি সবসময় ভাবো, আমি তোমাকে হারানোর ভয় দেখিয়ে তোমার কাছ থেকে উত্তর আদায় করতে চাই। কিন্তু আমি চাই না তুমি ভয় পেয়ে আমার পাশে দাঁড়াও। আমি চাই, তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার পাশে দাঁড়াও।
জারা নিজের সংলাপ বলল,
— আর যদি আমি কখনো তোমাকে বিশ্বাস করতে না পারি?
রুদ্র এক মুহূর্ত থামল।
তারপর স্ক্রিপ্টের বাইরে বলল,
— তাহলে আমি তোমাকে বিশ্বাস করার জন্য সময় দেব। কারণ তোমাকে ভালোবাসার মানে এই নয় যে তোমাকে আমার মতো করে চলতে হবে। তোমার নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে।
অডিটোরিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
জারা সংলাপের পরের লাইন ভুলে গেল।
কারণ কথাগুলো শুধু নাটকের নায়িকার জন্য ছিল না। সে বুঝতে পারছিল, রুদ্র তার সঙ্গে কথা বলছে।
রুদ্র আবার বলল,
— আমি তোমার প্রতিটি রাগ পছন্দ করি, এমন নয়। কিন্তু তোমার রাগের আড়ালে যে মানুষটা ভয় পায়, যে নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখে, তাকেও আমি বুঝতে চাই। তুমি আজ আমাকে উত্তর না দিলেও চলবে। শুধু নিজের মনকে ভয় পেয়ে কোনো উত্তর দিও না।
জারার চোখ ভিজে উঠল।
সে স্ক্রিপ্টের কথা ভুলে নিজের মতো করে বলল,
— আর যদি একদিন আমি নিজেই তোমার কাছে ফিরে আসতে চাই?
রুদ্রের চোখে মৃদু হাসি ফুটল।
— তাহলে দরজাটা খোলা থাকবে।
জারা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নাটকের শেষ সংলাপটি বলল,
— তাহলে আজ থেকে পালিয়ে নয়, তোমার পাশে দাঁড়িয়ে পথ চলতে শিখব।
দর্শক হাততালিতে অডিটোরিয়াম ভরিয়ে দিল।
কিন্তু জারার কাছে তখন হাততালির কোনো শব্দই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের মনের একটা দরজা একটু খুলে দিয়েছে।
রুদ্র হাত বাড়িয়ে দিল। নাটকের নিয়ম অনুযায়ী তাদের একসঙ্গে দর্শকদের অভিবাদন জানানোর কথা।
জারা তার হাত ধরল।
এবার সে হাতটা লুকাল না।
মঞ্চ থেকে নামতেই মিমি ছুটে এসে জারাকে জড়িয়ে ধরল।
— তুই দেখেছিস কী হয়েছে? রুদ্র ভাই তো আজ সরাসরি হৃদয়ের দরজায় কড়া নেড়েছে!
জারা বলল,
— মিমি, আস্তে কথা বল!
— কেন? সবাই শুনুক! আমি তো আগেই বলেছিলাম, এই নাটকের শেষ দৃশ্যটা তোদের বাস্তব জীবনের ট্রেলার!
তন্ময়ও এসে যোগ দিল।
— ভাই, তোর সংলাপ শুনে আমারও প্রেম করতে ইচ্ছে করছে!
রুদ্র হেসে বলল,
— আগে কাউকে খুঁজে বের কর। তারপর সংলাপ লিখিস।
তন্ময় দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— বন্ধুরা প্রেমে পড়লে বন্ধুরাই সবচেয়ে বেশি একা হয়ে যায়!
জারা হাসি চাপতে পারল না।
ঠিক তখনই তার মা এগিয়ে এলেন। পাশে রুদ্রের মাও ছিলেন।
জারার মা বললেন,
— নাটকটা খুব সুন্দর হয়েছে। তোমাদের অভিনয় দেখে সত্যিই ভালো লাগল।
রুদ্রের মা হেসে বললেন,
— আমাদের ছেলেটা আজ বেশ ভালোই অভিনয় করেছে!
জারা মাথা নিচু করে বলল,
— জি, আন্টি।
রুদ্রের মা মৃদু হেসে তার হাত ছুঁয়ে বললেন,
— তোমরা দুজন একে অপরকে বুঝে চলতে পারলে সেটাই সবচেয়ে ভালো। তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
জারার বুকের ভেতর স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল। অন্তত এখানে কেউ তাকে এখনই কোনো উত্তর দিতে বলছেন না।
কিন্তু ঠিক তখনই জারার মা বললেন,
— জারা, বাড়ি গিয়ে তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।
জারা মায়ের মুখের দিকে তাকাল।
— কী কথা, আম্মু?
মা মৃদু হাসলেন।
— আগে বাড়ি চল। তারপর বলব।
জারার মনে আবার অস্বস্তি ফিরে এল।
রাতে বাড়ি ফিরে জারা মায়ের ঘরে গেল। মা বিছানায় বসে ছিলেন। জারাকে পাশে বসতে ইশারা করলেন।
— আজ তোমার অভিনয় দেখে একটা কথা মনে হলো, মা।
জারা সতর্ক হয়ে বসল।
— কী কথা?
— তুমি রুদ্রকে আগের মতো অপছন্দ করো না, তাই তো?
জারা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আমি এমন কিছু বলিনি!
মা হাসলেন।
— আমি তো বলিনি তুমি ভালোবাসো। শুধু জিজ্ঞেস করলাম, অপছন্দ করো কি না।
জারা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল।
মা তার হাত ধরে বললেন,
— রুদ্রের পরিবার আজ আমাদের সঙ্গে একটা কথা বলেছে। তারা চায়, তোমরা দুজন যদি নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে নিশ্চিত হও, তাহলে দুই পরিবার বসে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে পারে। এখনই বিয়ে নয়, কোনো তাড়াহুড়োও নয়। শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা পরিষ্কার ধারণা।
জারা স্থির হয়ে গেল।
— মানে, আবার বিয়ের কথা?
— বিয়ের জন্য চাপ নয়, মা। তারা তোমার মতামতকে গুরুত্ব দেবে বলেছে। আমরাও দেব। তুমি না চাইলে কিছুই হবে না।
জারা মাথা নিচু করল।
তার মনে পড়ল রুদ্রের কথা—‘তোমার নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে।’
সে ধীরে বলল,
— আম্মু, আমি রুদ্রকে হারাতে চাই না। কিন্তু এখনই কোনো সম্পর্ককে বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে বেঁধে ফেলতে চাই না। আমি আগে ওকে আরও ভালোভাবে জানতে চাই।
মা স্নেহভরে তার মাথায় হাত রাখলেন।
— তাহলে সেটাই বলবে। নিজের সত্যিটা বলতে ভয় পেও না।
জারা মাকে জড়িয়ে ধরল।
— তুমি আমার ওপর রাগ করবে না তো?
— তোর জীবন নিয়ে নিজের মতামত জানালে আমি কেন রাগ করব?
জারার চোখে পানি চলে এল। এতদিন সে ভেবেছিল, ভালোবাসা মানেই হয়তো এমন একটা সিদ্ধান্ত, যেটা নিতে দেরি করলে সবাই অভিমান করবে। আজ বুঝল, তাকে সময় দেওয়ার মানুষও আছে।
ঘরে ফিরে জারা রুদ্রকে মেসেজ দিল।
জারা: আজকের সংলাপগুলো কি শুধু নাটকের জন্য ছিল?
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
রুদ্র: না। তবে আমি তোকে কোনো উত্তর দিতে বাধ্য করব না।
জারা লিখল—
জারা: আমাদের পরিবার আবার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে চায়। আনুষ্ঠানিকভাবে বসার কথাও বলেছে।
রুদ্রের উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।
রুদ্র: তুই কী চাস?
জারা দীর্ঘক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল—
জারা: আমি চাই, আমরা একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝি। আমি তোকে হারাতে চাই না। কিন্তু এখনই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত নই।
রুদ্রের উত্তর এল—
রুদ্র: তাহলে সেটাই হবে। তোর প্রস্তুতির আগে কোনো সিদ্ধান্ত নয়। আমরা ধীরে এগোব।
জারার ঠোঁটে হাসি ফুটল।
জারা: আর একটা কথা।
রুদ্র: বল, ঝগড়ার রানী।
জারা: আজ মঞ্চে তুই যা বলেছিস, সেটা আমার ভালো লেগেছে।
রুদ্র: শুধু সংলাপটা?
জারা চোখ ঘুরিয়ে লিখল—
জারা: বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। প্রশংসা ফিরিয়ে নেব!
রুদ্র: ঠিক আছে। তবে আমি আজ খুব খুশি।
জারা: কেন?
রুদ্র: কারণ আজ তুই আমাকে হারানোর ভয় নয়, পাশে থাকার ইচ্ছার কথা বলেছিস।
জারা ফোনটা বুকে চেপে ধরল।
তারপর ডায়েরি খুলে লিখল—
“আজ বুঝলাম, ভালোবাসা মানে সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়। ভালোবাসা মানে এমন একজনকে পাওয়া, যার সামনে নিজের ভয়টুকুও লুকাতে হয় না। আমি এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই। কিন্তু রুদ্রের সঙ্গে পথ চলার ইচ্ছেটা আজ আর অস্বীকার করতে পারছি না।”
ডায়েরি বন্ধ করে সে জানালার বাইরে তাকাল।
তার জীবনে প্রথমবার মনে হলো, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় থাকলেও সেই ভবিষ্যতের কথা ভাবতে তার আর একা লাগছে না।
তবে জারা জানত না, পরদিন দুই পরিবারের আলোচনায় এমন একটি প্রশ্ন উঠবে, যার উত্তর দিতে গিয়ে তাকে নিজের মনের সবচেয়ে কঠিন সত্যটির মুখোমুখি হতে হবে।
চলবে… ❤️
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।