সিরিজ -আমাদের না-বলা কথা।
গল্প-০৫
তিন বছরের ভাঙা কাঁচ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৮ আগষ্ট, ২০২৬
আরিফ প্রথম খেয়াল করেছিল ক্লাস সেভেনে থাকতে। বাবা খবরের কাগজ পড়ছেন, চশমাটা কপালের একপাশে হেলে আছে। ডান দিকের কাঁচে মাঝ বরাবর একটা ফাটল। সেই ফাটলের ভেতর দিয়ে বাবা কীভাবে দেখেন, আরিফ বুঝতে পারত না।
সে জিজ্ঞেস করেছিল, "বাবা, চশমাটা বদলাবে না?"
বাবা কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলেছিলেন, "চলছে তো।"
বাবার নাম করিম মিয়া। ছোট একটা মুদির দোকান চালান। সকাল আটটায় খোলেন, রাত দশটায় বন্ধ করেন। মাঝে একবার বাড়ি আসেন, দুপুরে ভাত খেতে। খাওয়ার সময় বেশি কথা বলেন না। শুধু জিজ্ঞেস করেন, "পড়াশোনা কেমন চলছে?"
ওই দোকানের আয়েই সংসার চলে। মায়ের ওষুধ, বোনের স্কুলের বেতন, বাড়ি ভাড়া, আর আরিফের কোচিং।
আরিফ বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে। দুই বছর আগে কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছে। মাসে পনেরোশো টাকা ফি। বাবা কোনো মাসে দেরি করেননি।
কিন্তু নিজের চশমাটা বদলাননি। তিন বছর হয়ে গেল।
একবার আরিফ মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, "মা, বাবার চশমাটা কবে বদলাবে?"
মা একটু চুপ করে থেকে বলেছিল, "তোর পরীক্ষাটা শেষ হোক।"
তখনই ও বুঝেছিল, বাবা হিসাব করে রেখেছে। আগে কোচিং, তারপর চশমা।
পরীক্ষার আগের রাতে আরিফ দেখল, বাবা বারান্দায় বসে কিছু একটা পড়ছেন। ভাঙা চশমাটা নাকের ওপর থেকে একটু নামিয়ে বইটা চোখের কাছে এনেছেন। চোখ কুঁচকে পড়ছেন। আলো কম, তবু বইটা সরাচ্ছেন না।
আরিফ বলল, "বাবা, কী পড়ছ?"
বাবা হেসে বললেন, "তোর পরীক্ষার রুটিনটা দেখছি। কোনটা আগে, কোনটা পরে।"
আরিফের গলায় হঠাৎ কিছু একটা আটকে গেল।
পরীক্ষা শেষ হলো। ফল ভালো হলো। ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ পেল। খবরটা শুনে বাবা কিছু বললেন না, শুধু ওর মাথায় হাত রাখলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় আরিফ নিজেই বলল, "বাবা, চলো, চশমাটা বদলে আনি।"
বাবা একটু অবাক হলেন, "এখন?"
"হ্যাঁ, এখনই।"
দোকানে গিয়ে বাবা যখন নতুন চশমাটা পরলেন, অনেকক্ষণ চুপ করে চারপাশে তাকিয়ে রইলেন। এদিক ওদিক দেখলেন। চোখে একটা অন্য রকম আলো এলো।
আরিফ বলল, "কেমন দেখছ?"
বাবা বললেন, "সব পরিষ্কার।"
একটু থেমে আস্তে বললেন, "আগেরটায় অনেক কিছু ঝাপসা লাগত। তবু চলে গেছে।"
আরিফ জানে, বাবা শুধু চশমার কথা বলছেন না।
বাড়ি ফেরার পথে বাবা আর চশমার কথা তুললেন না। চুপচাপ হাঁটছিলেন। আরিফও চুপচাপ।
কিছু ত্যাগ কথায় বোঝানো যায় না। সেটা দেখা যায়, তিন বছর ধরে ভাঙা কাঁচের ভেতর দিয়ে পার করে দেওয়া এক বাবার চোখে।
সেই ফাটা কাঁচে বাবা হয়তো সবকিছু ঝাপসা দেখতেন, কিন্তু ছেলের ভবিষ্যৎটা তিনি একদম পরিষ্কার দেখতে পেতেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।