#বউ_আমার_ঝগড়ার_রানী ❤️
#পর্ব:১০
#লেখক_মিস্টার_পেন্সিল
সকালে ঘুম থেকে উঠেই জারা নওশীন ফোন হাতে নিল। সময় দেখার উদ্দেশ্য থাকলেও স্ক্রিনে রুদ্র রহমানের নামটা দেখেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
রাত বারোটা এক মিনিটে রুদ্রের মেসেজ এসেছিল—
‘ধন্যবাদ, ঝগড়ার রানী। জন্মদিনে এত সুন্দর একটা চমক দেওয়ার জন্য। তবে একটা অভিযোগ আছে।’
জারা লিখেছিল, ‘কী অভিযোগ আবার? উপহার দিয়েও শান্তি নেই!’
রুদ্রের উত্তর এসেছিল, ‘তুমি আমার জন্মদিনে এত সুন্দর করে হাসলে কেন? এখন থেকে প্রতি বছর জন্মদিনের অপেক্ষায় থাকব।’
‘তুমি বেশি কথা বলো। সহ্য করে নেব।’
‘তাহলে সারা বছর তোমার সঙ্গে ঝগড়া করার অনুমতি পাওয়া যাবে?’
‘অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিজ দায়িত্বে ঝগড়া করলে জরিমানা দিতে হবে।’
‘জরিমানা হিসেবে এক কাপ চা?’
এরপর জারা আর উত্তর দেয়নি। কিন্তু ফোনটা বুকে চেপে ধরে সে অনেকক্ষণ হেসেছিল।
এখন সকালে সেই কথাগুলো পড়েও তার হাসি থামছিল না।
ঠিক তখনই মিমির ফোন এল।
“কী রে, সকাল সকাল কার মেসেজ পড়ে দাঁত বের করে হাসছিস?”
জারা মুখ গম্ভীর করে বলল, “আমি হাসছি কোথায়?”
“নিজের মুখটা আয়নায় দেখ। প্রেমে পড়লে মানুষ নাকি বোকা হয়, তুই তো প্রমাণসহ বোকা হয়ে গেছিস!”
“আমি প্রেমে পড়িনি!”
“ঠিক আছে। তাহলে রুদ্রের নাম দেখলে তোর মুখে যে বিনা টিকিটের হাসি আসে, সেটা নিশ্চয়ই দেশপ্রেম!”
জারা ফোন কেটে দিল।
কিন্তু ফোন কাটার পরও হাসিটা আর থামল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে জারা দেখল, রুদ্র বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে দুটো কাগজের কাপ।
জারাকে দেখেই সে এক কাপ এগিয়ে দিল।
“এই নাও, সকালের ঝগড়ার জ্বালানি।”
জারা কাপ নিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। “তুমি কি আমাকে চা ছাড়া চলতে পারি না এমন মানুষ মনে করো?”
“না। মনে করি, চা ছাড়া তুমি আরও বিপজ্জনক হয়ে যাও।”
“তোমার সাহস দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে!”
“তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ হয়ে গেছে।”
জারা চায়ে চুমুক দিয়ে থমকে গেল। চিনি কম, দুধও পরিমিত—ঠিক তার পছন্দমতো।
“তুমি মনে রেখেছ?”
রুদ্র কাঁধ ঝাঁকাল। “কিছু কিছু জিনিস মনে রাখার জন্য আলাদা করে চেষ্টা করতে হয় না।”
কথাটা শুনে জারার বুকের ভেতর কেমন যেন হলো। সে দ্রুত অন্যদিকে তাকাল।
“তোমার নাটকীয় সংলাপগুলো বন্ধ করা উচিত।”
“তাহলে অভিনয় কেমন হচ্ছে?”
“শূন্য!”
“তবু আমার দিকে তাকিয়ে আছ কেন?”
জারা তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে বলল, “তোমার পেছনের গাছটা দেখছিলাম।”
রুদ্র পেছনে তাকিয়ে বলল, “বাহ! গাছটার নামও রুদ্র রহমান?”
“অসহ্য!”
তাদের কথোপকথন শুনে তন্ময় পাশে এসে দাঁড়াল।
“তোমরা ঝগড়া করছ, নাকি গোপনে প্রেমের মহড়া দিচ্ছ?”
জারা কাপ উঁচিয়ে বলল, “আর একবার এসব বললে চা তোমার মাথায় ঢেলে দেব!”
তন্ময় হাত তুলে সরে গেল। “বুঝেছি! প্রেম এখনো গোপন পর্যায়ে আছে!”
রুদ্র হাসছিল। জারা রাগ দেখানোর চেষ্টা করেও নিজের হাসি লুকাতে পারল না।
তার মনে হলো, এই ছেলেটার সঙ্গে এমন সাধারণ একটা সকালও কেন এত সুন্দর লাগে?
দুপুরে ক্লাস শেষে জারার মায়ের ফোন এল।
“জারা, আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় আসিস। সন্ধ্যায় রুদ্রদের পরিবার আসবে।”
জারা থমকে গেল। “কেন, আম্মু?”
“তোর বাবার সঙ্গে কিছু কথা আছে। বাসায় এসে শুনিস।”
ফোন রাখতেই জারার বুকের মধ্যে অস্বস্তি জমল। সে বুঝতে পারছিল, কথাগুলো কোন দিকে যাচ্ছে।
বাসায় ফিরে দেখল, মা বসার ঘর গুছাচ্ছেন। টেবিলে নাশতার আয়োজন, আর পাশে তার জন্য বের করে রাখা একটা সুন্দর পোশাক।
জারা মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আম্মু, তোমরা আবার বিয়ের কথা শুরু করেছ?”
মা শান্তভাবে বললেন, “ওরা তোকে পছন্দ করে। আমরাও ছেলেটাকে চিনি। তবে তোর মতামত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত হবে না।”
“আমি তো বলেছি, এখন বিয়ে করতে চাই না!”
“এখনই বিয়ে করতে হবে, এমন কথা কে বলেছে? ওরা শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে চায়।”
জারা চুপ করে গেল।
সে জানে, রুদ্রের সঙ্গে কথা না হলে তার মন খারাপ হয়। রুদ্র অন্য কারও সঙ্গে বেশি কথা বললে বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা খচখচানি শুরু হয়। ছেলেটার ছোট ছোট যত্নও তার মনে জায়গা করে নিয়েছে।
তবু ভালো লাগা আর বিয়ে কি একই জিনিস?
যদি একদিন রুদ্র বদলে যায়? যদি আজকের হাসি, খুনসুটি আর যত্ন একসময় বিরক্তিতে পরিণত হয়? যদি যাকে নিজের মানুষ ভাবতে শুরু করবে, তাকেই একদিন হারিয়ে ফেলতে হয়?
মা তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“কাউকে ভালো লাগলে সেটা অপরাধ নয়, মা। কিন্তু ভালো লাগলেই আজীবনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এমনও নয়।”
জারা মায়ের দিকে তাকাল।
মা আবার বললেন, “শুধু ভয় পেয়ে নিজের মনের কথাটাও অস্বীকার করিস না।”
কথাটা জারার মনে গেঁথে গেল।
সন্ধ্যায় রুদ্র তার বাবা-মায়ের সঙ্গে এল। বসার ঘরে বড়রা গল্প করছিলেন। জারা চুপচাপ বসে থাকলেও রুদ্র মাঝেমধ্যে তার দিকে তাকাচ্ছিল।
একসময় রুদ্রের মা হেসে বললেন, “তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখলে বেশ মানায়। ঝগড়া করতে করতে একদিন যে একে অপরের আপন হয়ে যাবে, কে জানত!”
সবাই হেসে উঠলেন।
জারার মুখ লাল হয়ে গেল। অস্বস্তি ঢাকতে রুদ্র বলল, “আন্টি, জারার সঙ্গে সংসার করলে প্রতিদিন নতুন অভিজ্ঞতা হবে।”
জারা চোখ রাঙিয়ে বলল, “তোমার সঙ্গে সংসার করার ইচ্ছা কার আছে?”
কথাটা বলেই সে বুঝল, বেশি কঠিন হয়ে গেছে।
রুদ্রের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। তবু সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল, “সেটা তো জারাই ভালো বলতে পারবে।”
জারার মা অন্য প্রসঙ্গ তুললেন। কিন্তু জারা বুঝতে পারছিল, রুদ্রের মন খারাপ হয়েছে।
কিছুক্ষণ পর রুদ্র বারান্দায় চলে গেল। জারা একটু পরে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল।
রুদ্র রেলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল।
জারা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি রাগ করেছ?”
“না।”
“তোমার এই ‘না’ শুনে মনে হচ্ছে, তুমি আমার সঙ্গে আরও দশটা ঝগড়া করার পরিকল্পনা করছ।”
রুদ্র হালকা হাসল, কিন্তু চোখে হাসি ছিল না।
“সব কথার উত্তর ঝগড়া দিয়ে দিতে হয় না, জারা।”
জারা চুপ করে গেল।
রুদ্র তার দিকে ফিরে বলল, “আমি জানি, তুমি এখন বিয়ে করতে চাও না। আমি তোমাকে কখনো জোর করিনি। কিন্তু সবাই যখন মজা করে কথা বলল, তুমি এমনভাবে উত্তর দিলে, যেন আমার সঙ্গে তোমার নাম জড়িয়ে যাওয়াটাই তোমার কাছে অপমানের।”
“আমি সেটা বোঝাতে চাইনি।”
“তাহলে কী বোঝাতে চেয়েছিলে?”
জারা উত্তর খুঁজে পেল না।
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি তোমার কাছ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম, আমার অনুভূতিটাকে তুমি অসম্মান না করো।”
কথাটা জারার বুকে গিয়ে লাগল।
“রুদ্র, আমি আসলে—”
“থাক। তোমাকে ব্যাখ্যা দিতে হবে না।”
জারা এবার বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি সবসময় এমন করো কেন? আমি কিছু বললেই তুমি চুপ হয়ে যাও!”
রুদ্র কষ্টের হাসি হাসল।
“তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু নিজের অনুভূতিকে তোমার কাছে হাস্যকর মনে হতে দেখতে ভালো লাগে না।”
জারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রুদ্র যাওয়ার আগে বলল, “তুমি আমাকে পছন্দ না করলে সেটাও বলতে পারো। কষ্ট পাব, হয়তো কিছুদিন চুপচাপ থাকব। কিন্তু তোমার সিদ্ধান্ত মেনে নেব। শুধু এমন ভান কোরো না যে আমার থাকা বা না থাকায় তোমার কিছুই যায় আসে না।”
সে ভেতরে চলে গেল।
জারা বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে রইল। তার খুব ইচ্ছে করছিল রুদ্রকে ডেকে বলতে, ‘তুমি আমার কাছে হাস্যকর নও। বরং তোমাকে হারানোর ভয়েই আমি এমন করি।’
কিন্তু কথাগুলো গলার কাছে এসে আটকে গেল।
রাত দশটার দিকে মিমির ফোন এল।
“কী হয়েছে? তোর গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?”
জারা সব খুলে বলল। মিমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল, “তুই রুদ্রকে হারানোর ভয় পাচ্ছিস, তাই না?”
“জানি না।”
“জানিস। শুধু স্বীকার করতে ভয় পাচ্ছিস। তুই চাইছিস রুদ্র তোর পাশে থাকুক, কিন্তু তুই নিজে একটা কথাও পরিষ্কার করে বলতে রাজি না।”
জারা চোখ মুছল। “যদি পরে সব বদলে যায়?”
মিমি নরম গলায় বলল, “তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা তখন দেখা যাবে। ভবিষ্যতের ভয়ে আজকের সত্যিটাকে মেরে ফেলিস না।”
ফোন রাখার পর জারা রুদ্রের চ্যাট খুলল। অনেকবার লিখল, আবার মুছে দিল। শেষে সাহস করে পাঠাল—
‘আজ তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
‘আমি বুঝেছি, জারা। শুভরাত্রি।’
মাত্র তিনটি শব্দ। অথচ জারার কাছে মনে হলো, রুদ্র যেন অনেক দূরে চলে গেছে।
সে আবার লিখল—
‘তুমি কি কাল আমার সঙ্গে দেখা করবে?’
রুদ্র উত্তর দিল—
‘করব। তবে একটা কথা বলব—তোমার অনুভূতি বুঝতে আমি চেষ্টা করব, কিন্তু নিজের অনুভূতিকে আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে রাখতে চাই না।’
জারার বুক কেঁপে উঠল।
সে ফোনটা বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমাকে নিয়ে মজা করি না, বোকা ছেলে। আমি তো তোমাকে হারানোর ভয়েই এমন করি!”
কিন্তু কথাটা রুদ্রকে বলা হলো না।
জানালার বাইরে রাত গভীর হচ্ছিল। আর জারার মনে প্রথমবারের মতো একটা সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—রুদ্র শুধু তার ঝগড়ার সঙ্গী নয়। সে এমন একজন, যার নীরবতাও জারাকে কষ্ট দেয়, যার সামান্য যত্নে তার মন ভালো হয়ে যায়, আর যার দূরে সরে যাওয়ার কথা ভাবলেই বুকটা ভারী হয়ে আসে।
হয়তো ভালো লাগা ধীরে ধীরে ভালোবাসার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু দরজাটা খুলে নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করার সাহস কি জারার হবে?
চলবে… ❤️
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।