মণ্ডপ থেকে জীবনে: দুর্গা পূজা নিয়ে ভাবনা
শিকড়টা ভুলে গেলে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৯ অক্টোবর ২০২৬
একটা মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে কখনো কি মনে হয়েছে, এই মণ্ডপটা আমাদের কাছে শুধু আজকের নয়?
এর পেছনে হয়তো বহু বছরের গল্প আছে। কোনো পরিবারের স্মৃতি আছে। কোনো পাড়ার মানুষের শ্রম আছে। কারও শৈশব আছে। কারও হারিয়ে যাওয়া মানুষ আছে। আবার আছে এমন কিছু বিশ্বাস, যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে এসেছে।
আমরা উৎসবটা পেয়েছি। কিন্তু এর ভেতরের কথাগুলো কি ঠিকভাবে পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি?
দুর্গাপূজার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি কোনো একদিনে তৈরি হওয়া উৎসব নয়। এর সঙ্গে পুরাণ আছে, লোককথা আছে, পারিবারিক পূজার ইতিহাস আছে, আছে মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা বারোয়ারি পূজার ধারাও।
দেবী দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপের প্রাচীন গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা পাওয়া যায় দেবী মাহাত্ম্য-তে, যা মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ। সেখানে দেবী শুধু একটি প্রতিমার নাম নন। তিনি শক্তির প্রতীক। অশুভের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক। অন্যায় ও বিশৃঙ্খলার সামনে ভয় না পাওয়ার প্রতীক।
পরে বাংলায় দুর্গাপূজা নানা পরিবার ও সমাজের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। রাজপরিবার, জমিদারবাড়ি, শহরের পাড়া, গ্রাম—ধীরে ধীরে উৎসবের পরিসর বড় হয়েছে।
রাজা কংসনারায়ণকে নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি আছে। আবার রামের অকালবোধনের কাহিনিও দুর্গাপূজার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু এসব জায়গায় ইতিহাস আর ধর্মীয় ঐতিহ্যকে আলাদা করে দেখা দরকার। সব কাহিনিকে একই ধরনের ঐতিহাসিক প্রমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না।
এই সততাটাও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হওয়া উচিত।
কারণ নিজের ধর্মকে ভালোবাসার অর্থ নিজের ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং নিজের শিকড়কে যত বেশি জানব, তত বেশি বুঝব কোনটা বিশ্বাস, কোনটা লোককথা, কোনটা ইতিহাস এবং কোনটা পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া সংস্কার।
১৭৯০ সালের গুপ্তিপাড়ার একটি পূজাকে বাংলার বারোয়ারি পূজার প্রাচীন ও বহুল আলোচিত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, বারোজন বন্ধু মিলে সেই পূজার আয়োজন করেছিলেন।
একসময় যে পূজা ছিল নির্দিষ্ট পরিবার বা অভিজাত গোষ্ঠীর আয়োজন, সেটি ধীরে ধীরে মানুষের অংশগ্রহণের উৎসবে পরিণত হলো।
এই পরিবর্তনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ধর্ম শুধু ঘরের ভেতরে থাকলে তার একটি ব্যক্তিগত রূপ থাকে। আবার ধর্ম যখন সংস্কৃতি, উৎসব, আচার ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তার একটা সামষ্টিক রূপ তৈরি হয়।
ঢাকার পুরান এলাকায় পূজার সময় কোনো সরু গলির পাশ দিয়ে হাঁটলে সেই সামষ্টিক রূপটা এখনও বোঝা যায়। ছোট্ট একটি মণ্ডপের সামনে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ ফুল সাজাচ্ছে, কেউ প্রসাদের ব্যবস্থা করছে। একজন বয়স্ক মানুষ হয়তো পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ছোটবেলার পূজার গল্প বলছেন। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরটি মোবাইলে মণ্ডপের ছবি তুলছে।
দুজনের পৃথিবী আলাদা।
একজনের কাছে পূজা স্মৃতি। অন্যজনের কাছে ছবি।
কিন্তু তাদের মাঝখানে যে মণ্ডপটা দাঁড়িয়ে আছে, সেটাই দুই প্রজন্মকে এক জায়গায় এনে দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এই সম্পর্কটা আমরা কতদিন ধরে রাখতে পারব?
বর্তমান প্রজন্মের কাছে সনাতন ধর্মকে ধারণ করার কথাটা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
ধারণ করা মানে শুধু পূজার দিন নতুন পোশাক পরা নয়। শুধু মন্দিরে যাওয়া নয়। শুধু মন্ত্র মুখস্থ করাও নয়।
নিজের ধর্মের ইতিহাস জানা। নিজের সংস্কৃতির শিকড় জানা। তার দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা তৈরি করা। আর ধর্মের নামে যা কিছু প্রচলিত আছে, তার সবকিছুকেই প্রশ্নহীনভাবে সত্য ধরে না নিয়ে বোঝার চেষ্টা করা।
কারণ অন্ধ অনুকরণ কখনো গভীর বিশ্বাস তৈরি করে না।
একজন তরুণ যদি তার ধর্ম সম্পর্কে জানতে চায়, তাকে শুধু “এটা আমাদের ধর্ম, তাই মানতে হবে” বললে হয়তো সে কিছুদিন মানবে। কিন্তু কেন মানবে, কী এর অর্থ, এর দর্শন কী, মানুষের জীবনে এর মূল্য কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর যদি সে না পায়, একসময় সেই সম্পর্কটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
শিকড় শক্ত করতে হলে শিকড়ের পরিচয়ও জানতে হয়।
আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তির মধ্যে বড় হচ্ছে। তাদের পৃথিবী আমাদের সময়ের চেয়ে অনেক বড়। এক মুহূর্তে তারা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের সংস্কৃতি দেখতে পারে। নতুন চিন্তা জানতে পারে। নতুন জীবনযাপন দেখতে পারে।
এটা খারাপ নয়।
বরং পৃথিবীকে জানার দরজা যত খুলবে, নিজের পরিচয়টাও তত সচেতনভাবে জানা দরকার হবে।
কারণ যে নিজের শিকড় চেনে, সে অন্যের সংস্কৃতিকেও সম্মান করতে পারে। আর যে নিজের পরিচয় নিয়েই অনিশ্চিত, সে অনেক সময় অন্যকে নকল করাকে আধুনিকতা মনে করে।
তাই বর্তমান প্রজন্মকে সনাতন ধর্ম ধারণ করতে হবে—কিন্তু সেটা ভয় থেকে নয়, অন্ধত্ব থেকে নয়, অন্যকে ছোট করার জন্যও নয়।
ধারণ করতে হবে জ্ঞান দিয়ে।
মূল্যবোধ দিয়ে।
নিজের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দিয়ে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, মানবিকতা দিয়ে।
দুর্গাপূজার ইতিহাস আমাদের একটা শিক্ষা দেয়। কোনো ঐতিহ্য শুধু পুরোনো হলেই বেঁচে থাকে না। মানুষ তাকে নতুন করে গ্রহণ করলে তবেই বেঁচে থাকে।
আজকের তরুণ যদি মণ্ডপে দাঁড়িয়ে শুধু ছবি তোলে, তবু তাকে দোষ দেওয়া যায় না। হয়তো কেউ তাকে কখনো গল্পটা বলেনি।
তাকে যদি বলা যায়, এই উৎসবের পেছনে কত শত বছরের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মানুষের স্মৃতি আছে, তখন হয়তো সেই ছবির অর্থও বদলে যাবে।
মণ্ডপ তখন শুধু ছবি তোলার জায়গা থাকবে না।
হয়ে উঠবে নিজের শিকড়ের সামনে দাঁড়ানোর একটি মুহূর্ত।
প্রতিমা বিসর্জন হবে। মণ্ডপ খুলে যাবে। আলো নিভে যাবে। মানুষ নিজের কাজে ফিরে যাবে।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যাবে—
আমরা কি শুধু উৎসবটা পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দেব, নাকি তার সঙ্গে আমাদের সনাতন ধর্মের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ আর মানবিকতার শিক্ষাটাও তুলে দেব?
কারণ উৎসব একদিনের হতে পারে।
কিন্তু ঐতিহ্য বাঁচে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
আর শিকড়টা ভুলে গেলে, একদিন হয়তো মণ্ডপ থাকবে, উৎসব থাকবে, আলোও থাকবে—শুধু তার ভেতরের অর্থটাই আর থাকবে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।