যে চিঠি কখনো পোস্ট হয়নি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছয় পর্বের ছোটগল্প
২৪ আগষ্ট, ২০২৬
পর্ব তিন
মীরার নীল খাতা
বৃদ্ধার নাম মালবিকা।
পরদিন তিনি সত্যিই এলেন। সঙ্গে কোনো চিঠি নেই। এক কাপ চা নিয়ে অনিরুদ্ধের পাশে বসে বললেন, “আজ লিখিনি।”
“কেন?”
“রাগ ছিল।”
“মৃত মানুষের ওপরও রাগ হয়?”
মালবিকা চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“মৃত মানুষকে নিয়ে রাগ করা সহজ। জীবিত থাকলে তো উত্তর দিতে হয়।”
অনিরুদ্ধ হেসে ফেললেন।
সেই প্রথম তিনি মালবিকার মধ্যে একজন সম্পূর্ণ মানুষকে দেখতে পেলেন। শুধু শোকাহত বিধবা নন। তিনি তাঁর স্বামীর ওপর রাগ করতেন। স্বামীর আলস্য নিয়ে বিরক্ত ছিলেন। বাজার থেকে ভুল জিনিস এনে দেওয়া নিয়ে ঝগড়া করতেন। মাঝরাতে নাক ডাকার জন্য পাশ ফিরে শুতেন। আবার সেই মানুষটি অসুস্থ হলে সারারাত মাথার কাছে বসেও থাকতেন।
মালবিকা বলতেন,
“ভালোবাসা মানে সারাক্ষণ ভালো লাগা নয় বাবা। কখনো খুব বিরক্ত লাগার পরও মানুষটার জন্য ভাতটা গরম করে রাখা।”
এই কথাটি অনিরুদ্ধের মনে গেঁথে গেল।
একদিন মালবিকা বললেন,
“আপনার বউ ছিল?”
অনিরুদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“ছিল।”
“কত বছর হলো?”
“সাত।”
“চিঠি লেখেন?”
অনিরুদ্ধ হেসে বললেন, “না।”
মালবিকা বললেন,
“লিখে দেখবেন। পাঠাবেন না। তবু লিখবেন।”
সেদিন রাতে অনিরুদ্ধ বাড়ি ফিরে বহুদিন পর মীরার আলমারি খুললেন। একটা শাড়ি বের করলেন। তার ভাঁজের মধ্যে এখনো মৃদু একটা গন্ধ ছিল। তিনি শাড়িটা আবার রেখে দিলেন।
তারপর নিচের তাকে পেলেন একটি নীল খাতা।
খুলতেই প্রথম পাতায় লেখা,
“অনিরুদ্ধের জন্য।”
নিচে,
“তুমি কথা শোনার সময় খুব কম পাও। তাই লিখে রাখছি। পরে পড়বে।”
অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে পাতা উল্টাতে লাগলেন। কোথাও বাজারের হিসাব। কোথাও মেয়ের স্কুলের কথা। কোথাও তাঁর জন্য শীতের পাঞ্জাবি কিনতে হবে।
এক পাতায় লেখা,
“আজ তোমার ওপর রাগ করেছি। কারণ তুমি খাওয়ার সময়ও অফিসের কথা ভাবছিলে।”
আরেক পাতায়,
“আজ তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। কিছু বলিনি।”
তারপর শেষের দিকে একটি তারিখ। মীরার মৃত্যুর আগের দিন।
মাত্র দুটি লাইন,
“আজ তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।
বলা হলো না।”
তার নিচে আর কিছু নেই।
অনিরুদ্ধ খাতাটা বন্ধ করলেন।
সেই রাতেই তিনি প্রথমবার বুঝলেন—মীরা হয়তো কোনো বড় কথা বলতে চায়নি।
হয়তো বলতে চেয়েছিল, “ভয় লাগছে।”
অথবা, “আমার পাশে একটু বসো।”
অথবা, “তুমি থাকলে আমার ভালো লাগে।”
এখন আর জানার উপায় নেই।
অনিরুদ্ধ খাতাটা বুকে চেপে ধরে মেঝেতে বসে রইলেন।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
অনেক বছর পর তাঁর মনে হলো, কান্নারও একটা শব্দ আছে।
খুব ক্ষীণ।
তবু আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।