সিরিজ -আমাদের না-বলা কথা।
গল্প-০৬
ঈদের সকাল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৮ আগষ্ট, ২০২৬
ঈদের সকালে মা নতুন শাড়ি পরেননি। সবাইকে বললেন, "আমার পুরোনোটাই বেশি ভালো লাগে।"
ঘরে তখন উৎসবের গন্ধ। রান্নাঘর থেকে দুধে ভেজা সেমাইয়ের গন্ধ ভেসে আসছে। উঠোনে বাবার গলা শোনা যাচ্ছে, "তাড়াতাড়ি কর, নামাজে যেতে হবে।" ছোট ভাই নতুন পাঞ্জাবি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার কলার ঠিক করছে।
আমি তখন কলেজে পড়ি। আগের রাতে নিজের জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনেছি। বোনের জন্য ফ্রক। বাবারও একটা সাদা পাঞ্জাবি হয়েছে এ বছর। শুধু মায়ের শাড়িটা আগের বছরের।
সবুজ জমিনে ছোট ছোট ফুল। আমি চিনতে পারলাম। এই শাড়িটা মা গত ঈদেও পরেছিলেন।
জিজ্ঞেস করলাম, "মা, তোমার নতুনটা কোথায়?"
মা চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে হেসে বললেন, "ওটা পরে কী হবে? এটাই আমার বেশি পছন্দ।"
আমি জানতাম, মা মিথ্যে বলছেন। মা শাড়ি খুব ভালোবাসে। বাজারে গেলে রঙিন শাড়ির দোকানের সামনে একটু দাঁড়ায়। আঁচল ধরে হাত বুলিয়ে দেখে। তারপর বলে, "থাক, পরে নেব।"
ঈদের এক সপ্তাহ আগে মা একবার বলেছিল, "এবার একটা হালকা রঙের শাড়ি নিলে ভালো হয়।" বাবা তখন চুপ করে ছিল। হিসাব মিলছিল না। আমার কোচিংয়ের টাকা, বোনের স্কুলের বই, বাজারের দাম। সব মিলিয়ে শেষে মা নিজেই বলেছিল, "থাক, দরকার নেই।"
ঈদের সকালে বুঝলাম, সেই কথাটাই সত্যি হয়ে গেছে।
নামাজে যাওয়ার আগে মা সবার জামা ঠিক করে দিল। বাবার পাঞ্জাবির বোতাম, ভাইয়ের টুপি, বোনের চুলের ফিতা। নিজের শাড়ির ভাঁজটাও ঠিক করে নিল। কিন্তু আঁচল ঠিক করার সময় চোখে এক মুহূর্তের জন্য কী যেন খেলে গেল। খুব ছোট, খুব চুপচাপ।
আমরা কেউ কিছু বললাম না।
নামাজ শেষে ফিরে সবাই মায়ের হাতে সালামি দিল। মা নোটগুলো ভাঁজ করে আঁচলের কোণে গুঁজে রাখল। বলল, "এই টাকা দিয়ে বিকেলে মিষ্টি আনিস।"
বিকেলে অতিথি এলো। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। গরম পোলাও, রোস্ট, সেমাই, সব ঠিকঠাক। বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না, এই বাড়িতে হিসাব মেলাতে গিয়ে কত কিছু বাদ দিতে হয়েছে।
রাতে সবাই খাওয়া শেষ করে বসেছে, আমি মায়ের কাছে গিয়ে বললাম, "মা, তোমার জন্য একটা শাড়ি কিনব। এখন না, পরে।"
মা হেসে বলল, "পরে কিনিস। আগে তোদের পড়াশোনাটা শেষ হোক।"
মায়েরা এই 'পরে' শব্দটা খুব সহজে বলে ফেলে। অথচ সেই পরেটা অনেক সময় আর আসেই না।
কয়েক বছর পর চাকরি পেলাম। প্রথম মাসের বেতন হাতে নিয়ে সোজা বাজারে গেলাম। মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনলাম। হালকা রঙের। যেমনটা সে একদিন দোকানে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
শাড়িটা হাতে দিয়ে বললাম, "এবার আর বোলো না যে পুরোনোটাই ভালো লাগে।"
মা হাসল। চোখে জল চিকচিক করছিল। বলল, "তোরা ভালো থাকলেই আমার সব ভালো লাগে।"
ঈদের সকালের ওই পুরোনো শাড়িটা আমি এখনও ভুলিনি। ওই শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে ছিল আমাদের নতুন জামা, আমাদের হাসি, আমাদের ঈদ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।