সম্পর্কের শেষ কথাগুলো
পর্ব ২ — স্বাধীনতা?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ৮ আগস্ট, ২০২৬
একজন নারী নিজের পায়ে দাঁড়ালে যদি একটা সংসার ভেঙে যায়, তাহলে প্রথম প্রশ্নটা নারীর স্বাধীনতা নিয়ে হওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্ন করা দরকার—সংসারটা এতদিন কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল?
এই প্রশ্ন এখন ঘরে ঘরে শোনা যায়। “মেয়েরা এখন বেশি স্বাধীন হয়ে গেছে বলেই সংসার টিকছে না।” “আগে তো এত সংসার ভাঙত না।” কথাগুলো শুনতে সহজ। কিন্তু সম্পর্কের ভেতরের গল্পটা এত সহজ নয়। কারণ একটি সংসার শুধু ভালোবাসায় তৈরি হয় না। সেখানে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, দায়িত্ব, সামাজিক প্রত্যাশা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—সবকিছুরই ভূমিকা থাকে। সময় বদলালে এই সমীকরণও বদলায়। আর সেই বদল অনেক পুরোনো সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসে।
একসময় আমাদের সমাজে দাম্পত্যের একটা প্রচলিত ছবি ছিল। পুরুষ উপার্জন করবেন, বড় সিদ্ধান্ত নেবেন। নারী সংসার সামলাবেন, সন্তান বড় করবেন, পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে চলবেন। সব পরিবার এমন ছিল না, কিন্তু এই কাঠামোটাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হতো। সমস্যা ছিল, দায়িত্ব সবসময় সমানভাবে ভাগ হলেও ক্ষমতা সমানভাবে ভাগ হতো না। রান্না, সন্তান পালন, ঘর সামলানো, অসুস্থ মানুষের যত্ন—এসব ছিল নারীর দায়িত্ব, কিন্তু এগুলোর মূল্য অনেক সময় আলাদা করে দেখা হতো না।
এখন সেই ছবি বদলেছে। মেয়েরা পড়ছে, চাকরি করছে, ব্যবসা করছে, নিজের আয় করছে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসও বাড়ছে। ফলে আগে যে প্রশ্নগুলো মুখে আনা কঠিন ছিল, এখন সেগুলো করা সম্ভব হচ্ছে—“সবসময় আমাকেই কেন মানিয়ে নিতে হবে?” “সংসারের দায়িত্ব কি শুধু আমার?” “আমার মতামতের মূল্য কোথায়?”
এই প্রশ্নগুলোকে অনেক সময় অহংকার বলা হয়। অথচ আত্মসম্মান আর অহংকার এক জিনিস নয়। আত্মসম্মান বলে, “আমাকেও মানুষ হিসেবে সম্মান করতে হবে।” অহংকার বলে, “আমার কথাই শেষ কথা।” এই পার্থক্যটা বুঝতে না পারলে নারীর স্বাধীনতাকেও আমরা ভুলভাবে বিচার করব।
একজন নারী উপার্জন করেন বলেই তিনি সংসারকে কম ভালোবাসবেন—এমন কোনো নিয়ম নেই। আবার নিজের আয় আছে বলেই সংসারের কোনো দায়িত্ব থাকবে না—এটাও ঠিক নয়। একই কথা পুরুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দাম্পত্য মানে দুজন মানুষের যৌথ জীবন। সেখানে স্বাধীনতা থাকবে, আবার দায়িত্বও থাকবে। নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে, আবার যৌথ সিদ্ধান্তে সঙ্গীর মতামতের মূল্যও থাকবে।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন একজনের স্বাধীনতাকে আরেকজন হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেন। স্ত্রী উপার্জন করছেন—এটা যদি স্বামীর কাছে সহযোগিতা না হয়ে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মনে হয়, সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হবেই। আবার স্ত্রী উপার্জন করছেন বলে যদি মনে করেন, এখন থেকে সম্পর্কের কোনো দায়িত্বই তার নেই, সেখানেও দূরত্ব তৈরি হবে। অর্থাৎ স্বাধীনতা নিজে সমস্যা নয়; স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব, সম্মান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গা তৈরি না হওয়াটাই সমস্যা।
কর্মজীবী নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। একজন নারী সকালে অফিসে গেলেন, সারাদিন কাজ করলেন, তারপর বাড়ি ফিরে রান্না, সন্তানের পড়াশোনা, ঘরের কাজ, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনা—সবকিছু সামলালেন। একে যদি “স্বাধীনতার সমস্যা” বলা হয়, তাহলে আসল সমস্যাটাই আড়ালে থেকে যায়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—সংসারের কাজটা দুজন ভাগ করে নেওয়া যায় না?
নারী বাইরে কাজ করবেন, আবার ঘরের সব কাজও একা করবেন—এটা সমতা নয়। একইভাবে পুরুষ শুধু উপার্জন করলেই তার সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানো, ঘরের কাজে অংশ নেওয়া, স্ত্রীর ক্লান্তি বোঝা, তার কাজ ও স্বপ্নকে সম্মান করা—এসবও দাম্পত্যের দায়িত্ব।
তবে স্বাধীনতার অর্থ দায়িত্বহীনতাও নয়। নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার যেমন একজন নারীর আছে, তেমনি তার সঙ্গীর অনুভূতি ও অধিকারকে সম্মান করার দায়িত্বও আছে। সম্পর্কের ভেতরে স্বাধীনতা মানে “আমি যা চাই তাই করব” নয়। বরং এর অর্থ—আমি নিজের মানুষটুকু হারাব না, আবার তোমার মানুষটুকুকেও অস্বীকার করব না।
পুরুষের ভূমিকাটাও তাই নতুন করে ভাবতে হবে। সংসারে শুধু টাকা এনে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। একজন স্বামীকে সঙ্গীও হতে হয়। স্ত্রীর পেশাগত চাপ বুঝতে হয়, সন্তান পালনের দায়িত্ব নিতে হয়, ঘরের কাজে হাত লাগাতে হয়, কখনো শুধু চুপ করে পাশে বসে শুনতেও হয়। একইভাবে নারীকেও বুঝতে হবে, পুরুষের ওপর শুধু উপার্জনের দায়িত্ব চাপিয়ে রেখে তাকে আবেগহীন মানুষ ভাবা যায় না। দুজনেরই ক্লান্তি আছে, চাপ আছে, স্বপ্ন আছে।
তাই কোনো সংসার ভাঙলেই সরাসরি বলা যায় না—“নারীর স্বাধীনতার জন্য ভেঙেছে।” আবার এটাও বলা যায় না যে স্বাধীনতা এলেই সব সম্পর্ক ভালো হয়ে যাবে। কোনো সম্পর্ক ভাঙে দীর্ঘদিনের অসম্মান, অবহেলা, দায়িত্বের অসম বণ্টন, যোগাযোগের অভাব, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা বিশ্বাসের সংকটে। অনেক সময় নারীর স্বাধীনতা শুধু সেই পুরোনো সমস্যাগুলোকে আর লুকিয়ে রাখতে দেয় না।
একটা সংসার যদি একজন মানুষের নীরবতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই নীরবতা ভাঙলেই সংসার কেঁপে উঠবে। কিন্তু তখন সমস্যাটা নীরবতা ভাঙার মধ্যে নয়; সমস্যাটা ছিল ভিতের মধ্যে।
শেষ পর্যন্ত সুস্থ সংসারে কেউ কারও মালিক নয়। দুজন মানুষ পাশাপাশি থাকবে, কিন্তু দুজনেরই নিজস্ব পরিচয় থাকবে। একজনের সাফল্য আরেকজনের পরাজয় হবে না। একজন ক্লান্ত হলে অন্যজন দায়িত্ব নেবে। একজন কষ্ট পেলে অন্যজন শুনবে। মতের অমিল হলে অপমান নয়, কথা হবে।
নারীর স্বাধীনতা সংসার ভাঙে—এই কথাটা তাই খুব সহজ উত্তর। আসল প্রশ্নটা আরও গভীর।
আমাদের সংসার কি এমনভাবে তৈরি, যেখানে একজন নারী স্বাধীন হয়েও ভালোবাসতে পারেন, আর একজন পুরুষ সম্মান দিয়েও নিজের মর্যাদা ধরে রাখতে পারেন?
কারণ সংসার টেকে কারও চুপ করে থাকার ওপর নয়।
সংসার টেকে তখনই, যখন দুজন মানুষই স্বাধীন থেকেও একে অপরের পাশে থাকার পথ খুঁজে নেয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।