ফুটপাতের শৈশব
গল্প ১ -ফুটপাতই যাদের ঠিকানা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
আমাদের বাসার সামনের ফুটপাতে একটা শিশুকে প্রায়ই ঘুমিয়ে থাকতে দেখি। ছোট্ট শরীরটা গুটিয়ে পড়ে থাকে। কখনো গায়ে পুরোনো একটা চাদর, কখনো কিছুই নেই। আমরা যে জায়গাটাকে শুধু হেঁটে যাওয়ার পথ বলে মনে করি, তার কাছে সেটাই ঘর। হয়তো পুরো পৃথিবীও।
আমরা পাশ দিয়ে চলে যাই। কেউ একবার তাকাই, কেউ তাকাই না। খুব কম মানুষই হয়তো থেমে ভাবে—রাত হলে শিশুটার কী হবে? সকালে ঘুম থেকে উঠে কোথায় যাবে? অসুস্থ হলে কে দেখবে? ভয় পেলে কাকে ডাকবে?
আমাদের কাছে বাড়ি মানে চারটা দেয়াল, একটা দরজা, একটা বিছানা। কিন্তু একটা শিশুর কাছে বাড়ি তার চেয়েও বেশি কিছু। বাড়ি মানে মায়ের ডাক, বাবার হাত, নিরাপদে ঘুমানো, স্কুল থেকে ফিরে একটু বিশ্রাম নেওয়া, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে বের হওয়া।
ফুটপাতে বড় হওয়া শিশুটার জীবনে এর কতটুকু আছে?
সকাল হলেই তার আরেকটা দিন শুরু হয়। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ গাড়ির কাচ মোছে, কেউ বোতল-কাগজ কুড়িয়ে বেড়ায়, কেউ মানুষের কাছে হাত বাড়ায়। আমরা এসব প্রতিদিন দেখি। দেখতে দেখতে দৃশ্যগুলো এত পরিচিত হয়ে গেছে যে অস্বাভাবিক বলেও মনে হয় না।
কিন্তু পরিচিত হয়ে যাওয়া মানেই কি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া?
যে বয়সে একটা শিশুর কাঁধে স্কুলব্যাগ থাকার কথা, সেই বয়সে তার হাতে থাকে প্লাস্টিকের বস্তা। যে বয়সে মাঠে দৌড়ানোর কথা, সেই বয়সে তাকে ভাবতে হয়—আজ কত টাকা আয় হবে? রাতে খাবার জুটবে তো?
ক্ষুধার কাছে অনেক স্বপ্নই ছোট হয়ে যায়।
একটা শিশুকে স্কুলে পাঠাতে হলে শুধু স্কুল থাকলেই হয় না। তার খাবার দরকার, নিরাপত্তা দরকার, বই-খাতা দরকার, আর সবচেয়ে বেশি দরকার এমন একটা পারিবারিক পরিবেশ যেখানে তার সামান্য আয়টুকুর ওপর সংসার নির্ভর করবে না।
তাই শুধু শিশুটিকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আজ তাকে খাবার দিলাম, কাল আবার সে একই জায়গায় ফিরে এলো—তাহলে আমরা তার ক্ষুধা সামলেছি, জীবন নয়।
সমাধান শুরু হতে পারে তিন জায়গা থেকে।
প্রথমত, নিরাপদ আশ্রয়। বড় শহরগুলোতে শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র দরকার, যেখানে শুধু ঘুমানোর জায়গা নয়, খাবার, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার ব্যবস্থাও থাকবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার সুযোগ। যারা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না, তাদের জন্য বিকল্প বা ভ্রাম্যমাণ শিক্ষাকেন্দ্র চালু করা যেতে পারে। ধীরে ধীরে তাদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিবারকে পাশে দাঁড়ানো। শিশুকে কাজে পাঠানো বন্ধ করতে হলে পরিবারের বড়দের আয়ের পথ তৈরি করতে হবে। প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক সহায়তা থাকলে শিশুর উপার্জনের ওপর নির্ভরতা কমবে।
আর আমাদের নিজেদের আচরণও বদলাতে হবে। সাহায্য করতে গিয়ে শিশুর ছবি তুলে প্রচার করা মানবিকতার প্রমাণ নয়। তাকে করুণার চোখে নয়, সম্মানের চোখে দেখতে হবে। প্রয়োজন হলে খাবার দেব, চিকিৎসার ব্যবস্থা করব, শিক্ষার সুযোগ খুঁজে দেব—কিন্তু তাকে ছোট করব না।
কারণ সে করুণার পাত্র নয়। সে একজন শিশু। তারও নিরাপদে ঘুমানোর অধিকার আছে, স্কুলে যাওয়ার অধিকার আছে, স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে।
একটা দেশের উন্নয়ন শুধু বড় ভবন আর প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে মাপা যায় না। তার সবচেয়ে অসহায় শিশুটি রাতে কোথায় ঘুমায়, সকালে কী খেয়ে ওঠে, স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় কি না—এসবও উন্নয়নের হিসাব।
আজ ফুটপাত হয়তো তার ঠিকানা।
কিন্তু ফুটপাত যেন তার ভবিষ্যৎ না হয়।
আমাদের দায়িত্ব শুধু তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া নয়; এমন একটা পথ তৈরি করা, যে পথে একদিন সে ফুটপাত ছেড়ে নিজের জীবনের দিকে হাঁটতে পারে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।