#বউ_আমার_ঝগড়ার_রানী ❤️
#পর্ব: ১৭
#লেখক_মিস্টার_পেন্সিল
সকালে ঘুম থেকে উঠে জারা নওশীনের প্রথম কাজ ছিল ফোনটা হাতে নেওয়া। দ্বিতীয় কাজ ছিল রুদ্র রহমানের মেসেজটা আবার পড়া। আর তৃতীয় কাজ ছিল নিজের ওপর রাগ করা।
কারণ, ছেলেটার মেসেজটা পড়লেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি চলে আসছে!
গত রাতের কথা মনে পড়তেই সে বালিশে মুখ গুঁজে বলল,
— ধুর! একটা হাত ধরেছে মাত্র। এমন তো না যে বিয়েই হয়ে গেছে!
ঠিক তখনই মিমির ফোন।
— হ্যালো, ভাবি!
জারা এক লাফে উঠে বসল।
— কী বললি? কাকে ভাবি বললি?
ওপাশ থেকে মিমির হাসি শোনা গেল।
— আরে, আমার প্রিয় ভাবি! কেমন আছো? গত রাতে ঘুম হয়েছে, নাকি রুদ্র ভাইয়ের হাতের উষ্ণতা অনুভব করতে করতে সারারাত জেগেছিস?
জারা চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।
— মিমি, তোর ঠিকানা বল। আমি এখনই আসছি।
— কেন? বিয়ের দাওয়াত দিতে?
— তোকে এমন শিক্ষা দেব, জীবনে আর কাউকে ভাবি বলবি না!
মিমি হেসে বলল,
— আচ্ছা, রাগ করিস না। একটা ছবি পাঠিয়েছি, আগে সেটা দেখ।
জারা ফোনের মেসেজ খুলল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিয়েবাড়ির মঞ্চের সামনে সে আর রুদ্র পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। রুদ্র তার হাত ধরে আছে, আর জারা মাথা নিচু করে মুচকি হাসছে।
ছবিটা দেখে জারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— এই ছবিটা তুই পেলি কোথায়?
— বিয়েবাড়ির গ্রুপে এসেছে। আর জানিস, ছবির নিচে কী লেখা?
— কী?
— ‘নতুন জুটির জন্য শুভকামনা!’ ❤️
জারা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।
— মিমি, আমি এখনই তোকে ব্লক করছি!
— ব্লক করার আগে একটা কথা বলি?
— বল!
— ছবিতে তোকে খুব সুন্দর লাগছে। আর রুদ্র ভাই তোকে যেভাবে দেখছে, সেটা দেখলে পাথরেরও প্রেম হয়ে যাবে!
জারা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
— ফোন রাখ।
মিমি এবার একটু নরম হয়ে বলল,
— আচ্ছা, সত্যি করে বল—তুই কি ওকে পছন্দ করিস?
জারা জানালার বাইরে তাকাল।
— জানি না।
— এই ‘জানি না’ কথাটার মধ্যেই তোর অর্ধেক উত্তর লুকিয়ে আছে।
জারা আর কিছু বলল না। ফোন কেটে দিয়ে ছবিটা আবার খুলল।
তারপর নিজেকেই বকা দিল,
— আমি ছবিটা বারবার দেখছি কেন?
কিন্তু ছবিটা ডিলিট করল না।
ক্যাম্পাসে পৌঁছাতেই জারা বুঝতে পারল, আজ তার শান্তি নেই।
দূর থেকে তন্ময় হাত নেড়ে ডাকল,
— এই যে, আমাদের ক্যাম্পাসের নতুন লাভবার্ডস!
জারা ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে বলল,
— তন্ময়, তুই কি সকালে নাশতা করেছিস?
তন্ময় খুশি হয়ে বলল,
— হ্যাঁ, কেন?
— ভালো। কারণ এখন তোর মুখ বন্ধ করার মতো শক্তি আমার আছে।
রুদ্র পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে হাসতে হাসতে বলল,
— এত রাগ করছিস কেন? ছবিতে তোকে ভালোই লাগছে।
জারা তার দিকে ঘুরে তাকাল।
— তুই চুপ কর! সব তোর জন্য হয়েছে।
— আমি আবার কী করলাম? হাত ধরতে বলেছিলাম নাকি?
— তুই হাত ধরেছিলি!
— তোর অনুমতি নিয়ে।
জারা কথা হারিয়ে ফেলল।
তন্ময় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— ওহ! অনুমতি নিয়ে হাত ধরা! ব্যাপারটা তো বেশ সিরিয়াস!
জারা আঙুল তুলে সতর্ক করল,
— আর একটা শব্দ বললে তোদের দুজনকেই ক্যাম্পাসের পুকুরে ফেলে দেব!
তন্ময় একটু পিছিয়ে গেল।
— রুদ্র, ভাই, তোর ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল। তবে একটু ভেজা হওয়ার সম্ভাবনা আছে!
রুদ্র হেসে বলল,
— আমি সাঁতার জানি। সমস্যা নেই।
জারা বিরক্ত হয়ে ক্লাসের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
রুদ্র পেছন থেকে ডাকল,
— জারা!
সে ফিরে তাকাল।
— কী?
— তোর ব্যাগের চেইন খোলা।
জারা তাড়াতাড়ি ব্যাগটা পরীক্ষা করল। সত্যিই চেইন খোলা।
রুদ্র এগিয়ে এসে ব্যাগের চেইনটা বন্ধ করে দিল। তারপর বলল,
— সবকিছু নিয়ে যুদ্ধ করতে হয় না। কিছু কিছু ব্যাপারে সাহায্যও নেওয়া যায়।
জারা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— তুই কি আজ আমাকে ভালো মানুষ হওয়ার প্রশিক্ষণ দিচ্ছিস?
— না। নিজে ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছি।
জারা মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
— চেষ্টা চালিয়ে যা। এখনো অনেক বাকি।
কিন্তু এবার তার কণ্ঠে রাগের চেয়ে হাসিই বেশি ছিল।
দুপুরে নাটকের মহড়ার জন্য সবাই অডিটোরিয়ামে জড়ো হলো। পরিচালক ঘোষণা করলেন, আগামী সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাদের নাটক মঞ্চস্থ হবে। তাই আজ থেকে প্রতিটি দৃশ্য মন দিয়ে অনুশীলন করতে হবে।
নাটকের শেষ দৃশ্যে জারা আর রুদ্রের চরিত্র দুটি বহু ভুল-বোঝাবুঝির পর নিজেদের অনুভূতি স্বীকার করবে।
পরিচালক স্ক্রিপ্ট হাতে দিয়ে বললেন,
— এই দৃশ্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তোমরা দুজন শুধু সংলাপ মুখস্থ করবে না, অনুভূতিটাও বোঝার চেষ্টা করবে।
জারা মনে মনে বলল, ‘আমার অনুভূতি নিয়ে আর কেউ কথা বলবে না, প্লিজ!’
রুদ্র স্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে তার পাশে দাঁড়াল।
— প্রস্তুত, ম্যাডাম?
— একদম। আর তুই ভুল করলে কিন্তু আবার শুরু করতে হবে।
— আমি ভুল করলে?
— হ্যাঁ।
— আর তুই ভুল করলে?
— আমি ভুল করি না।
রুদ্র মাথা নাড়ল।
— বুঝেছি। তুই ভুল করিস না, পৃথিবীই ভুল করে।
জারা তার স্ক্রিপ্ট দিয়ে রুদ্রের বাহুতে বাড়ি দিল।
— শুরু কর!
মহড়া শুরু হলো।
রুদ্র সংলাপ বলল,
— তুমি যদি আমাকে তোমার জীবনে না চাও, আমি জোর করে থাকব না। কিন্তু তোমাকে হারানোর ভয়টা আমি অস্বীকার করতে পারি না।
জারার পালা।
স্ক্রিপ্টে লেখা ছিল, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই, কিন্তু ভয় পাই।’
সে সংলাপটা বলল ঠিকই, কিন্তু শেষ শব্দটার সময় তার চোখ রুদ্রের চোখে আটকে গেল।
মুহূর্তের জন্য অডিটোরিয়ামের অন্য সব শব্দ যেন দূরে সরে গেল।
রুদ্রও তার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরিচালক হাততালি দিয়ে বললেন,
— চমৎকার! এই অনুভূতিটাই চাই। এবার আরেকবার করো।
জারা তাড়াতাড়ি স্ক্রিপ্টের দিকে তাকাল।
— স্যার, এবার একটু পানি খাব?
পেছন থেকে তন্ময় বলে উঠল,
— পানি খাওয়াই ভালো। প্রেমের সংলাপ শুনে গলা শুকিয়ে গেছে মনে হচ্ছে!
সবাই হেসে উঠল।
জারা তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— নাটক শেষ হলে তোর জন্য আলাদা একটা দৃশ্য রাখব। নাম—বন্ধুর হাতে বন্ধুর পরিণতি!
তন্ময় সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল।
রুদ্র পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল,
— তুই চাইলে আমি তোর সংলাপগুলোও মুখস্থ করে দিতে পারি।
জারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কেন?
— কারণ তুই আমার সংলাপগুলোও নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলিস।
জারা চমকে তার দিকে তাকাল।
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
— নাটকের কথা বলছি, ম্যাডাম।
— তুই খুব চালাক হয়ে গেছিস!
— তোর কাছেই শিখছি।
মহড়া শেষে সবাই বেরিয়ে গেলেও জারা অডিটোরিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ফোনে ছবিটা আবার খুলেছিল। নিজের অজান্তেই আঙুল দিয়ে ছবিটা বড় করে রুদ্রের মুখটা দেখছিল।
হঠাৎ পাশে কণ্ঠ ভেসে এল,
— আমার ছবি দেখার জন্য আলাদা অনুমতি লাগবে না।
জারা এমনভাবে ফোনটা লুকাল, যেন কোনো গোপন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে ধরা পড়েছে।
— আমি তোর ছবি দেখছিলাম না!
রুদ্র অবাক হওয়ার ভান করল।
— তা হলে আমার মুখটা ফোনের মধ্যে এল কীভাবে?
— পৃথিবীতে অনেক ছবি আছে। ভুল করে খুলে গেছে।
— আর সেই ছবিটা বড় করে দেখছিলি কেন?
— চোখের সমস্যা হয়েছে কি না পরীক্ষা করছিলাম!
রুদ্র হেসে ফেলল।
— ডাক্তার দেখাস। তবে একটা কথা বলি?
জারা হাত গুটিয়ে দাঁড়াল।
— বল।
রুদ্রের মুখের হাসিটা একটু শান্ত হলো।
— গত রাতে তুই আমার হাত ধরেছিলি। আজ ছবিটা নিয়ে সবাই মজা করছে। আমি চাই না, এসবের জন্য তুই অস্বস্তি বোধ করিস। কেউ কিছু বললে আমি সামলে নেব।
জারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— তুই কি ভাবিস, আমি সবকিছু নিয়ে এত ভয় পাই?
— না। আমি জানি, তুই অনেক সাহসী। কিন্তু সাহসী মানুষও কখনো কখনো অস্বস্তিতে পড়ে। তখন পাশে থাকা মানুষের কাজ হলো তাকে আরও বিব্রত না করা।
জারার বুকের ভেতরটা নরম হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল,
— তুই সবসময় এমন কথা বলিস কেন?
— কেমন কথা?
— যেগুলো শুনলে তোর ওপর রাগ করা কঠিন হয়ে যায়।
রুদ্র মুচকি হাসল।
— তাহলে আমার একটা পরিকল্পনা সফল হচ্ছে।
জারা চোখ সরু করল।
— কী পরিকল্পনা?
— তোর রাগের তালিকায় আমার নামটা একটু নিচে নামানো।
জারা হেসে ফেলল।
— অসম্ভব! তোর নাম এক নম্বরেই থাকবে।
— ঠিক আছে। তবে পাশে একটা ছোট্ট তারকা চিহ্ন দিয়ে দিস।
— কেন?
রুদ্র তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— যাতে বোঝা যায়, সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করি যাকে, তার কাছেই সবচেয়ে বেশি থাকতে চাই।
জারা আর হাসল না।
কথাটা তার মনে এমনভাবে লাগল, যেন কেউ খুব আলতো করে বন্ধ দরজায় টোকা দিয়েছে।
সে নিচু স্বরে বলল,
— রুদ্র, তুই কি সত্যিই আমাকে এতটা পছন্দ করিস?
রুদ্র এবার কোনো মজা করল না।
— হ্যাঁ, জারা। করি। কিন্তু তোর কাছ থেকে এখনই কোনো উত্তর চাই না। তুই নিজের অনুভূতি বুঝে নে। আমি তাড়াহুড়ো করছি না।
জারা তার আঙুলের দিকে তাকাল। মনে পড়ল, গত রাতে সে নিজেই রুদ্রের হাত ধরেছিল।
— আর যদি আমি অনেক সময় নিই?
— তা হলে অনেক সময় নেব।
— আর যদি মাঝে মাঝে রাগ করে কথা না বলি?
— আমি অপেক্ষা করব। তবে খুব বেশি দিন হলে ফুচকা খাওয়ানোর প্রস্তাব দেব।
জারা হেসে বলল,
— তুই আসলে রোমান্টিক না, তুই একটা ফুচকাপাগল!
— তোর সঙ্গে ফুচকা খাওয়ার সুযোগ পেলে আমি সবকিছু হতে রাজি।
জারা মাথা নাড়ল।
— তোর কোনো চিকিৎসা নেই।
— আছে। তুই একটু হাসলেই আমার সব রোগ ভালো হয়ে যায়।
জারা মুখ লুকিয়ে হাসল।
বাড়ি ফেরার আগে রুদ্র তাকে ক্যাম্পাসের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। বিদায় নেওয়ার সময় জারা হঠাৎ বলল,
— শোন।
— বল।
— গত রাতের ছবিটা… আমার কাছে আছে।
রুদ্র ভ্রু তুলল।
— জানি। তুই যে সেটা বারবার দেখেছিস, সেটাও জানি।
জারা হতভম্ব হয়ে গেল।
— কীভাবে জানিস?
— জানি না। আন্দাজ করলাম।
— তুই একদিন আমার হাতে মার খাবি!
রুদ্র হেসে বলল,
— মার খাওয়ার আগে একটা প্রশ্ন করি?
— কী?
— ছবিটা ডিলিট করিসনি কেন?
জারা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
— কারণ… ছবিটা খারাপ হয়নি।
রুদ্রের মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল।
— শুধু ছবিটা?
জারা আর দাঁড়াল না। দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বলল,
— বেশি প্রশ্ন করলে উত্তর বন্ধ!
রুদ্র পেছন থেকে বলল,
— ঠিক আছে, ঝগড়ার রানী। কাল দেখা হবে!
জারা ফিরে তাকিয়ে হাসল।
— কাল দেখা হবে, বিরক্তিকর মানুষ!
বাড়িতে ফিরে জারা ছবিটা নিজের ফোনের পছন্দের ছবির তালিকায় রেখে দিল। তারপর ডায়েরিতে লিখল—
“আজ বুঝলাম, কাউকে পছন্দ করার কথা স্বীকার করার চেয়েও কঠিন হলো নিজের হাসিটা লুকানো। রুদ্রের সঙ্গে কথা বললে আমার রাগ হয়, আবার ও চুপ করে থাকলেও মন খারাপ হয়। আমি এখনো ভালোবাসার নাম দিতে ভয় পাই। কিন্তু ওর পাশে দাঁড়ালে ভয়টা একটু ছোট হয়ে আসে।”
ডায়েরি বন্ধ করে সে ফোন হাতে নিল। রুদ্রের নতুন মেসেজ এসেছে।
রুদ্র: আজকের নাটকের সংলাপগুলো মনে আছে তো?
জারা: হ্যাঁ। কেন?
রুদ্র: কাল একটা সংলাপ স্ক্রিপ্টের বাইরে বলব।
জারার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
জারা: কী সংলাপ?
রুদ্র: সেটা কালই শুনবি। তবে ভয় পাস না। কোনো জোরাজুরি নেই, শুধু একটা সত্যি কথা।
জারা ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, আগামীকাল হয়তো তাদের সম্পর্কের নতুন একটা দরজা খুলবে।
কিন্তু সেই দরজার ওপাশে কী আছে, তা জানার আগেই তার ফোনে মিমির মেসেজ এল—
মিমি: ভাবি, কাল কিন্তু রুদ্র ভাইয়ের সেই সত্যি কথাটা শুনে পালিয়ে আসবি না! 😂❤️
জারা বালিশে মুখ গুঁজে চিৎকার করল,
— মিমিইইই!
চলবে… ❤️
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।