সিরিজ-মণ্ডপ থেকে জীবনে: দুর্গা পূজা নিয়ে ভাবনা
ফিরে দেখা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১০ অক্টোবর ২০২৬
আজ ১০, অক্টোবর-২০২৬, সনাতন ধর্মের মহালয়া।
মহালয়া এলেই বাঙালির মনে ভেসে ওঠে ভোরের অন্ধকার, মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্র, শিউলি ফুলের গন্ধ, শরতের আকাশ আর দুর্গাপূজার অপেক্ষা। অনেকের কাছে মহালয়া মানেই মা দুর্গার আগমনের বার্তা। কিন্তু এর অর্থ শুধু উৎসবের শুরুতে থেমে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতি, কৃতজ্ঞতা এবং নিজের শিকড়ের দিকে একবার ফিরে তাকানোর সুযোগ।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে মহালয়া পিতৃপক্ষের সমাপ্তি এবং দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে যুক্ত। পিতৃপক্ষ পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং তাঁদের উদ্দেশে তর্পণের সময়। এরপর শুরু হয় দেবীপক্ষ, যার সঙ্গে দুর্গাপূজার আবহ জড়িয়ে আছে।
তাই মহালয়ার এক পাশে অতীত, অন্য পাশে ভবিষ্যৎ।
একদিকে যাঁরা চলে গেছেন, তাঁদের স্মরণ। অন্যদিকে যিনি আসছেন, তাঁকে বরণ করার প্রস্তুতি।
গীতাতেও পিতৃস্মরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আছে। নবম অধ্যায়ের ২৫ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেন,
“যান্তি দেবব্রতা দেবান্ পিতৃন্ যান্তি পিতৃব্রতাঃ…”
অর্থাৎ, দেবতার উপাসক দেবতাদের কাছে এবং পিতৃব্রতীরা পিতৃলোকের দিকে গমন করেন। গীতার এই শ্লোক মহালয়ার সরাসরি বিধান নয়। তবে এটি দেখায়, পূর্বপুরুষকে স্মরণ করা সনাতন ধর্মীয় চিন্তার বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়।
আমরা কেউ একা তৈরি হই না। আমাদের আগে মানুষ ছিলেন। তাঁদের জীবন, শ্রম, ভালোবাসা, ত্যাগ এবং মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়েই আমাদের জীবন এগিয়ে এসেছে। তাঁদের কেউ বাবা-মা, কেউ দাদা-দাদি, কেউ আরও আগের প্রজন্মের মানুষ। তাঁরা আজ নেই, কিন্তু তাঁদের জীবনের কিছু অংশ আমাদের মধ্যেই রয়ে গেছে।
একজন মানুষ চলে গেলে শুধু একজন মানুষই চলে যান না। তাঁর সঙ্গে হারিয়ে যেতে থাকে একটি সময়, একটি ঘর, কিছু অভ্যাস, কিছু গল্প। বাবার পুরোনো ঘড়ি, মায়ের আলমারিতে রাখা শাড়ি, দাদার বলা গল্প, কিংবা প্রয়াত কারও হাতের লেখা একটি চিঠি—এসব তখন হয়ে ওঠে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের শেষ কয়েকটি যোগসূত্র।
কিন্তু ব্যস্ত জীবনে আমরা সেই যোগসূত্রগুলোর দিকে তাকানোর সময় কতটুকুই বা রাখি?
চাকরি, সংসার, সন্তান, অর্থ আর প্রতিদিনের অসংখ্য ব্যস্ততা আমাদের বর্তমানকে এমনভাবে ঘিরে রাখে যে আগের প্রজন্মের মানুষগুলো ধীরে ধীরে ছবির ফ্রেমে আটকে যান। মুঠোফোনে তাঁদের ছবি থেকে যায়, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা মনে করার অবসর থাকে না।
মহালয়া সেই জায়গায় একটি বিরতি তৈরি করে।
তর্পণের সময় হাতে নেওয়া জল তাই শুধু জল নয়। এর সঙ্গে মিশে থাকে স্মরণ, শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা। মনে মনে বলা যায়,
“তুমি নেই, কিন্তু তোমাকে ভুলিনি।”
এই কথাটির মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি যেমন আছে, তেমনি আছে গভীর মানবিকতাও।
কারণ কাউকে স্মরণ করা মানে শুধু তাঁর মৃত্যুকে মনে করা নয়। তাঁর জীবনের মূল্যকে স্বীকার করাও স্মরণের অংশ।
শুধু নিয়ম পালন করলেই স্মরণ পূর্ণ হয় না। অন্তরের শ্রদ্ধা না থাকলে কোনো আচারই তার আসল অর্থ ধরে রাখতে পারে না।
একজন মানুষ নদীর ঘাটে গিয়ে হয়তো তাঁর প্রয়াত বাবাকে মনে করেন। কেউ মায়ের কথা ভাবেন। কেউ আবার এমন একজন মানুষকে স্মরণ করেন, যাঁর সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু জীবনের কঠিন সময়ে তিনি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
তাই পিতৃস্মরণকে শুধু বংশপরম্পরার হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। এর মধ্যে সম্পর্কের ঋণও আছে।
আর এই স্মরণের পরেই যখন দেবীপক্ষ শুরু হয়, তখন অনুভূতিটা বদলে যায়।
অতীতকে মনে করার পর সামনে আসে নতুনের আহ্বান।
বিষাদের ভেতর থেকে উৎসবের আলো দেখা দেয়।
মহালয়ার ভোরে তাই আনন্দ আর বিষাদ পাশাপাশি থাকে। মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্র শুনে কারও মনে হয়, মা আসছেন। আবার সেই একই সুর অন্য কারও মনে করিয়ে দেয় এমন একজন মানুষকে, যিনি আর কোনোদিন পূজার ভিড়ে দাঁড়াবেন না।
কারও কাছে মহালয়া আনন্দের শুরু।
কারও কাছে এটি পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেওয়া একটি সকাল।
দুটো অনুভূতিই সত্যি।
কারণ ধর্মীয় উৎসব মানুষের জীবন থেকে আলাদা কোনো জগতে তৈরি হয় না। মানুষের আনন্দ, বেদনা, সম্পর্ক, মৃত্যু আর স্মৃতি—সবকিছু মিলেই তার ধর্মীয় অনুভূতির একটা অংশ তৈরি হয়।
এই কারণেই বাঙালি সংস্কৃতিতে মহালয়া শুধু একটি ধর্মীয় তিথি নয়। শরতের আকাশ, কাশফুল, শিউলি আর ভোরের স্তোত্রের সঙ্গে এটি বহু প্রজন্মের স্মৃতিতে মিশে আছে।
ছোটবেলায় যে সন্তান বাবার পাশে বসে মহালয়ার অনুষ্ঠান শুনেছে, বড় হয়ে সেই সন্তানই একদিন বাবাকে ছাড়া একই অনুষ্ঠান শুনতে পারে। তখন সুরটি আর শুধু সুর থাকে না। তার সঙ্গে মিশে যায় একটি মানুষ, একটি ঘর, একটি হারিয়ে যাওয়া সময়।
একটি পরিচিত সুর বহু বছর পর হঠাৎ আমাদের এমন একটি জায়গায় ফিরিয়ে নিতে পারে, যেখানে আমরা আর বাস্তবে ফিরে যেতে পারি না।
মহালয়া সেই ফিরে দেখার সুযোগ দেয়।
তবে ফিরে দেখা মানে অতীতে আটকে থাকা নয়। নিজের শিকড়কে মনে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া। যাঁরা আমাদের আগে ছিলেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জীবনের পরের অধ্যায়ে পা রাখা।
আমরা যাঁদের হারিয়েছি, তাঁদের জন্য সবসময় বড় কিছু করার সুযোগ থাকে না। কিন্তু তাঁদের কথা মনে রাখা যায়। তাঁদের শেখানো কোনো ভালো কথা নিজের জীবনে ধরে রাখা যায়। তাঁদের কোনো একটি ভালো অভ্যাস নিজের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখা যায়।
আর কোনো এক মহালয়ার ভোরে, ঘুমজড়ানো চোখে রেডিও কিংবা মুঠোফোনে মহিষাসুরমর্দিনীর সেই পরিচিত সুর বাজতে থাকলে, হঠাৎ মনে পড়ে যেতে পারে সেই মানুষটির কথা, যার পাশে বসে একদিন প্রথম এই সুর শুনেছিলাম।
তখন হয়তো ঘরে আর সেই মানুষটি নেই।
শুধু সুরটা আছে।
আর সেই সুরের ভেতর দিয়ে, কয়েক মুহূর্তের জন্য, হারিয়ে যাওয়া মানুষটিও যেন ফিরে আসে।
মহালয়া হয়তো সেই ফিরে আসারই একটি সকাল।
একবার অতীতের দিকে তাকিয়ে, তারপর নতুন দিনের দিকে হাঁটার সকাল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।