ফুটপাতের শৈশব
পর্ব ২ — স্কুলে যাওয়ার বয়সে রাস্তায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
যে বয়সে হাতে বই থাকার কথা, সেই বয়সে অনেক শিশুর হাতে থাকে প্লাস্টিকের বস্তা।
সকালে একদল শিশু স্কুলের পোশাক পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। একই সময়ে, একই শহরের অন্য কোনো মোড়ে আরেকটা শিশু ঘুম থেকে উঠে বের হয় কাজের খোঁজে। কারও হাতে ফুলের ঝুড়ি, কারও হাতে বোতল কুড়ানোর বস্তা, কেউ দাঁড়িয়ে থাকে গাড়ির কাচ মোছার জন্য।
একই শহর। একই সকাল। অথচ দুটো শিশুর জীবন যেন দুই পৃথিবী।
একজনের দিন শুরু হয় স্কুলের ঘণ্টায়, আর অন্যজনের দিন শুরু হয় একটা প্রশ্ন দিয়ে—আজ কত টাকা আয় হবে?
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘ওরা স্কুলে যায় না কেন?’—এখানে থামলে হবে না।
প্রশ্নটা হওয়া উচিত, কেন যেতে পারে না?
ওরা কি পড়তে চায় না? নাকি জীবনের এমন কিছু চাপ তাদের ঘিরে থাকে, যার কাছে স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছাটাও একসময় হার মানে?
একটা দরিদ্র পরিবারের কথা ভাবুন।
প্রতিদিন খাবার জোগাড় করতে হয়। ঘরভাড়া দিতে হয়। কেউ অসুস্থ হলে ওষুধের টাকা লাগে। কোনোদিন কাজ থাকে, কোনোদিন থাকে না। মাসের শেষে হিসাব মেলে না।
বাবা হয়তো দিনমজুর। মা হয়তো অন্যের বাসায় কাজ করেন। দুজনের আয় মিলিয়েও যখন সংসার ঠিকমতো চলে না, তখন সন্তানের সামান্য উপার্জনটুকুও পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তখন পরিবার ভাবে—আগে আজকের খাবারটা জুটুক।
এই বাস্তবতাটা না বুঝে আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি, ‘বাচ্চাটাকে স্কুলে পাঠায় না কেন?’
কিন্তু প্রশ্নটা শুধু পরিবারের দিকে ছুড়ে দিলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে।
আমাদেরও জিজ্ঞেস করতে হবে—একটা পরিবারকে এমন জায়গায় পৌঁছাতে হলো কেন, যেখানে সন্তানের পড়াশোনা আর পরিবারের খাবারের মধ্যে একটাকে বেছে নিতে হয়?
শিশু যখন কাজে ঢুকে পড়ে, তখন ক্ষতিটা শুধু একটা দিনের নয়।
প্রথমে সে কয়েক দিন স্কুলে যায় না। তারপর অনিয়মিত হয়ে পড়ে। একসময় বই-খাতা তার জীবন থেকে দূরে সরে যায়। স্কুলের বন্ধুরা, শিক্ষকেরা, শ্রেণিকক্ষ—সবকিছুই অপরিচিত হয়ে ওঠে।
এর মধ্যে রাস্তাটা তার কাছে পরিচিত হয়ে যায়।
এখানেই তার কাজ। এখানেই পরিচিত মুখ। এখান থেকেই সে কিছু টাকা পায়। ফলে স্কুলে ফিরে যাওয়া তখন শুধু একটা স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিষয় থাকে না; তাকে একটা তৈরি হয়ে যাওয়া জীবন থেকে বের করে আনতে হয়।
আর যত সময় যায়, কাজটা তত কঠিন হয়।
শিক্ষা থেকে দূরে থাকা মানে ভবিষ্যতের সুযোগও কমে যাওয়া। যে কাজগুলোতে একটু ভালো আয়, নিরাপত্তা বা সম্মান আছে, সেগুলোর দরজা তার জন্য সহজে খোলে না। কম মজুরির কাজেই তাকে আটকে থাকতে হয়।
তারপর একদিন তার নিজের সংসার হয়।
দারিদ্র্য তখনও পিছু ছাড়ে না।
এভাবেই শিশুশ্রম শুধু একটা শিশুর শৈশব কেড়ে নেয় না, তার ভবিষ্যতের পরিসরও ছোট করে দেয়। আর সেই ছোট হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ যখন পরের প্রজন্মের হাতে পৌঁছায়, তখন একই গল্প আবার শুরু হয়।
এই চক্রটাই ভাঙতে হবে।
কিন্তু কীভাবে?
শুধু শিশুকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই হবে না। আবার শুধু পরিবারকে কিছু টাকা দিলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দুটো কাজকেই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রথমত, পরিবারকে এমন সহায়তা দিতে হবে, যাতে শিশুর আয় সংসারের জন্য অপরিহার্য না হয়ে পড়ে। দরিদ্র পরিবারের জন্য নিয়মিত সামাজিক সহায়তা, খাবারের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচে সহযোগিতা থাকলে শিশুকে কাজে পাঠানোর চাপ কমবে। স্কুলে বিনামূল্যে বই, পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থাও এই চাপ অনেকটা কমাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যে শিশুরা ইতিমধ্যে স্কুল থেকে অনেক দূরে চলে গেছে, তাদের জন্য আলাদা পথ দরকার। আট-দশ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দেওয়া একটা শিশুকে হঠাৎ তার বয়সী শ্রেণিতে বসিয়ে দিলেই সে স্বাভাবিকভাবে পড়া শুরু করবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তার শেখার ঘাটতি পূরণ করার জন্য সেতু-শিক্ষা, বিকল্প পাঠশালা ও পুনরায় স্কুলে ফেরানোর বিশেষ ব্যবস্থা দরকার।
তৃতীয়ত, ঝরে পড়া শিশুকে খুঁজে বের করতে হবে। স্কুলে সে কেন আসছে না, পরিবারে কী সমস্যা, সে কোথায় কাজ করছে—এসব জানতে হবে। শিক্ষক, সমাজকর্মী, স্থানীয় প্রশাসন ও দায়িত্বশীল সংগঠন একসঙ্গে কাজ করলে অনেক শিশুকে রাস্তায় হারিয়ে যাওয়ার আগেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
আর একটা বিষয় খুব জরুরি—শিশুটিকে দোষ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে বলে অপরাধী নয়। সে স্কুলে যেতে পারেনি বলে অলস নয়। তার হাতে বই নেই বলে তার মেধাও কম নয়।
হয়তো সে কখনো ঠিকমতো জানতেই পারেনি, একটা বই তার জীবন কোথায় নিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু আমরা জানি।
তাই তাকে শুধু ‘স্কুলে যাও’ বললেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। তার যাওয়ার মতো একটা পথ তৈরি করাও আমাদের দায়িত্ব।
একটা শিশুর হাতে প্লাস্টিকের বস্তা দেখে যদি আমাদের শুধু বিরক্তি লাগে, তাহলে একবার নিজের দৃষ্টিটাও পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
কারণ ওই বস্তাটা তার হাতে থাকার কথা ছিল না।
তার হাতে একটা বই থাকার কথা ছিল।
আর সেই বইটা তার হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয়।
পরিবারের সঙ্গে রাষ্ট্রের, সমাজের—আর শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।