#বউ_আমার_ঝগড়ার_রানী ❤️
#পর্ব: ৬
#লেখক: মিস্টার পেন্সিল
সকালে ঘুম থেকে উঠেই জারা নওশীন নিজেকে একটা কঠিন কথা বলল—
“আমি কোনোভাবেই রুদ্র রহমানকে বিয়ে করব না! ছেলেটা আমার জীবনটা একেবারে ঝালমুড়ি বানিয়ে দিয়েছে। সারাক্ষণ শুধু বিরক্ত করা, খোঁচা দেওয়া আর এমনভাবে তাকানো, যেন আমি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ!”
কথাটা বলেই সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করতে লাগল। কিন্তু আয়নায় নিজের মুখ দেখে আবার বিরক্ত হলো।
“এই যে মেয়ে, তুই আবার হাসছিস কেন? বিয়ে করবি না বলছিস, অথচ তার কথা মনে পড়লেই মুখে হাসি! তোর মাথায় কি সত্যিই সমস্যা আছে?”
পেছন থেকে মিমির কণ্ঠ ভেসে এল।
“সমস্যা তোর মাথায় নয়, তোর হৃদয়ে!”
জারা ঘুরে তাকাল। “সকালে সকালেই তোর এত জ্ঞান কোথা থেকে আসে?”
মিমি বিছানায় বসে হাসল। “তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, রাতে আবার রুদ্র সাহেবের কথা ভেবেছিস।”
“একদম না!”
“তাহলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একা একা হাসছিলি কেন?”
“আমি হাসছিলাম না। দাঁত পরীক্ষা করছিলাম!”
মিমি হেসে গড়িয়ে পড়ল। “বাহ! দাঁত পরীক্ষা করতে গিয়ে গালে টোল পড়ে গেল?”
জারা বালিশ ছুড়ে মারল। “বের হ! আমার ঘর থেকে বের হ!”
মিমি দরজার কাছে গিয়ে আবার বলল, “আচ্ছা, ঝগড়ার রানী, বিয়ে না করিস। কিন্তু প্রেমে পড়ার অনুমতি তো কেউ আটকায়নি!”
“মিমি!”
মিমি হাসতে হাসতে পালিয়ে গেল।
জারা বিরক্ত হয়ে বিছানায় বসে পড়ল। সে জানত, রুদ্রকে নিয়ে এত কথা বলা উচিত নয়। ছেলেটা তাকে বিরক্ত করে, আবার সেই ছেলেটা কথা না বললেও তার মন খারাপ হয়। ব্যাপারটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়!
নাশতার টেবিলে বসে জারা দেখল, তার মা আজ বেশ গম্ভীর।
“জারা, তোর সঙ্গে একটা কথা ছিল।”
জারা রুটির টুকরো মুখে দিয়ে বলল, “কী কথা, মা?”
“রুদ্রদের পরিবার তোকে খুব পছন্দ করে। আমাদেরও ছেলেটাকে ভালো লাগে। ভবিষ্যতে যদি তোরা দুজন রাজি থাকিস, তাহলে সম্পর্কটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে।”
জারার হাত থেমে গেল।
“মা! তুমি এসব কী বলছ?”
“আস্তে কথা বল। আমি তো এখনই বিয়ে দিয়ে দেওয়ার কথা বলছি না।”
“কিন্তু আমি রুদ্রকে বিয়ে করব না!”
মা শান্তভাবে মেয়ের দিকে তাকালেন। “ঠিক আছে। তুই যদি না চাস, কেউ তোকে বাধ্য করবে না। তোর পড়াশোনা, তোর ভবিষ্যৎ—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। আর বিয়ের সিদ্ধান্ত তোর নিজের হওয়া উচিত।”
মায়ের কথায় জারা একটু শান্ত হলো। সে ভেবেছিল, মা হয়তো জোর করবেন। কিন্তু মা তা করলেন না।
“তাহলে তুমি ওদের কিছু বলবে না তো?”
“এখনই কিছু বলার প্রয়োজন নেই। তবে কেউ যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে, আমরা পরিষ্কার করে জানিয়ে দেব যে কোনো সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো করে নেওয়া হবে না।”
জারা মাথা নেড়ে নিজের ঘরে চলে গেল। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। রুদ্রকে বিয়ে করার কথা সে ভাবতেই চায় না। অথচ ছেলেটাকে একেবারে হারিয়ে ফেলার চিন্তাও কেন যেন ভালো লাগছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে জারা সোজা ক্যাম্পাসের পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে গেল। নাটকের মহড়া শুরু হওয়ার আগে রুদ্রের সঙ্গে তার কথা বলা দরকার।
গাছটার নিচে রুদ্র বসে ছিল। পাশে তন্ময়। দুজনের সামনে চায়ের কাপ।
তন্ময় জারাকে দেখে রুদ্রের কানে কানে বলল, “দোস্ত, তোর ঝগড়ার রানী আসছে। আমি বরং এখান থেকে সরে যাই।”
রুদ্র মুচকি হাসল। “যা। তোর উপস্থিতিতে ওর রাগের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।”
“আমার উপস্থিতিতে? তুই নিজেই তো আগুনে ঘি ঢালিস!”
তন্ময় চলে যেতেই জারা রুদ্রের সামনে দাঁড়াল।
“আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।”
রুদ্র চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। “বলুন, ঝগড়ার রানী।”
“আমাকে এই নামে ডাকবেন না!”
“ঠিক আছে। বলো, জারা।”
জারা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “আমি বিয়ে করতে চাই না। বিশেষ করে আপনাকে তো নয়ই। আপনি আপনার পরিবারকে পরিষ্কার করে বলে দেবেন, আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক হওয়ার সুযোগ নেই।”
রুদ্রের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
“তুমি কি আমার মতামত না জেনেই সব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছ?”
“এখানে আপনার মতামতের কী আছে? আমি চাই না, এটাই যথেষ্ট।”
রুদ্র কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ, তোমার সিদ্ধান্তটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তুমি যদি আমাকে না চাও, আমি তোমাকে কোনোভাবেই চাপ দেব না।”
জারা যেন এমন উত্তর আশা করেনি।
“তাহলে আপনার পরিবারকে বলবেন?”
“বলব। কেউ যেন তোমাকে এ নিয়ে অস্বস্তিতে না ফেলে, সেটাও দেখব।”
“আপনি এত সহজে মেনে নিচ্ছেন?”
রুদ্র মৃদু হেসে বলল, “তুমি না চাইলে তোমাকে রাজি করানোর অধিকার আমার নেই, জারা। কাউকে ভালো লাগলেই তার ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া যায় না।”
কথাগুলো শুনে জারা চুপ করে গেল। রুদ্রের চোখে কষ্ট ছিল, কিন্তু সে একবারও জারাকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বলল না।
“আর কিছু বলবে?” রুদ্র জানতে চাইল।
জারা মাথা নাড়ল। “না।”
“তাহলে মহড়ায় দেখা হবে।”
রুদ্র উঠে চলে গেল।
জারা তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে চেয়েছিল রুদ্র তার কথা মেনে নিক। কিন্তু ছেলেটা সত্যিই মেনে নেওয়ার পর তার বুকের ভেতর এমন ফাঁকা লাগছে কেন?
বিকেলে নাটকের মহড়া শুরু হলো। আজ ছিল নাটকের সবচেয়ে আবেগপূর্ণ দৃশ্যের অনুশীলন। গল্পে নায়ক জানে, নায়িকা তাকে ভালোবাসে না। তবুও সে নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখে।
পরিচালক সংলাপ বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, “রুদ্র, তুমি জারার দিকে তাকিয়ে সংলাপটা বলবে। আর জারা, তুমি উত্তর দেবে। আবেগটা স্বাভাবিক রাখবে।”
রুদ্র স্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে জারার দিকে তাকাল।
“আমি জানি, তুমি আমাকে তোমার জীবনে চাও না। তবু তোমাকে হারানোর ভয়টা আমি অস্বীকার করতে পারি না।”
সংলাপটা শুনে জারার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, রুদ্র কি নাটকের সংলাপ বলছে, নাকি নিজের মনের কথা?
পরিচালক বললেন, “জারা, এবার তোমার সংলাপ!”
জারা চুপ।
“জারা?”
সে হঠাৎ স্ক্রিপ্টের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার... আমার মনে হয়, আজকে সংলাপটা একটু বদলানো দরকার!”
চারপাশে সবাই হেসে উঠল।
রুদ্রও মুচকি হাসল, কিন্তু আগের মতো তাকে খোঁচা দিল না। সে শুধু বলল, “সমস্যা নেই। সময় নিয়ে বলো।”
এই শান্ত আচরণটাই জারাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলল। আগে রুদ্র এমন পরিস্থিতিতে অন্তত একটা মজার কথা বলত। আজ সে কিছুই বলছে না।
মহড়া শেষ হওয়ার পর জারা রুদ্রকে এক পাশে ডেকে বলল, “আপনি আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছেন কেন?”
রুদ্র অবাক হয়ে তাকাল। “কেমন আচরণ?”
“আপনি আর আগের মতো কথা বলেন না। আমাকে বিরক্ত করেন না। কোনো মজা করেন না। এমনভাবে থাকেন, যেন আমি আপনার কেউ নই!”
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুমি তো নিজেই বলেছ, আমি তোমার কেউ নই। তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও না। তাই তোমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করছি।”
“তার মানে আপনি আর আমার সঙ্গে কথা বলবেন না?”
“কথা বলব। কিন্তু এমন কিছু করব না, যাতে তুমি অস্বস্তি বোধ করো।”
জারা বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি সব কথার এমন অদ্ভুত উত্তর দেন কেন?”
রুদ্র হালকা হাসল। “কারণ তোমার সঙ্গে তর্কে জেতার চেয়ে তোমার কথাটা বোঝা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
কথাটা বলে সে চলে গেল।
জারা দাঁড়িয়ে রইল। তার রাগ হচ্ছিল, আবার মনটাও খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। সে নিজেই রুদ্রকে দূরে থাকতে বলেছে, অথচ রুদ্র দূরে থাকতেই তার এত কষ্ট হচ্ছে!
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে জারা বিছানায় শুয়ে ছিল। মিমি ফোন করে জানতে চাইল, “কী খবর? আজ রুদ্র সাহেবের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?”
“না।”
“তাহলে তোর গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?”
“কেমন?”
“যেন কেউ তোর প্রিয় ফুচকার দোকান বন্ধ করে দিয়েছে!”
জারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “রুদ্র আজকাল আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলে না।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মিমি বলল, “তুই তো ওকে দূরে থাকতে বলেছিলি।”
“বলেছিলাম। কিন্তু তাই বলে একেবারে দূরে থাকবে?”
“জারা, তুই আসলে কী চাস?”
জারা উত্তর দিতে পারল না।
মিমি নরম গলায় বলল, “তুই ওকে বিয়ে করতে না চাইতেই পারিস। তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তোর নিজের অনুভূতিগুলোও বুঝতে হবে। কাউকে ভালো লাগা মানেই সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে করতে হবে, এমন তো নয়।”
জারা চুপ করে রইল। কথাটা তার মাথায় ঘুরতে লাগল।
রাতে রুদ্রের ফোনের স্ক্রিনে জারার নাম ভেসে উঠল না। রুদ্র কয়েকবার মেসেজ লেখার চেষ্টা করল।
‘আজ তোমার মন খারাপ ছিল?’
লিখে আবার মুছে দিল।
শেষ পর্যন্ত ফোনটা পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকাল। সে জারাকে পছন্দ করে, কিন্তু জারার স্বস্তি আর স্বাধীনতার চেয়ে নিজের ইচ্ছাকে বড় করতে চায় না।
অন্যদিকে জারা বারবার ফোন হাতে নিচ্ছিল। কোনো নতুন মেসেজ নেই।
“একটা মেসেজ দিতে কী এমন সমস্যা?” সে বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করল।
ঠিক তখনই নাটকের গ্রুপে নোটিফিকেশন এল।
পরিচালক: “আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় নাটকের শেষ দৃশ্যের পূর্ণ মহড়া হবে। জারা ও রুদ্র—দুজনকেই সময়মতো উপস্থিত থাকতে হবে। দৃশ্যটি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত মহড়া চলবে।”
জারা ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
“কাল আবার ওর সঙ্গে একসঙ্গে অভিনয় করতে হবে!”
সে বালিশে মুখ গুঁজে দিল।
কিন্তু তার মনে তখন অন্য একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—
রুদ্র যদি সত্যিই তার জীবন থেকে দূরে চলে যায়, তাহলে জারা কি সত্যিই খুশি থাকতে পারবে?
চলবে... ❤️
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।