#বউ_আমার_ঝগড়ার_রানী ❤️🔥
#পর্ব: ৩
#লেখক: মিস্টার পেন্সিল
সকালবেলা জারা নওশীনের ঘরে যুদ্ধ চলছে।
না, কোনো শত্রু আক্রমণ করেনি। যুদ্ধটা হচ্ছে জারা আর তার আলমারির মধ্যে।
এতগুলো পোশাক থাকার পরও মেয়েটার মনে হচ্ছে, আজ পরার মতো কিছুই নেই!
— উফফ! আমার কোনো সুন্দর জামা নেই কেন?
পাশ থেকে মিমি ফোনে কথা বলতে বলতে বলল,
— তোর আলমারিতে যে জামার পাহাড়, সেগুলো কি প্রতিবেশীর?
জারা একটা গোলাপি কামিজ হাতে নিয়ে বলল,
— এটা পরলে আমাকে বাচ্চা মনে হবে।
আরেকটা নীল জামা হাতে নিল।
— এটা পরলে মনে হবে বিয়েবাড়িতে যাচ্ছি।
মিমি বিরক্ত হয়ে বলল,
— তাহলে কিছু না পরেই চলে যা। ক্যাম্পাসে গিয়ে সবাই তোর ব্যক্তিত্ব দেখবে!
জারা বালিশ ছুড়ে মারল।
— তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল!
মিমি হেসে বলল,
— আর রুদ্রের সঙ্গে ঝগড়া করাটা তোর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের কাজ!
রুদ্রের নাম শুনেই জারা থমকে গেল।
— আবার ওই ছেলের নাম নিলি কেন?
— কারণ সকালে ঘুম থেকে উঠে তুই জামার চেয়ে রুদ্রের মেসেজ বেশি দেখেছিস।
জারা তাড়াতাড়ি ফোনটা উল্টে রাখল।
— আমি শুধু দেখছিলাম, ও প্রজেক্টের কোনো খবর দিয়েছে কি না!
মিমি ভ্রু তুলে বলল,
— ওহ! এখন আবার প্রজেক্টের অজুহাত!
— মিমি, তুই আমার বন্ধু নাকি আমার শত্রু?
— পরিস্থিতি অনুযায়ী দুটোই!
অবশেষে জারা একটা হালকা নীল কামিজ পরে তৈরি হলো। আয়নায় নিজেকে দেখে সন্তুষ্ট হয়ে বলল,
— আজকে আমি কারও সঙ্গে ঝগড়া করব না।
মিমি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বলল,
— এই কথাটা শুনে রুদ্রের খুব ভয় পাওয়া উচিত!
জারা ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
— ওকে দেখলেই আমি রাস্তা বদলে ফেলব।
মিমি হেসে বলল,
— গতকালও তো একই কথা বলেছিলি!
জারা আর কোনো উত্তর দিল না। তবে নিজের অজান্তেই ফোনের স্ক্রিনে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
রুদ্রের কোনো নতুন মেসেজ নেই।
কেন যেন ব্যাপারটা দেখে তার একটু বিরক্ত লাগল।
ভালোই হয়েছে! অন্তত আজ শান্তি পাওয়া যাবে।
নিজেকেই কথাটা বোঝাতে বোঝাতে সে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।
ক্যাম্পাসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রুদ্র রহমান তন্ময়ের সঙ্গে কথা বলছিল।
জারা দূর থেকে তাকে দেখেই অন্য রাস্তা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু রুদ্রের চোখ এড়ানো এত সহজ নয়।
— এই যে, নীলপরী! এদিকে আসো!
জারা দাঁত চেপে ঘুরে দাঁড়াল।
— আমাকে নীলপরী বললেন কেন?
রুদ্র হাসল।
— নীল জামা পরেছ, তাই নীলপরী।
— আমার নাম জারা।
— জানি তো। কিন্তু জারা বলে ডাকলে তুমি রাগ করো। নতুন নাম দিয়ে ডাকলে অন্তত কথাটা বলো!
জারা চোখ ছোট করে তাকাল।
— আপনার মাথায় বুদ্ধি কম, নাকি বুদ্ধি থাকলেও ব্যবহার করেন না?
রুদ্র বুকের ওপর হাত রেখে বলল,
— তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় বুদ্ধি বাসায় রেখে আসি।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তন্ময় হেসে উঠল।
— ভাই, তোর এই অবস্থা দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে!
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কেন?
— এত সুন্দর একটা ছেলে, অথচ একটা মেয়ের কাছে প্রতিদিন অপমানিত হচ্ছে!
জারা গম্ভীর মুখে বলল,
— আপনার বন্ধুর যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। অন্তত সত্য কথাটা বুঝতে পেরেছে।
তন্ময় হাসতে হাসতে বলল,
— ভাবি, আমার বন্ধুকে একটু কম বকবেন। ছেলেটা নরম মনের!
জারা চমকে উঠল।
— কী বললেন? ভাবি?!
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে তন্ময়ের কনুইয়ে ধাক্কা দিল।
— চুপ কর!
তন্ময় হাসতে হাসতে সরে গেল।
জারা এবার রুদ্রের দিকে তাকাল।
— আপনার বন্ধুকে বলে দেবেন, আমাকে এসব নামে ডাকলে ভালো হবে না।
রুদ্র একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— ঠিক আছে। তোমার অপছন্দ হলে আর কেউ তোমাকে এভাবে ডাকবে না।
জারা কথাটা শুনে একটু থমকাল। সে ভেবেছিল, রুদ্র আবার কোনো মজা করবে।
কিন্তু রুদ্র আর কিছু বলল না।
কয়েক মুহূর্ত পর তার মুখে আবার দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
— তবে ভবিষ্যতে ডাকলে সমস্যা হবে কি না, সেটা এখনই জেনে রাখলে ভালো হতো!
জারা চোখ বড় করে বলল,
— আপনার কল্পনাশক্তি খুব বেশি!
রুদ্র মুচকি হাসল।
— আর তোমার রাগটা খুব মিষ্টি।
— আপনাকে আমি একদিন সত্যিই মিষ্টির দোকানে বিক্রি করে দেব!
— আগে দাম ঠিক করো। তোমার কাছে ডিসকাউন্ট দেব।
জারা আর দাঁড়াল না।
কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে তার ঠোঁটের কোণে যে হাসি ফুটেছিল, সেটা সে নিজেও টের পায়নি।
ক্লাস শেষে জারা আর মিমি ক্যান্টিনে গেল। গতকালের প্রজেক্টের কিছু কাজ বাকি থাকায় জারা খাতাটা বের করে বসেছিল।
মিমি ফুচকার প্লেট সামনে রেখে বলল,
— আগে খেয়ে নে। তারপর প্রজেক্ট করিস।
জারা একটা ফুচকা মুখে দিয়ে বলল,
— রুদ্র সময়মতো এলে কাজটা আজই শেষ করে ফেলতে পারব।
মিমি মুচকি হেসে বলল,
— ওর জন্য অপেক্ষা করছিস?
— প্রজেক্টের জন্য!
— হ্যাঁ, বুঝেছি। প্রজেক্টটাই তোর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়!
ঠিক তখনই রুদ্র আর তন্ময় ক্যান্টিনে এসে তাদের সামনে বসল।
রুদ্র জারার খোলা খাতার দিকে তাকিয়ে বলল,
— বাহ! আমাকে ছাড়াই প্রজেক্ট শুরু করে দিয়েছ?
জারা ঠান্ডা গলায় বলল,
— আপনি দেরি করবেন ভেবে আগেই শুরু করেছি।
রুদ্র নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল।
— আজ তো আমি সময়মতোই এসেছি।
— আজ এসেছেন বলে কালকের দেরি মাফ হয়ে যায় না।
রুদ্র হেসে বলল,
— আচ্ছা, আগামীকাল থেকে পাঁচ মিনিট আগে আসব।
জারা ফুচকার প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিল।
— আগামীকাল নয়। আজ কাজ শেষ করতে হবে।
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে, বস। আপনার আদেশ পালন করা হবে।
তারপর জারার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
— এত ঝাল খাও কেন?
জারা ফুচকা মুখে দিয়েই উত্তর দিল,
— আপনার সমস্যা কী?
— সমস্যা নেই। পরে পেট ব্যথা করলে আবার সবাইকে ঝগড়া করে মাথা খারাপ করবে।
জারা একটা ফুচকা তুলে তার দিকে এগিয়ে দিল।
— নিন, আপনিও খান। মুখ বন্ধ থাকবে।
রুদ্র ফুচকাটা খেয়ে বলল,
— বাহ! নিজের হাতে খাওয়াচ্ছ!
জারা হাত টেনে নিল।
— নিজের হাতে খাওয়াইনি! ফুচকাটা আপনাকে দিয়েছি!
— একই কথা। অনুভূতিটা বুঝতে হয়।
তন্ময় হাসতে হাসতে বলল,
— ভাই, তোর বিয়ে হলে ভাবির সঙ্গে প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখতে পাব।
জারা প্রতিবাদ করল,
— আমার বিয়ে ওর সঙ্গে হবে কেন?
রুদ্র খুব শান্তভাবে বলল,
— কারণ আমার মতো ছেলেকে সামলানোর ক্ষমতা তোমার আছে।
জারা উত্তর দিল,
— আর আপনার মতো ছেলেকে শিক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা আমার আছে!
মিমি হাততালি দিয়ে বলল,
— বাহ! দুজনের যোগ্যতা মিলেছে। এবার বিয়ের তারিখ ঠিক করো!
জারা পানির গ্লাস তুলে মিমির দিকে তাকাল।
— আর একটা কথা বললে এই পানি তোর মাথায় ঢেলে দেব!
সবাই হেসে উঠল।
রুদ্র হাসতে হাসতে জারার দিকে তাকিয়ে বলল,
— একটা কথা বলব?
— না।
— তবু বলি?
— না!
— তোমাকে রাগাতে আমার ভীষণ ভালো লাগে।
জারা চোখ পাকিয়ে বলল,
— আর আপনাকে বিরক্ত করতে আমার আরও বেশি ভালো লাগে।
রুদ্র হেসে উত্তর দিল,
— তাহলে আমরা দুজন দুজনের জন্যই তৈরি!
কথাটা শুনে জারা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে গেল।
তন্ময় আর মিমি একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
জারা বুঝতে পারল, এবার দুজন মিলে তাকে নিয়ে নতুন করে মজা করার সুযোগ পেয়েছে।
সে তাড়াতাড়ি প্রজেক্টের খাতা খুলে বলল,
— অনেক হয়েছে। এবার কাজ করুন। আপনাকে বিয়ে করার জন্য আমি এখানে আসিনি!
রুদ্র হাসিমুখে খাতা টেনে নিল।
— কে বলেছে আমি বিয়ের কথা বলেছি? তুমি নিজেই তো কথাটা তুললে!
— রুদ্র!
— আচ্ছা, কাজ করছি!
বিকেলে বিভাগের নোটিশ বোর্ডের সামনে সবাই জড়ো হয়েছে।
আগামী সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে হবে। কেউ গান করবে, কেউ নাচবে, কেউ নাটকে অভিনয় করবে।
জারা নাটকে অংশ নেওয়ার জন্য নিজের নাম লিখতে গেল।
ঠিক তখনই রুদ্র তার পাশে এসে দাঁড়াল।
— কী করছ?
— নাম লিখছি।
— কোন নাটকে?
— সেটা আপনাকে বলতে হবে কেন?
রুদ্র নোটিশ বোর্ডে চোখ বুলিয়ে বলল,
— রোমান্টিক কমেডি নাটক! বাহ, তোমার জন্য একদম উপযুক্ত।
জারা সন্দেহের চোখে তাকাল।
— আপনি নাম লিখবেন না তো?
রুদ্র কলম তুলে নিজের নাম লিখে দিল।
জারা হতবাক।
— আপনি সত্যিই নাম লিখেছেন?!
— হ্যাঁ।
— আপনি অভিনয় জানেন?
— তোমাকে বিরক্ত করতে পারি। অভিনয়ও পারব!
জারা মাথায় হাত দিল।
— হে আল্লাহ, এই ছেলেটা আমার পেছনে কেন লেগেছে?
কিছুক্ষণ পর নাটকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক এসে বললেন,
— এই নাটকের জন্য একজন ছেলে ও একজন মেয়ের প্রধান চরিত্র প্রয়োজন। যারা আগ্রহী, তাদের নামগুলো আমি দেখছি।
শিক্ষক তালিকাটা দেখে হেসে বললেন,
— রুদ্র রহমান আর জারা নওশীন—তোমরা দুজন প্রধান চরিত্রে অভিনয় করবে।
জারা প্রায় চিৎকার করে উঠল।
— স্যার! অন্য কাউকে নেওয়া যায় না?
শিক্ষক মুচকি হেসে বললেন,
— তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখলে মনে হয়, নাটকের অর্ধেক সংলাপ তো এমনিতেই তৈরি হয়ে যাবে!
চারপাশে হাসির রোল উঠল।
রুদ্র জারার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে বলল,
— অভিনন্দন, পার্টনার!
জারা তার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
— নাটকটা শেষ হওয়ার আগেই আপনাকে মঞ্চ থেকে ফেলে দেব।
রুদ্র হাতটা সরিয়ে নিয়ে হেসে বলল,
— ঠিক আছে। তবে পড়ে গেলে ধরতে হবে কিন্তু!
জারা মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল।
রুদ্র তার পেছনে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— এই মেয়েটার সঙ্গে আমার জীবনটা যে কী হবে!
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে জারা নিজের ঘরে বসে নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়ছিল।
গল্পটা এমন—একজন রাগী মেয়ে আর একজন দুষ্টু ছেলের বিয়ে হয় পরিবারের সিদ্ধান্তে। দুজন সারাক্ষণ ঝগড়া করলেও ধীরে ধীরে একে অপরকে ভালোবেসে ফেলে।
স্ক্রিপ্টের একটা সংলাপ পড়ে জারা থেমে গেল।
“তোমার সঙ্গে ঝগড়া না করলে আমার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।”
সে নিজেই হেসে ফেলল।
— একদম রুদ্রের মতো কথা!
তারপর নিজের কথাতেই চমকে উঠল।
— আমি আবার ওর সঙ্গে নিজের তুলনা করছি কেন?
ঠিক তখনই রুদ্রের ফোন এল।
জারা প্রথমে ধরবে না ঠিক করল। তিনবার রিং হওয়ার পর ফোনটা ধরল।
— কী হয়েছে?
ওপাশ থেকে রুদ্র বলল,
— নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়েছ?
— হ্যাঁ।
— একটা সমস্যা হয়েছে।
জারা সোজা হয়ে বসল।
— কী সমস্যা?
— নাটকে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করতে হবে।
জারা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— সেটা তো স্ক্রিপ্টেই লেখা আছে!
রুদ্র একটু থেমে বলল,
— তাহলে আমাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে তোমার এত সমস্যা কেন?
জারা চিৎকার করে উঠল,
— রুদ্র রহমান! আপনি কি কখনো সিরিয়াস কথা বলতে পারেন না?!
রুদ্র হেসে বলল,
— পারি। কিন্তু তোমার সঙ্গে কথা বললে সিরিয়াস থাকাটা কঠিন হয়ে যায়।
জারা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই নিচু গলায় বলল,
— আপনার সঙ্গে কথা বললে আমারও মাথা ঠিক থাকে না।
রুদ্রের হাসি থেমে গেল।
— কী বললে?
জারা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি বলল,
— বলেছি, আপনার সঙ্গে কথা বললে মাথা খারাপ হয়ে যায়!
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
— একই কথা অন্যভাবে বললে সত্যিটা বদলায় না, জারা।
জারা ফোন কেটে দিল।
কিন্তু ফোন কাটার পরও সে অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন নাটকের মহড়া শুরু হলো।
মঞ্চের সামনে শিক্ষক, কয়েকজন শিক্ষার্থী আর নাটকের বাকি সদস্যরা বসে আছে। জারা হাতে স্ক্রিপ্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে। তার বিপরীতে রুদ্র।
শিক্ষক বললেন,
— তোমরা সংলাপগুলো আগে ঠিকভাবে বলবে। নিজেরা ইচ্ছেমতো বদলাবে না। পরে প্রয়োজন হলে আলোচনা করে পরিবর্তন করা যাবে।
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে, স্যার।
মহড়া শুরু হলো।
জারা স্ক্রিপ্ট দেখে নিজের সংলাপ বলল,
— তুমি সারাদিন আমার সঙ্গে ঝগড়া করো কেন?
রুদ্রের উত্তর দেওয়ার কথা ছিল, “কারণ তোমাকে রাগাতে আমার ভালো লাগে।”
কিন্তু সে জারার দিকে তাকিয়ে একটু থেমে বলল,
— আর যদি একদিন আমি তোমাকে বিরক্ত করা বন্ধ করে দিই?
জারা স্ক্রিপ্ট থেকে চোখ তুলে তাকাল। সংলাপটা স্ক্রিপ্টে নেই।
সে নিচু গলায় বলল,
— আপনি নিজের মতো করে সংলাপ বদলাচ্ছেন কেন?
রুদ্রও নিচু গলায় বলল,
— শুধু একটা প্রশ্ন করলাম। উত্তর দিতে এত ভয় কীসের?
জারা এবার নাটকের চরিত্রের মতোই উত্তর দিল,
— তখন আমি শান্তিতে ঘুমাব!
চারপাশের সবাই হেসে উঠল।
শিক্ষকও হাসি চেপে বললেন,
— রুদ্র, নিজের সংলাপ বলবে। জারা, তুমিও চরিত্রের মধ্যে থাকবে। তোমাদের দুজনের খুনসুটি ভালো, কিন্তু নাটকের গল্পটাও ঠিক রাখতে হবে।
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে, স্যার।
মহড়া আবার শুরু হলো। এবার রুদ্র স্ক্রিপ্ট মেনেই সংলাপ বলল।
তবু একবার চোখাচোখি হতেই জারা হেসে ফেলল। রুদ্রও হাসল।
শিক্ষক বিরক্ত হয়ে বললেন,
— তোমরা দুজন কি মহড়া দিতে এসেছ, নাকি একে অপরকে হাসাতে?
জারা তাড়াতাড়ি মুখ গম্ভীর করল।
— দুঃখিত, স্যার। আর হবে না।
রুদ্র বলল,
— স্যার, চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার সহ-অভিনেত্রী খুব রাগী!
জারা তার পায়ে আলতো করে চাপ দিল।
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল।
শিক্ষক মাথা নাড়িয়ে বললেন,
— তোমাদের দুজনকে নিয়ে আমার অনেক পরিশ্রম করতে হবে দেখছি!
সবাই আবার হেসে উঠল।
মহড়া শেষে জারা ব্যাগ কাঁধে তুলে রুদ্রকে বলল,
— শুনুন, নাটকের সময় কোনো বাড়তি সংলাপ বলবেন না। আমাকে বিব্রত করার চেষ্টা করবেন না।
রুদ্র এবার মজা না করে বলল,
— ঠিক আছে। তোমার অস্বস্তি হয়, এমন কিছু করব না।
জারা একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— সত্যি?
— সত্যি। মজা তখনই ভালো, যখন দুজনেই সেটা উপভোগ করে।
জারা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— ভালো। অন্তত একটা বুদ্ধির কথা বলতে শিখেছেন।
রুদ্র হেসে বলল,
— তোমার কাছেই তো শিখছি!
জারা চলে গেল। কিন্তু এবার তার মনে রুদ্রকে নিয়ে শুধু বিরক্তি ছিল না। ছেলেটা যতই দুষ্টুমি করুক, তার কথার সীমা কোথায় থামাতে হবে, সেটা বোঝার চেষ্টাও করছে।
অন্যদিকে রুদ্রও বুঝতে পারছিল, জারাকে হাসানো যতটা সহজ, তার বিশ্বাস অর্জন করা ততটা সহজ নয়।
তবু সে তাড়াহুড়ো করতে চায় না।
কারণ সে জানে, জারার রাগের আড়ালে যে মানুষটা আছে, তাকে চিনতে হলে সময় দিতে হবে।
আর জারা?
সে এখনো নিজেকে বোঝাচ্ছে, রুদ্র রহমান তার কাছে শুধুই একজন বিরক্তিকর ছেলে।
কিন্তু প্রতিদিন ছেলেটার সঙ্গে ঝগড়া করার অপেক্ষায় থাকা মেয়েটা নিজেও জানে না, এই অপেক্ষার নাম একদিন ভালোবাসা হয়ে উঠতে পারে।
চলবে… ❤️🔥
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।