একটি সিদ্ধান্তের দাম
পর্ব–২ : মিথ্যার শুরু
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধারাবাহিক গল্প
রাতটা এক বিছানায় কাটল। তবু দুজনের মাঝে যেন একটা দেয়াল উঠে গেল।
নিশি আর প্রশ্ন করেনি।
লাভ হবে না, সে বোঝে। অভিক কিছু লুকাতে চাইলে তার মুখ থেকে কথা বের করা কঠিন। তবু ঘুম এলো না। পাশে শুয়ে থাকা মানুষটার নিঃশ্বাসের ওঠানামা শুনতে শুনতে মাথায় ঘুরল একটাই কথা—
ঋণ? কিসের জন্য?
ভোরে চোখ মেলে দেখল, বিছানা খালি।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে অভিক ফোনে কথা বলছে। গলা নামানো, তবু শেষ কথাটা স্পষ্ট কানে এলো।
“আর দু-একটা দিন সময় দে। আমি ব্যবস্থা করছি।”
নিশি বারান্দায় পা দিতেই ফোন কেটে গেল।
“এত সকালে কার সঙ্গে কথা?”
“অফিসের একজন।”
বলল ঠিকই। চোখ তুলল না। হাতের আঙুল কাঁপছিল কি না কে জানে।
নিশি আর কথা বাড়াল না।
নাস্তা শেষ হতেই অভিক বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা আজ অন্যরকম লাগল। ভারী। যেন কিছু আটকে গেল ভেতরে।
দুপুরে আলমারি গোছাতে গিয়ে নিশির হাতে পড়ল একটা নীল ফাইল।
অভিক দরকারি কাগজ খুব সাবধানে রাখে। ফাইলটা খুলতেই বেরোল কিছু ব্যাংকের স্টেটমেন্ট। একটা ছোট হিসাবের খাতা। পেজ উল্টাতে গিয়ে চোখে পড়ল কয়েকটা মানি রিসিপ্ট। আর একটা কাগজ—উপরে লাল কালিতে বড় করে লেখা: “বকেয়া পরিশোধের শেষ তারিখ: ১২ জুলাই।”
বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সংসারের হিসাব থেকে নিশি কখনো নিজেকে আলাদা রাখেনি। বাজার, কারেন্ট বিল, বাবার ওষুধ—সব সে জানে। তবু এত বড় একটা দায় সে টের পেল না কীভাবে?
ঠিক তখনই কলিং বেল।
দরজা খুলে দেখল রাশেদ সাহেব। নিচতলায় থাকেন।
“মা, অভিক বাসায়?”
“না, অফিসে।”
লোকটা একটু থামল। গলায় অস্বস্তি। “ওকে বলো, আমার টাকাটা যেন আর দেরি না করে। অনেক দিন হলো।”
নিশি অবাক। “কী টাকা?”
রাশেদ সাহেব বুঝলেন, ভুল সময়ে ভুল কথা বলে ফেলেছেন। “না... কিছু না। ও বুঝবে।”
হনহন করে নেমে গেলেন।
নিশি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। পাঁচ মিনিট, হয়তো আরও বেশি।
এতদিনে প্রথমবার মনে হলো, অভিক শুধু কিছু চাপা দিচ্ছে না। অনেক কিছু চাপা দিচ্ছে। আর প্রতিটা চাপা দেওয়া কথা একেকটা নতুন ফাটল।
রাতে অভিক ফিরল দশটার পর। চোখের নিচে কালি। গাল ভেঙে গেছে একটু।
নিশি ভাত গরম করে সামনে দিল।
খেতে খেতেই বলল, “রাশেদ সাহেব এসেছিলেন।”
অভিকের হাত থেমে গেল। ভাতের লোকমা প্লেটেই পড়ে রইল। “কেন?”
“বললেন, তোমার কাছে নাকি টাকা পাবেন।”
অভিক জোর করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। হাসিটা বসল না। “আরে, ওটা কিছু না। ধার নিয়েছিলাম। দিয়ে দেব।”
“কত টাকা?”
“বেশি না।”
“কত?”
চামচটা শব্দ করে নামিয়ে রাখল অভিক। “সব হিসাব তোমাকে দিতে হবে?”
নিশি গলাটা নামাল। শান্ত, কিন্তু নরম নয়। “আমি হিসাব চাইছি না। আমি সত্যিটা জানতে চাইছি।”
অভিক তাকাল না। প্লেট ঠেলে উঠে গেল। অর্ধেক ভাত পড়ে রইল।
রাতে নিশির ঘুম হলো না।
বিয়ের পরের প্রথম বছরের কথা মনে পড়ল। অভিকের পকেটে তখন ২০০ টাকা থাকলেও সে বলত, “আজ ২০০ আছে।” টাকা কম ছিল। কিন্তু লুকোচুরি ছিল না।
আজ টাকা নেই, আর সত্যিটাও নেই হয়তো। এই বদলটাই কষ্ট দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
পরদিন অফিস শেষে অভিক সরাসরি রুবেলের ডেরায় গেল। চা-পানের দোকানের পেছনে একটা ঘুপচি ঘর।
“আর টাকা লাগবে।”
রুবেল সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। “বলেছিলাম না? শুরু করলে মাঝপথে থামা যায় না।”
“শেষবার।”
রুবেল হাসল। চোখ ছোট হয়ে এলো। “এই কথাটাই সবাই বলে।”
টেবিলের ড্রয়ার থেকে নতুন একটা কাগজ বের করল। “এবার জামানত একটু বাড়াতে হবে।”
অভিক কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। শব্দগুলো চেনা, কিন্তু অর্থটা আজ আরও ভারী। “আর কোনো উপায় নেই?”
“আছে।”
“কী?”
“টাকা ফেরত দে।”
অভিক মাথা নিচু করল। সেই ক্ষমতা তার নেই।
একটা ভুল সিদ্ধান্ত এখন তাকে ঠেলে দিয়েছে আরেকটা ভুলের দোরগোড়ায়। সিঁড়িটা কেবল নিচে নামছে।
কলমটা হাতে নিল। হাতটা নিজের মনে হলো না। যেন অন্য কারও।
গভীর রাতে বাড়ি ফিরে দেখল, নিশি জেগে।
ঘরের বাতি নেভানো। শুধু ডাইনিং টেবিলে একটা কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। আলোটা হলদে, ক্লান্ত।
নিশি কোনো কথা না বলে একটা বাদামি খাম এগিয়ে দিল।
অভিক খুলে দেখল। ভেতরে নিশির সব গয়না। সেই চিকন চেইনটা, দুটো বালা, কানের ছোট দুল। বিয়েতে পাওয়া।
নিশি খুব ধীরে বলল, “যদি সত্যিই এত দরকার হয়, নিয়ে যাও।”
একটু থামল। তারপর বলল, “কিন্তু একটা কথা মনে রেখো... টাকা হারালে আবার রোজগার করা যায়। বিশ্বাস হারালে সেটা আর সহজে ফেরে না।”
অভিক খামটার দিকে তাকিয়ে রইল। গলার কাছে কিছু আটকে আছে।
তার মনে হলো, গয়নার চেয়ে বড় কিছু সে ইতিমধ্যে খরচ করে ফেলেছে। আর সেই খরচের হিসাবটা এখন শুধু সে একাই শুনতে পাচ্ছে। শব্দটা ক্ষীণ। তবু কানে লাগছে।
(চলবে............পর্ব–৩ : ভাঙনের শব্দ)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।