বিদায়ের পরে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
বিজয়া দশমি, সম্পর্ক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব
২১ অক্টোবর ২০২৬
সন্ধ্যা গড়িয়ে এসেছে। মণ্ডপের সামনে মানুষের ভিড় একটু একটু করে কমছে। কেউ শেষবারের মতো প্রতিমার দিকে তাকাচ্ছেন, কেউ পরিচিতজনের সঙ্গে ছবি তুলছেন। বিদায়ের আগে দুজন মানুষ হাত ধরে বললেন, “ভালো থাকবেন দাদা, আবার দেখা হবে।” কথাটা খুব সাধারণ। অথচ এর মধ্যে লুকিয়ে আছে একটা প্রশ্ন—আবার দেখা হওয়ার আগ পর্যন্তও কি মানুষ দুজন একে অপরের খোঁজ রাখবেন?
বিজয়া দশমির বিদায় আমাদের চোখে পড়ে। প্রতিমা বিসর্জন হয়, উৎসবের আয়োজন গুটিয়ে নেওয়া হয়, পরিচিত মুখগুলো বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু মানুষের সম্পর্কের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, তার কোনো দৃশ্যমান বিসর্জন নেই। সেখানে আলো নেভে নিঃশব্দে।
পূজার কয়েক দিনে কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে গল্প, আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া, প্রতিবেশীর সঙ্গে কুশল বিনিময়—সব মিলিয়ে মনে হয়, সম্পর্কগুলো বেশ জীবন্ত আছে। কারও হাতে মিষ্টির বাক্স, কারও ফোনে ছবি তোলার ব্যস্ততা। হাসিমুখে বলা হয়, “আবার আসবেন।” তারপর দিন বদলায়। ছবিগুলো ফোনের গ্যালারিতে থেকে যায়, কথাগুলো হারিয়ে যায় দৈনন্দিন ব্যস্ততার ভিড়ে।
যে মানুষটির সঙ্গে সেদিন অনেকক্ষণ গল্প হয়েছিল, কয়েক সপ্তাহ পর তাঁর কথা মনে পড়লেও ফোন করা হয় না। মনে হয়, পরে একদিন কথা বলা যাবে। সেই ‘পরে’ কখনো আসে, কখনো আসে না।
সম্পর্কের দূরত্ব সব সময় ঝগড়া দিয়ে শুরু হয় না। কখনো শুরু হয় ছোট ছোট অবহেলায়। একটি ফোন করার কথা ভুলে যাওয়া, অসুস্থতার খবর পেয়েও পরে খোঁজ নেওয়ার কথা ভাবা, কিংবা পরিচিত মানুষটির নীরবতাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া—এভাবেই কাছের মানুষ ধীরে ধীরে দূরের হয়ে যান। কেউ দরজা বন্ধ করেন না, তবু দুজনের মাঝখানে অদৃশ্য একটা দরজা তৈরি হয়ে যায়।
বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতে আমাদের খুব বেশি আয়োজন লাগে না। একটি বার্তাই যথেষ্ট। কিন্তু সেই বার্তার পর মানুষটির জীবনে কী ঘটছে, তা জানার আগ্রহ কত দিন থাকে? তাঁর সংসারে অভাব চলছে কি না, অসুস্থ বাবা-মাকে নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন কি না, কিংবা সবার সামনে হাসলেও একা হলে মন খারাপ হয় কি না—এসব প্রশ্ন সাধারণত উৎসবের শুভেচ্ছাবার্তায় আসে না।
সব কষ্টের খবর সবাইকে জানানোও যায় না। অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা বিপদে পড়েও কাউকে ফোন করেন না। তাঁরা জানেন, খোঁজ নেওয়ার মতো পরিচিত মানুষের অভাব নেই; অভাব হলো এমন কারও, যাঁকে নির্ভয়ে বলা যায়, ‘আমি ভালো নেই।’
এই জায়গাটাই ভাবায়। পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেই কি আপন মানুষের সংখ্যা বাড়ে?
দুর্গাপূজা আমাদের একসঙ্গে আনন্দ করার সুযোগ দেয়। ভিন্ন ধর্মের প্রতিবেশী শুভেচ্ছা জানাতে আসেন, পুরোনো বন্ধু দেখা করতে আসেন, পরিচিতজনেরা কিছুক্ষণের জন্য হলেও দৈনন্দিন জীবনের দূরত্ব ভুলে যান। এই মিলনের সৌন্দর্য অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রশ্ন হলো, উৎসবের সেই সৌহার্দ্য আমাদের আচরণে কতটা থেকে যায়।
যে প্রতিবেশীর পূজার আনন্দে আমরা অংশ নিলাম, তাঁর বিপদের দিনেও কি পাশে দাঁড়াতে পারব? যে বন্ধুকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানালাম, তাঁর সঙ্গে মতের অমিল হলে কি সম্মান বজায় রাখতে পারব? যে আত্মীয়ের সঙ্গে হাসিমুখে দেখা হলো, পুরোনো অভিমান সরিয়ে একদিন কি নিজে থেকে কথা বলতে পারব?
উত্তরগুলো বড় কোনো অনুষ্ঠানে পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে সাধারণ দিনে, যখন কোনো উৎসব নেই, ছবি তোলার উপলক্ষ নেই, শুভেচ্ছা জানানোর নির্দিষ্ট কারণও নেই।
বিসর্জনের পর মণ্ডপ ফাঁকা হয়ে যায়। পড়ে থাকে কিছু ফুল, ছড়িয়ে থাকা কাগজ, হয়তো মাটিতে লেগে থাকা সিঁদুরের দাগ। পরদিন সেখানে আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসে। উৎসবের চিহ্নগুলো একসময় মুছে যায়।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সময়ের সঙ্গে অনেক চিহ্ন মুছে যায়। কারও সঙ্গে দেখা কমে, কারও সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ হয়। তবু কিছু মানুষ মনে থেকে যান—কারণ তাঁরা শুধু আনন্দের দিনে পাশে ছিলেন না, প্রয়োজনের সময়ও হাত বাড়িয়েছিলেন। তাঁদের মনে রাখার জন্য ক্যালেন্ডারে কোনো বিশেষ দিনের দরকার হয় না।
বিজয়া দশমির বিদায় তাই আমার কাছে একটি সহজ প্রশ্ন রেখে যায়: যাঁদের আজ ভালো থাকার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি, তাঁদের ভালো থাকার খবর কি পরে কখনো জানতে চাইব?
উৎসব ফিরে আসবে। আবার মণ্ডপ সাজবে, আলো জ্বলবে, পরিচিত মুখের ভিড় হবে। তার আগেই যদি কারও খোঁজ নেওয়া যায়, দীর্ঘদিনের অভিমান ভাঙানো যায়, কিংবা একাকী হয়ে পড়া মানুষটির পাশে কয়েক মিনিট বসা যায়, তাহলে বিদায়ের দিন বলা কথাগুলোরও একটি অর্থ তৈরি হয়।
বিজয়ার শুভেচ্ছা শুধু একটি দিনের জন্য নয়; মানুষের প্রতি মমতাটুকু যেন বিসর্জনের জলে হারিয়ে না যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।