#তুমি_অনিবার্য
পর্ব: ১১
লেখনি: ইসরাত জাহান
বৃষ্টি থেমেছে অনেক রাতে, কিন্তু রায়বাড়ির ছাদ থেকে টুপটুপ করে জল পড়ার শব্দটা এখনো থামেনি। মেহুর ঘরের ভেতরটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিমজ্জিত। মাজেদুল রায় কাল রাতে বাহির থেকে কপাট বন্ধ করে দিয়ে গেছেন। এই ঘরটা এখন আর মেহুর শয়নকক্ষ নেই, এটা এখন এক ‘আলোকবর্জিত নির্জন কারাগার’।বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে মাঝে মাঝেই বাবার ভারী পদধ্বনি আর মায়ের চাপা কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল।
মেহু মেঝের ওপর পড়ে ছিল। তার গায়ের সেই সাদা সুতির কামিজ এখন কুঁচকে গেছে, শিউলি চত্বরের ধুলো আর জলঙ্গীর ঘাটের আর্দ্রতা এখন এক অদ্ভুত গুমোট গন্ধ ছড়াচ্ছে। তার চোখের জল শুকিয়ে গালের ওপর নোনা দাগ ফেলে দিয়েছে। সে চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছিল ঈশানের সেই রক্তমাখা হাত।সারা রাত সে চোখের পাতা এক করতে পারেনি।
সে বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল,
—“ঈশান কি সত্যিই পাগল? নাকি এই পাগলামিটাই একমাত্র সত্য?”
হঠাৎ বাইরের বারান্দায় খুব ধীর, অতি সন্তর্পণে কারো পদধ্বনি শোনা গেল। মেহু উৎকর্ণ হয়ে শুনল। কড়া নাড়ার কোনো শব্দ নেই, কেবল দরজার তলা দিয়ে একটা ছোট কাগজের টুকরো ভেতরে ঠেলে দেওয়া হলো। মেহু দ্রুত উঠে গিয়ে কাগজটা হাতে নিল। অন্ধকারেই আঙুল বুলিয়ে সে অনুভব করল কাগজটা খসখসে। পকেট থেকে লুকানো মোবাইল ফোনের হালকা আলোয় সে দেখল ওটা ঝুমুরের হাতের লেখা।
“মেহু, ভয় পাস না। ঈশান কাল রাতের পর থেকে নিখোঁজ। ওর বাড়িতে খবর গেছে, পুলিশও হয়তো খুঁজবে। কিন্তু শহরজুড়ে রটে গেছে ও নাকি জলঙ্গীতে ঝাঁপ দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না। ও তোকে ছাড়া মরতে পারে না। তুই শুধু শক্ত থাক। তোর কাকা চেষ্টা করছেন তোর বাবার সাথে কথা বলতে। আমি আসব খুব জলদি।”
মেহুর হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল। ‘নিখোঁজ’। এই শব্দটা ‘মৃত্যু’র চেয়েও বেশি ভয়ংকর। ঈশান নেই মানে কৃষ্ণনগরের এই আকাশটা এখন এক বিশাল শূন্যতা। সে জানালার খড়খড়িটা সামান্য সরাল। বাইরে ভোরের আলো ফুটেছে, কিন্তু সেই আলোয় কোনো প্রাণ নেই।
ঠিক তখনই তার মনে পড়ল ঈশানের সেই শেষ কথাগুলো— “আয়নার সামনে দাঁড়ালে দেখবি, তোর চোখের ওই কালচে ছায়াটায় আমিই বসে আছি।”
মেহু টলতে টলতে ঘরের কোণে থাকা বড় সেগুন কাঠের আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভোরের আবছা আলোয় সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। অবিন্যস্ত চুল, বিবর্ণ ঠোঁট, আর সেই গভীর চোখ দুটো। মেহু চমকে উঠল। তার চোখের নিচে যে কালো কালি পড়েছে, সেই ছায়াটা যেন ক্রমে আকার নিচ্ছে। সে আয়নায় নিজের দিকে তাকাচ্ছে না, সে যেন ঈশানের সেই ‘অনিবার্য’ আসক্তিটাকেই নিজের ভেতরে দেখতে পাচ্ছে।
সে অনুভব করল, ঈশান তাকে শুধু ভালোবাসেনি, ঈশান তাকে নিজের এক ‘মানসিক অংশ’ করে নিয়েছে। এখন ঈশান যেখানেই থাকুক, সে আসলে মেহুর অস্তিত্বের ভেতর নিঃশ্বাস নিচ্ছে। মেহু যখন তার শাদা কামিজের হাতাটা সরাল, সে দেখল তার কব্জিতেও যেন ঈশানের সেই শক্ত হাতের মুঠোর লালচে দাগ রয়ে গেছে।
নিচতলা থেকে আবার মাজেদুল রায়ের হুংকার ভেসে এল। এবার তিনি মেহুর মা আর কাকার ওপর চিৎকার করছেন। —“কোনো পুলিশ-কেস হবে না! রায়বাড়ির কলঙ্ক আমি রাস্তায় চাউর করতে দেব না। ওই ছোকরা মরলে মরুক,
খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে এক ধরণের ‘ভয়ানক সুর’ ছিল। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল, —“বাবা, তুমি যাকে তালাবন্ধ করে রেখেছ, সে তো তোমার মেহু নয়। মেহুকে তো ঈশান কাল রাতেই নিজের রক্তের সাথে মিশিয়ে নিয়ে চলে গেছে। এই ঘরে এখন শুধু একটা ছায়া পড়ে আছে।”
মেহুর হাসির রেশটুকু ঘরের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। আয়নার ভেতরে তার নিজের প্রতিচ্ছবিটা এখন আর অচেনা মনে হচ্ছে না। চোখের নিচে পড়ে থাকা সেই গাঢ় কালচে কালি যেন এক একটা মানচিত্র, যা কেবল ঈশানের কাছে পৌঁছানোর পথ চেনে। মেহু অনুভব করল, ঈশানের নিখোঁজ হওয়াটা কোনো হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং এক ভয়ংকর ‘উপস্থিতি’। সে নেই বলেই সে এখন সর্বত্র বাতাসে, বৃষ্টির গন্ধে, এমনকি মেহুর নিঃশ্বাসের ধুকপুকানিতেও।
মাজেদুল রায়ের চিৎকার নিচতলায় ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। হয়তো তিনি নিজের আভিজাত্যের পরাজয় ঢাকতে এখন ড্রয়িংরুমের গদিতে বসে তামাক টানছেন। মেহু ধীর পায়ে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। আকাশটা এখন নীলাভ-ধূসর, ঠিক যেমনটা ঈশান ভালোবাসত।
হঠাৎ তার মনে পড়ল ঈশানের সেই স্কেচবুকটার কথা। কাল রাতে সেটা কি ধুলোয় পড়েছিল? না কি ঈশান ওটা বুকে আঁকড়ে নিয়ে গেছে? মেহু জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকাল। শিউলি চত্বরের সেই ঝোপটার ধারে একটা সাদা রঙের জিনিস আটকে আছে। মেহুর বুকটা ধক করে উঠল।
সে পাগলের মতো দরজার দিকে ছুটে গেল। কপাটে সজোরে আঘাত করতে করতে চিৎকার করে বলল,
—“বাবা ! দরজা খোলো! আমাকে বের হতে দাও! আমি জানি ঈশান কোথায় আছে, আমি জানি ও মরেনি!”
কিছুক্ষণ পর দরজার চাবি ঘোরানোর শব্দ হলো। মাজেদুল রায় নন, কাকা আব্দুল কাদের রায় দরজা খুললেন। তাঁর মুখে এক বিষণ্ণ ক্লান্তির ছাপ। মেহুর এই আলুথালু বেশ আর চোখের উন্মাদনা দেখে তিনি শিউরে উঠলেন।
—“মেহু, শান্ত হ মা। তোর বাবা বাইরে গেছেন, এই সুযোগে একটু খেয়ে নে।”
মেহু কাকার কথা কানেই তুলল না। সে কাকাকে পাশ কাটিয়ে ঝড়ের বেগে নিচে নেমে এল। শিউলি-চত্বরে পৌঁছে সে দেখল, সেই সাদা কাগজটা আসলে ঈশানের স্কেচবুক থেকে ছিঁড়ে যাওয়া একটা অসমাপ্ত ছবি। রক্ত শুকিয়ে সেখানে কালচে রঙ ধারণ করেছে। কিন্তু ছবির বিষয়বস্তু দেখে মেহুর শরীর হিম হয়ে গেল। ঈশান সেখানে কোনো মানুষের মুখ আঁকেনি, এঁকেছে একটা প্রকাণ্ড লোহার খাঁচা, যার দরজাটা হাট করে খোলা। আর নিচে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা—
“খাঁচাটা রইল, পাখিটা এখন আমার শিকারে পরিণত হলো। তুই আসছিস তো মেহু? আমি জলঙ্গীর সেই পোড়ো ঘাটে তোর জন্য আমার শেষ রঙটা সাজিয়ে রেখেছি।”
মেহু কাগজটা বুকের কাছে চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, ঈশান মরেনি। সে আত্মগোপন করেছে সমাজকে এক চরম ধাঁধায় ফেলে দিতে। সে মেহুকে এক ‘মানসিক খেলায়’ আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
নিচতলার বারান্দায় জোহরা বিবি আর কুলসুম বেগম আবার উঁকিঝুঁকি মারছিলেন। মেহুকে এভাবে পাগলের মতো উঠোনে নামতে দেখে জোহরা বেগম মুখ টিপে হাসলেন।
—“দেখলে কুলসুম? মেয়ের দশা দেখেছো? রক্তমাখা কাগজ বুকে জড়িয়ে নাচছে! মাজেদুল সাহেবের বংশের মুখে চুনকালি মাখাতে আর বাকি নেই কিছু।”
মেহু তাঁদের দিকে একবার তাকাল। সেই চাহনি এতই তীক্ষ্ণ আর হিমশীতল ছিল যে মহিলারা থতমত খেয়ে পিছিয়ে গেলেন। মেহু আর সেই শান্ত মেহু নেই। সে এখন এক ‘অনিবার্য’ আকর্ষণে আচ্ছন্ন এক মানবী।
সে কাকার দিকে ফিরে বলল,
—“কাকা, বাবাকে বলো পাখি খাঁচা ছেড়েছে। আর কখনো ফিরবে না।”
কাকা অস্ফুট স্বরে ডাকলেন,
—“মেহু! কোথায় যাচ্ছিস তুই? বাইরে পুলিশ ঘুরছে, তোর বাবা ফিরলে অনর্থ হবে!”
মেহু আর পিছন ফিরে তাকাল না। সে দ্রুত পায়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। কৃষ্ণনগরের পরিচিত গলিগুলো আজ তার কাছে গোলকধাঁধার মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু তার নাকে আসছে এক অদ্ভুত গন্ধ রক্ত, কাদা আর জলঙ্গীর পলিমাটির এক মিশ্র ঘ্রাণ। ঈশান তাকে ডাকছে। সে জানে, শহরের শেষ প্রান্তে যেখানে পোড়ো ঘাটটা শ্যাওলায় ঢাকা, যেখানে মানুষ ভয়ে যায় না, সেখানেই ঈশান তার ‘অনিবাৰ্য’ সত্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে।
সে হাঁটছে। তার সাদা কামিজের ওপর বৃষ্টির দাগ আর পায়ে কাদা। মানুষের বাঁকা চাহনি, ফিসফাস সবই তার কাছে অর্থহীন। সে এখন এক নেশায় চুর হয়ে আছে। যে নেশা ঈশান তার রক্তে কাল রাতে ঢেলে দিয়ে গেছে। মেহু বুঝতে পারছে, সে যত এগোচ্ছে, তার ভেতরের ‘দ্বিধা-দ্বন্দ্ব’ তত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সে এখন শুধু মেহু ন
য়, সে ঈশানের সেই অসম্পূর্ণ ছবির শেষ ‘রঙ’।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।