#বউ_আমার_ঝগড়ার_রানী ❤️
#পর্ব: ৭
#লেখক: মিস্টার পেন্সিল
সকাল থেকেই জারা নওশীনের মেজাজ খারাপ।
কারণ আজ নাটকের শেষ দৃশ্যের মহড়া। আর সেই দৃশ্যে তাকে রুদ্র রহমানের চোখের দিকে তাকিয়ে ভালোবাসার সংলাপ বলতে হবে!
যে ছেলেকে সে বিয়ে করতে চায় না, তার চোখের দিকে তাকিয়ে ভালোবাসার কথা বলা—এর চেয়ে বড় শাস্তি পৃথিবীতে আর কী হতে পারে?
জারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ থেকে রুদ্র রহমান আমার কাছে শুধু সহ-অভিনেতা। এর বাইরে কিছু না!”
পাশ থেকে মিমি বলল, “এই কথাটা গতকালও বলেছিলি।”
“আজ আরও শক্ত করে বলছি!”
“পরশুও বলেছিলি।”
জারা বালিশ তুলে বলল, “মিমি, তুই কি আমার বন্ধু, নাকি আমার শত্রু?”
মিমি হেসে বলল, “বন্ধু বলেই তোর প্রেমের রোগটা ধরতে পেরেছি।”
“আমি প্রেমে পড়িনি!”
“ঠিক আছে। তুই শুধু রুদ্রের মেসেজের অপেক্ষা করিস, ও কথা না বললে মন খারাপ করিস, আর ও অন্য কারও সঙ্গে কথা বললে রাগ করিস। কিন্তু প্রেমে পড়িসনি!”
জারা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ব্যাগ তুলে বলল, “আমি ক্যাম্পাসে যাচ্ছি। তুই আমার সঙ্গে কথা বলিস না!”
মিমি পেছন থেকে বলল, “রুদ্রের সঙ্গে গিয়ে কথা বলিস। আমার সঙ্গে তো সারাদিনই কথা বলিস!”
জারা দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল।
তার মুখে রাগ থাকলেও মনে একটা অদ্ভুত ভয় কাজ করছিল। আজ রুদ্র তার সঙ্গে কেমন আচরণ করবে? গতকালের মতো দূরত্ব বজায় রাখবে, নাকি আবার আগের মতো ঝগড়া করবে?
অবশ্যই ঝগড়া করবে!
জারা মনে মনে ঠিক করল, রুদ্র যদি একবারও বেশি কথা বলে, তাহলে সে তাকে এমন জবাব দেবে যে ছেলেটা জীবনে ভুলবে না।
কিন্তু নিজের মনকে সে একটা প্রশ্ন করল না—রুদ্র যদি সত্যিই আর তার সঙ্গে ঝগড়া না করে, তাহলে সে কী করবে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কক্ষে পৌঁছে জারা দেখল, সবাই ইতিমধ্যে উপস্থিত। পরিচালক চিত্রনাট্য হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। আর রুদ্র জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তন্ময়ের সঙ্গে কথা বলছে।
কালো শার্ট, হাতে ঘড়ি, মুখে শান্ত ভাব।
জারাকে দেখেও রুদ্র এগিয়ে এল না। শুধু একবার তাকিয়ে মাথা নেড়ে অভিবাদন জানাল।
জারা থমকে গেল।
এটা কী হলো?
কোনো খোঁচা নেই? কোনো দুষ্টু হাসি নেই? কোনো ‘ঝগড়ার রানী’ ডাক নেই? এমনকি তার পোশাক নিয়েও কোনো মন্তব্য নেই!
জারা নিজের জায়গায় বসে মিমিকে মেসেজ করল।
জারা: “ও আমাকে দেখে কিছু বলল না!”
মিমি: “তুই কি ওর কাছে অভিযোগ করতে গিয়েছিস?”
জারা: “না! কিন্তু ও এমন করছে কেন?”
মিমি: “কারণ তুই ওকে দূরে থাকতে বলেছিস।”
জারা ফোনটা বন্ধ করে দিল।
কথাটা সত্যি। কিন্তু সত্যি কথাও কখনো কখনো ভীষণ বিরক্তিকর হয়।
পরিচালক হাততালি দিয়ে সবাইকে ডাকলেন।
“চলো, আজ শেষ দৃশ্যটা নিখুঁত করতে হবে। রুদ্র, তুমি নায়িকার কাছে গিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করবে। জারা, তুমি প্রথমে তাকে প্রত্যাখ্যান করবে। তারপর তার কথায় তোমার মন বদলাবে।”
জারা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “স্যার, একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“আমার চরিত্রটা কি একটু কম আবেগপ্রবণ করা যায়?”
পরিচালক ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কেন?”
জারা রুদ্রের দিকে না তাকিয়েই বলল, “এত আবেগ দেখাতে আমার অস্বস্তি হচ্ছে।”
রুদ্র শান্ত গলায় বলল, “চিন্তা করবেন না, স্যার। আমি নিজের সংলাপ ঠিকভাবে বলব। জারা শুধু নিজের অংশটুকু বললেই হবে।”
কথাটা সাধারণভাবে বলা হলেও জারার মনে হলো, রুদ্র যেন তাকে বুঝিয়ে দিল—তার অনুভূতির জন্য সে আর অপেক্ষা করবে না।
পরিচালক মহড়া শুরু করার নির্দেশ দিলেন।
ঘরের আলো কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হলো। অন্যরা দর্শকের জায়গায় বসে পড়ল।
রুদ্র ধীরে ধীরে জারার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে আজ কোনো দুষ্টুমি নেই।
পরিচালক বললেন, “অ্যাকশন!”
রুদ্র সংলাপ শুরু করল।
“আমি জানি, তুমি আমাকে পছন্দ করো না। তোমার কাছে আমি হয়তো এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে ঝগড়া ছাড়া আর কিছু করা যায় না।”
জারা চিত্রনাট্যের দিকে তাকিয়ে নিজের সংলাপ বলল, “তুমি আমার জীবনে না থাকলেও আমার কিছু যায় আসে না।”
রুদ্র এক মুহূর্ত থামল। তারপর বলল, “তাহলে আমার চলে যাওয়ার পর তুমি কেন বারবার পেছনে তাকাও?”
জারা চমকে তার দিকে তাকাল।
এই সংলাপ তো চিত্রনাট্যে নেই!
পরিচালকও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু রুদ্র থামল না।
“আমি তোমাকে জোর করে আমার জীবনে রাখতে চাই না। তোমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। কিন্তু একটা কথা জানতে ইচ্ছে করে—তুমি কি সত্যিই আমাকে অপছন্দ করো, নাকি আমাকে পছন্দ করার সম্ভাবনাটাকেই ভয় পাও?”
ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
জারার হাতে চিত্রনাট্য কাঁপছে। সে জানে না, রুদ্র অভিনয় করছে, নাকি সত্যিই তাকে কিছু বলতে চাইছে।
জারা ধীরে বলল, “তুমি... তুমি এসব কী বলছ?”
রুদ্রের চোখ তার চোখে স্থির।
“যে কথাগুলো অনেক দিন ধরে বলতে চেয়েছি।”
জারার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
পরিচালক উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “কাট! রুদ্র, এটা চিত্রনাট্যে নেই।”
রুদ্র চোখ সরিয়ে নিল।
“দুঃখিত, স্যার। দৃশ্যটার আবেগটা বোঝাতে চেয়েছিলাম।”
তন্ময় পেছন থেকে ফিসফিস করে বলল, “ভাই, আবেগ বোঝাতে গিয়ে তো পুরো ঘরের মানুষকে আবেগে ফেলে দিলি!”
কেউ কেউ হেসে উঠল।
জারাও হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু তার মন তখন অন্য জায়গায়।
রুদ্র কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে? নাকি এটা শুধু অভিনয়?
সে উত্তর জানতে চায়। অথচ প্রশ্নটা করতে গেলেই ভয় হয়। কারণ উত্তরটা যদি তার মনের মতো না হয়?
মহড়ার বিরতির সময় সবাই বাইরে বেরিয়ে গেল। জারা পানির বোতল হাতে করিডরে দাঁড়িয়ে ছিল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
“জারা নওশীন?”
জারা ঘুরে তাকাল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরী এক মেয়ে। পরনে হালকা গোলাপি পোশাক, কাঁধ পর্যন্ত চুল, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি।
জারা বলল, “জি, আমি। আপনি?”
মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিল।
“আমি নীলা। রুদ্রের স্কুলের বন্ধু।”
জারা হাত মেলাল।
“ওহ, আচ্ছা।”
নীলা হাসল। “রুদ্র তোমার কথা বলেছে।”
জারার বুকের মধ্যে অকারণে একটা ধাক্কা লাগল।
“আমার কথা?”
“হ্যাঁ। বলেছে, তোমার সঙ্গে কথা বললেই তার দিনটা মজার হয়ে যায়।”
জারা মুখ গম্ভীর করে বলল, “ও সবার সঙ্গেই এমন মজা করে।”
নীলা হেসে বলল, “রুদ্র আগে এমন ছিল না। স্কুলে খুব চুপচাপ থাকত। তবে কাউকে পছন্দ করলে তার সঙ্গে ঝগড়া করার অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।”
জারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
“আপনি বলতে চাইছেন, ও আমাকে পছন্দ করে?”
নীলা কাঁধ ঝাঁকাল।
“আমি সেটা বলিনি। তবে রুদ্রের চোখ অনেক কথা বলে। সে নিজে না বললেও কিছু অনুভূতি লুকানো কঠিন।”
ঠিক তখনই রুদ্র করিডরে এসে হাজির হলো।
“নীলা! তুমি কখন এলে?”
নীলা হেসে বলল, “এই তো একটু আগে। তোমাদের মহড়া দেখতে এলাম।”
রুদ্র জারার দিকে তাকাল। জারা সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
নীলা সেটা খেয়াল করল।
“তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে বেশ মানিয়েছে।”
জারা দ্রুত বলল, “আমরা শুধু নাটকের সহ-অভিনেতা!”
রুদ্র মুচকি হেসে বলল, “আমি তো কিছু বলিনি।”
“তোমাকে বলতেও হবে না!”
নীলা হেসে উঠল।
“বাহ! তোমাদের ঝগড়া দেখে মনে হচ্ছে, নাটকের বাইরে আরেকটা নাটক চলছে।”
জারা আর দাঁড়াল না। সে দ্রুত মহড়ার ঘরে ফিরে গেল।
তার রাগ হচ্ছিল নীলার ওপর নয়, রুদ্রের ওপরও নয়। রাগ হচ্ছিল নিজের ওপর।
একটা মেয়ে এসে রুদ্রের সঙ্গে কথা বলেছে, আর তাতেই তার মন খারাপ হয়ে গেল কেন?
মহড়া শেষ হওয়ার পর জারা তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। রুদ্র দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
“একটু কথা বলবে?”
জারা না তাকিয়ে বলল, “কী কথা?”
“নীলাকে দেখে তোমার মন খারাপ হয়েছে?”
জারা ঘুরে দাঁড়াল।
“তোমার মাথা খারাপ? আমি কেন মন খারাপ করব?”
“আমি তো শুধু জিজ্ঞেস করলাম।”
“তুমি আর তোমার বন্ধুদের নিয়ে যা খুশি করো। আমার কী!”
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে। তাহলে একটা কথা বলি?”
জারা বিরক্ত হয়ে বলল, “বলো।”
“তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও না, সেটা আমি মেনে নিয়েছি। তোমার ওপর কোনো চাপও দেব না। কিন্তু তুমি যদি আমাকে শুধু একজন বন্ধু হিসেবে দেখতে পারো, তাহলে আমি সেই জায়গাটুকু ধরে রাখতে চাই।”
জারা এবার চুপ করে গেল।
রুদ্র আবার বলল, “আমি তোমার কাছ থেকে কোনো উত্তর চাইছি না। শুধু চাই, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের মনকে এত ভয় পেও না।”
কথাটা বলে সে সরে দাঁড়াল।
জারা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
এই প্রথম রুদ্র তাকে কোনো খোঁচা দিল না, কোনো মজা করল না। অথচ তার কথাগুলো জারার মনে এমনভাবে লেগে রইল, যেন সে অনেক দিন ধরে এই কথাগুলোর অপেক্ষায় ছিল।
বাড়ি ফিরে জারা মিমিকে সব বলল।
মিমি মন দিয়ে শুনে বলল, “এখন বল, তুই কী চাস?”
জারা বিছানায় বসে আঙুল মটকাল।
“আমি জানি না।”
“রুদ্র তোকে ভালোবাসে কি না, সেটা জানার আগে তুই নিজের অনুভূতিটা বুঝে নে।”
জারা নিচু গলায় বলল, “ও যখন আমার সঙ্গে কথা বলে না, তখন আমার খারাপ লাগে। অন্য মেয়ের সঙ্গে কথা বললে রাগ হয়। আবার ও যখন ভালোবাসার মতো কথা বলে, তখন ভয় লাগে।”
মিমি নরম গলায় বলল, “কিসের ভয়?”
জারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “যদি আমি সত্যিই ওকে পছন্দ করে ফেলি? যদি একদিন ও আমাকে আর পছন্দ না করে? তখন?”
মিমি তার পাশে বসে হাত ধরল।
“ভালোবাসা মানেই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়, জারা। কিন্তু ভয় পেয়ে নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করলেও মন শান্ত হয় না।”
জারা চোখ নামিয়ে বলল, “আমি ওকে ভালোবাসি কি না, জানি না। কিন্তু ওকে হারানোর কথা ভাবলে আমার ভালো লাগে না।”
মিমি মৃদু হাসল।
“তাহলে আপাতত এটুকুই মেনে নে। সব অনুভূতির নাম একদিনেই দিতে হয় না।”
রাতের দিকে জারা ফোন খুলল। রুদ্রের চ্যাটে গিয়ে লিখল—
‘আজকের কথাগুলো কি সত্যি ছিল, নাকি শুধু নাটকের সংলাপ?’
সে অনেকক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সাহস করে পাঠিয়ে দিল।
কয়েক মিনিট পর উত্তর এল।
রুদ্র: ‘কোন কথাগুলো?’
জারা: ‘যে কথাগুলো মহড়ার সময় বলেছিলে!’
রুদ্রের উত্তর এল—
রুদ্র: ‘চিত্রনাট্যের সংলাপ ছিল না। তবে সব সত্যি কথাও এখনো বলিনি।’
জারার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত লিখল, ‘বাকি কথাগুলো কী?’
কিন্তু এবার রুদ্র আর উত্তর দিল না।
জারা ফোন হাতে বসে রইল। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, তারপর আধঘণ্টা।
কোনো উত্তর নেই।
অবশেষে ফোনে আরেকটা মেসেজ এল।
রুদ্র: ‘সব কথা সামনাসামনি বলব। তবে একটা শর্ত আছে।’
জারা সঙ্গে সঙ্গে লিখল, ‘কী শর্ত?’
উত্তর এল—
রুদ্র: ‘আগামীকাল আমার সঙ্গে এক কাপ চা খেতে হবে। ঝগড়া করা যাবে, কিন্তু মাঝপথে উঠে চলে যাওয়া যাবে না।’
জারা ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসল।
তারপর লিখল—
জারা: ‘চা খাব। কিন্তু বিল তুমি দেবে।’
রুদ্র উত্তর দিল—
রুদ্র: ‘রাজি। ভবিষ্যৎ ঝগড়ার রানীর জন্য এতটুকু খরচ করতে পারি।’
জারা ফোনটা বুকে চেপে ধরল।
তার ঠোঁটে হাসি, চোখে অদ্ভুত এক দ্বিধা।
হয়তো সে এখনো রুদ্রকে ভালোবাসে না। কিন্তু রুদ্রের সঙ্গে আগামীকাল দেখা করার জন্য তার মন যে অধীর হয়ে আছে, সেটা আর অস্বীকার করতে পারল না।
চলবে… ❤️
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।