#বউ_আমার_ঝগড়ার_রানী ❤️🔥
#পর্ব: ২
#লেখক: মিস্টার পেন্সিল
সকাল ৮টা ৩০ মিনিট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সকালের রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে রাস্তার ওপর। শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত চলাফেরার মাঝেই জারা নওশীন তার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী মিমির সঙ্গে হাঁটছিল।
জারার মুখটা আজও গম্ভীর।
মিমি কয়েকবার তার দিকে তাকিয়ে অবশেষে হেসে বলল,
— কী রে, সকাল সকাল মুখটা এমন করে রেখেছিস কেন? মনে হচ্ছে কেউ তোর প্রিয় চকলেট চুরি করেছে!
জারা বিরক্ত হয়ে বলল,
— চকলেট চুরি করলে এত রাগ হতো না।
— তাহলে কী হয়েছে?
— কিছু হয়নি।
— ওহ! বুঝেছি। গতকালের সেই কালো গাড়িতে আসা ছেলেটার কথা মনে পড়ছে, তাই না?
জারা থমকে দাঁড়াল।
— মিমি, একদম ওর নাম নিবি না!
মিমি হেসে বলল,
— নাম তো নিলামই না। তুই নিজেই বুঝে গেলি!
— ছেলেটার নাম রুদ্র। আর ও একটা আস্ত বিরক্তিকর প্রাণী!
— তা হলে গতকাল ও যখন তোর কাছে ক্ষমা চাইল, তখন মাফ করে দিলি কেন?
জারা একটু থেমে বলল,
— ক্ষমা করেছি মানে এই না যে ওকে আমার মাথায় উঠে নাচতে বলেছি। গতকাল বলেছিল আর বিরক্ত করবে না। আজ যদি আবার শুরু করে, তাহলে বুঝিয়ে দেব জারা নওশীন কাকে বলে!
মিমি মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে, ঝগড়ার রানী। আজ তোর রাজত্বে যেন কোনো যুদ্ধ না লাগে!
জারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
— আজ আমি কোনো ঝগড়াই করব না। কেউ আমাকে বিরক্ত না করলে আমিও কাউকে বিরক্ত করি না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
— সুপ্রভাত, ঝগড়ার রানী!
জারা চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। মনে মনে বলল, আল্লাহ, সকালটা অন্তত শান্তিতে কাটতে দাও!
পেছনে ফিরে দেখল, রুদ্র রহমান দাঁড়িয়ে আছে। পরনে কালো শার্ট, কাঁধে ব্যাগ, মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
রুদ্র হাসতে হাসতে বলল,
— গতকাল তো আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলে। আজ আবার নতুন করে রাগ করার কী হলো?
জারা চোখ সরু করে তাকাল।
— আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি, দত্তক নিইনি যে প্রতিদিন এসে আমার পেছনে ঘুরবে!
মিমি মুখ চেপে হাসল।
রুদ্র বুকের ওপর হাত রেখে বলল,
— বাহ! সকাল সকাল এমন কথা! অথচ আমি ভেবেছিলাম, গতকালের পর আজ অন্তত একটা সুন্দর হাসি উপহার পাবে এই নিরীহ ছেলেটা।
— নিরীহ? তোমার মতো নির্লজ্জ ছেলেকে নিরীহ বললে নিরীহ শব্দটার অপমান হবে!
— আচ্ছা, তাহলে আজ থেকে তোমাকে বিরক্ত করব না।
জারা একটু অবাক হলো। সে ভেবেছিল রুদ্র আবারও কোনো কথা বলে তাকে রাগিয়ে দেবে।
রুদ্র ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে বলল,
— কথা দিলাম। তোমার অনুমতি ছাড়া তোমাকে বিরক্ত করব না।
কথাটা বলে সে সত্যিই চলে গেল।
জারা কয়েক সেকেন্ড তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
মিমি কনুই দিয়ে খোঁচা দিয়ে বলল,
— কী হলো? যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই প্রতিপক্ষ আত্মসমর্পণ করে ফেলল?
জারা মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— ভালোই হয়েছে। অন্তত আজ শান্তিতে ক্লাস করতে পারব।
কিন্তু তার মনে কোথাও একটা ছোট্ট প্রশ্ন থেকে গেল—রুদ্র সত্যিই আর বিরক্ত করবে না, নাকি এটা তার নতুন কোনো চাল?
সকাল ৯টা।
ক্লাসরুমে ঢুকেই জারা নিজের জায়গায় বসে খাতা বের করছিল। মিমি পাশের চেয়ারে বসে ফোন দেখছিল।
হঠাৎ দরজার কাছে কয়েকজনের হাসির শব্দ শোনা গেল। জারা মাথা তুলে তাকাতেই তার মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল।
রুদ্র!
ছেলেটা ক্লাসে ঢুকে একবারও জারার দিকে তাকাল না। সামনের দিকে গিয়ে তন্ময়ের পাশে বসে ব্যাগ থেকে খাতা বের করতে লাগল।
জারা মনে মনে বলল, বাহ! আজ তাহলে কথা রাখছে!
কিন্তু কয়েক মিনিট পর শিক্ষক ক্লাসে এসে ঘোষণা দিলেন,
— আগামী সপ্তাহে তোমাদের একটা দলগত প্রজেক্ট জমা দিতে হবে। আমি দলগুলো ঠিক করে দিয়েছি। জারা নওশীন আর রুদ্র রহমান একই দলে থাকবে।
জারা প্রায় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
— স্যার, অন্য কাউকে কি আমার সঙ্গে দেওয়া যায় না?
শিক্ষক চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
— কেন? কোনো সমস্যা?
জারা কিছু বলার আগেই রুদ্র শান্ত গলায় বলল,
— স্যার, আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি জারার সঙ্গে কাজ করতে পেরে খুশি।
জারা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— তোমার খুশি নিয়ে আমি চিন্তিত নই!
ক্লাসে কয়েকজন হেসে উঠল।
শিক্ষক গম্ভীর হয়ে বললেন,
— এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম, ঝগড়ার মঞ্চ নয়। প্রজেক্টের কাজে কোনো সমস্যা হলে সরাসরি আমাকে জানাবে। ব্যক্তিগত খুনসুটি যেন কাজের ক্ষতি না করে।
দুজনেই চুপ করে গেল।
ক্লাস শেষে জারা খাতা গুছিয়ে রুদ্রের সামনে দাঁড়াল।
— শোনো, প্রজেক্টের কাজ ঠিকভাবে করবে। ব্যক্তিগত কোনো কথা নয়, কোনো বাড়তি মজা নয়। বিকেল চারটায় লাইব্রেরিতে দেখা করবে।
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে।
জারা চলে যেতে উদ্যত হলে সে আবার বলল,
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— কী?
— তুমি কি সব সময় এত রাগী, নাকি আমার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা?
জারা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে। বেশি বিরক্ত করলে প্রজেক্টের সব কাজ তোমাকে একা করতে দেব!
রুদ্র হেসে বলল,
— বুঝেছি। তুমি আসলে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তা করো।
— রুদ্র!
— আচ্ছা, আচ্ছা! আর বলছি না।
জারা চলে গেল। রুদ্র তার পেছনে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তবে এবার সে আর পেছন থেকে কিছু বলল না।
বিকেল ৪টা ২০ মিনিট।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে জারা ঘড়ির দিকে তাকাল। রুদ্রের আসার কথা ছিল চারটায়। বিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে।
জারা বিরক্ত হয়ে মিমিকে মেসেজ লিখল, দেখেছিস? প্রথম দিনেই দেরি! এই ছেলেকে দিয়ে প্রজেক্ট করানো মানে নিজের হাতে নিজের বিপদ ডেকে আনা।
ঠিক তখনই সামনে একটা কফির কাপ রাখা হলো।
— তোমার জন্য।
জারা মাথা তুলে দেখল, রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে। হাতে আরেকটা কফি আর কিছু নাশতা।
— বিশ মিনিট দেরি কেন?
রুদ্র চেয়ার টেনে বসে বলল,
— পথে একটা ছোট সমস্যা হয়েছিল।
— কী সমস্যা?
— কফির দোকানে তোমার জন্য চিনি ছাড়া কফি বানাতে গিয়ে দোকানদার আমাকে সন্দেহের চোখে দেখছিল। বলল, এত সুন্দর মেয়ের জন্য চিনি ছাড়া কফি কেন?
জারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— তুমি কি সব সময় মিথ্যা কথা বলো?
— না। শুধু তোমার সামনে সত্যি কথা বললে তুমি বিশ্বাস করো না বলে মিথ্যার আশ্রয় নিই।
— রুদ্র, আমি কিন্তু উঠে চলে যাব!
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
— ঠিক আছে, দুঃখিত। দেরি করা আমার ভুল হয়েছে। এবার কাজ শুরু করি?
জারা একটু অবাক হলো। সে ভেবেছিল ছেলেটা আবারও মজা করবে। কিন্তু রুদ্র সত্যিই খাতা খুলে প্রজেক্টের বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর জারা বুঝতে পারল, রুদ্র শুধু কথা বলতে জানে না; কাজও বেশ ভালো পারে। সে তথ্যগুলো গুছিয়ে লিখছে, প্রয়োজনীয় বিষয় খুঁজে বের করছে, এমনকি জারার কয়েকটি প্রস্তাবও মন দিয়ে শুনছে।
জারা অবাক হয়ে বলল,
— তুমি পড়াশোনাও করো নাকি?
রুদ্র মাথা তুলে তাকাল।
— না, আমি শুধু দেখতে ভালো বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। ক্লাসরুমটা আমার ফটোশুটের জায়গা।
জারা হেসে ফেলল।
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— কী হলো? হাসলে যে!
জারা সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে বলল,
— কিছু হয়নি। তোমার কথা শুনে হাসি পেয়ে গেছে।
— তাহলে আরও দু-একটা বলি?
— বললে কফিটা তোমার মাথায় ঢেলে দেব!
রুদ্র হাসতে হাসতে কাজে মন দিল।
তবে মনে মনে সে ভাবল, জারার এই হাসিটা দেখার জন্য আরও অনেক ঝগড়াও করা যায়। কিন্তু সে জানত, মেয়েটাকে অস্বস্তিতে ফেলে নয়—তার বিশ্বাস অর্জন করেই কাছে যেতে হবে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। কাজ শেষ করে দুজন লাইব্রেরি থেকে বের হলো। বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে।
জারা ব্যাগ থেকে ছাতা বের করতে গিয়ে বুঝল, ছাতাটা আজ আনেনি।
রুদ্র নিজের ছাতাটা খুলে বলল,
— বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত একসঙ্গে যাবে?
জারা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
— ঠিক আছে। তবে ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে কোনো ফালতু কথা বলবে না।
— কথা দিলাম।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। বৃষ্টির শব্দের মাঝে কিছুক্ষণ নীরবতা রইল।
হঠাৎ জারা বলল,
— একটা কথা বলি? আমি সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না।
রুদ্র তার দিকে তাকাল, কিন্তু বাধা দিল না।
জারা ধীরে ধীরে বলল,
— অনেক মানুষ প্রথমে খুব ভালো ব্যবহার করে। তারপর একসময় বদলে যায়। তাই কেউ বেশি ভালো হতে চাইলে আমার সন্দেহ হয়।
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— তোমার সন্দেহ করার কারণ থাকতে পারে। আমি তোমাকে জোর করে বিশ্বাস করাতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে পারি, কাউকে চিনতে সময় লাগে।
জারা তার দিকে তাকাল।
— আর তুমি? তোমাকে চিনতে কত দিন লাগবে?
রুদ্র মৃদু হাসল।
— সেটা তো তোমার ওপর নির্ভর করছে। তবে একটা কথা, আমাকে চিনতে চাইলে মাঝে মাঝে ঝগড়া করতেই হবে।
জারা চোখ বড় করে বলল,
— আবার শুরু করলে?
— না, শেষ কথা বলছিলাম।
— তোমার শেষ কথা বলে কিছু নেই!
— ঠিক বলেছ। তোমার সঙ্গে কথা বললে আমার কথারও মেয়াদ শেষ হয় না।
জারা বিরক্তির ভান করলেও ঠোঁটের কোণে হাসি লুকাতে পারল না।
বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে সে ছাতার নিচ থেকে বেরিয়ে বলল,
— কাল প্রজেক্টের বাকি কাজ শেষ করব। সময়মতো আসবে।
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
— অবশ্যই, ঝগড়ার রানী।
— আবার ওই নামে ডাকলে কিন্তু—
— আচ্ছা, জারা নওশীন!
জারা বাসে উঠে জানালার পাশে বসল। বাস চলতে শুরু করলে সে একবার পেছনে তাকাল। রুদ্র তখনও দাঁড়িয়ে, হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে।
জারা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল।
ছেলেটা বিরক্তিকর। একদম বিরক্তিকর!
তবু কেন জানি, তার মনে হচ্ছিল—আজকের দিনটা গতকালের মতো খারাপ ছিল না।
রাতে নিজের ঘরে বসে জারা মিমিকে মেসেজ করল—
জারা: আজ রুদ্রের সঙ্গে প্রজেক্ট করেছি।
মিমি: বাহ! কেমন হলো?
জারা: কাজ ভালো পারে। কিন্তু কথা বেশি বলে।
মিমি: আর ছেলেটা কেমন?
জারা: বললাম তো, বিরক্তিকর!
মিমি: আমি কিন্তু তোর প্রশ্নের উত্তর পাইনি!
জারা ফোনটা বিছানায় ছুড়ে রেখে বালিশে মুখ গুঁজে দিল।
— অসহ্য! দুজনেই অসহ্য!
অন্যদিকে রুদ্র নিজের ঘরে বসে প্রজেক্টের ফাইল গুছিয়ে রাখছিল। তন্ময় ফোন করে জিজ্ঞেস করল,
— কী রে, ঝগড়ার রানীর সঙ্গে কাজ কেমন হলো?
রুদ্র হেসে বলল,
— ভালো। মেয়েটা রাগী, কিন্তু নিজের কাজের ব্যাপারে খুব মনোযোগী।
— তা হলে প্রেমে পড়ে গেলি?
— এত তাড়াতাড়ি না, ভাই। আগে ওর বিশ্বাস অর্জন করতে হবে।
তন্ময় হাসল।
— তোর মতো দুষ্টু ছেলের মুখে এমন কথা মানায় না!
রুদ্র জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির ফোঁটা তখনও কাচ বেয়ে নামছে।
— সবকিছু মজা দিয়ে শুরু করা যায়, তন্ময়। কিন্তু কারও অনুভূতি নিয়ে মজা করা যায় না।
ফোন রাখার পর রুদ্রের মুখে আবার সেই দুষ্টু হাসি ফিরে এল।
কাল আবার দেখা হবে জারার সঙ্গে।
আর জারা মনে মনে ঠিক করে রেখেছে,
কাল থেকে রুদ্রকে একটুও ছাড় দেবে না।
দুজনেই জানে না, তাদের এই ছোট ছোট ঝগড়ার ভেতরেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এমন এক অনুভূতি, যার নাম কেউ এখনো স্বীকার করতে রাজি নয়।
চলবে… ❤️🔥
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।