শৈশবের শবেবরাত
— রফিক আতা —
শৈশবের শবেবরাতের কথা মনে হলেই স্মৃতির খেরোখাতার পাতাগুলো ছলছল করে ওঠে—ঠিক যেন পানির কলকল শব্দে ভিজে যাওয়া কোনো বিকেল। মাগরিবের আজান পড়তেই আমাদের ছোটদের মনে বয়ে যেত এক অন্যরকম আনন্দের জোয়ার। মনে হতো, এ রাতটা যেন শুধু আমাদেরই।
গোসল ছিল শবেবরাতের প্রথম পর্ব। আমরা বিশ্বাস করতাম—গোসলের প্রতি ফোঁটা পানিতে নেকি, গুনাহ মাফ, এমনকি ৭০ কিংবা ৭০০ রাকাত নফল নামাজের সওয়াবও আছে! (যা তখনকার সমাজে প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল)। আমি তো রীতিমতো মাথার পানি মুছতামই না—ভাবতাম, প্রতিটি ফোঁটাই তো নেকির বাহক!
গোসল শেষে আব্বু কিংবা বড় ভাইয়ের হাত ধরে ছুটতাম মসজিদের পথে। সেদিন মসজিদে মুসল্লিদের ঢল নামত। অগণিত মানুষের উপস্থিতিতে মসজিদের মেঝে যেন প্রাণ ফিরে পেত। আমরা ছোটরা এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করতাম, আর সমাজের কিছু মুরব্বি চোখ রাঙিয়ে আমাদের শাসনে আনতেন।
ইশার নামাজ শেষে ইমাম সাহেব শুরু করতেন বয়ান। জান্নাত, জাহান্নাম, তওবা আর গুনাহ থেকে ফিরে আসার কথা শুনে উপস্থিত মুসল্লিদের হৃদয়ে জেগে উঠত প্রভুর প্রেম আর ভয়। তারপর দীর্ঘ সময় ধরে চলত হালকায়ে জিকির। সবাই ধ্যানমগ্ন হয়ে রবের জিকিরে মশগুল থাকতেন, আর আমরাও শিশু কণ্ঠে সুর মিলাতাম।
জিকির শেষে মিলাদ—
“ইয়া নবী সালামু…”
এরপর সবাই হাত তুলতেন রবের দরবারে। বলা হতো—এ রাত গুনাহ মাফের রাত। তাই কান্না আর আকুতিতে মসজিদ প্রাঙ্গণ থরথর করে উঠত। আমরাও অবুঝ চোখের অবুঝ পানি রবের কদমে সমর্পণ করতাম।
মুনাজাত শেষে বিতরণ হতো জিলাপি আর সমুচা। সত্যি বলতে কী, শবেবরাতে মসজিদে যাওয়ার এক বড় কেন্দ্রবিন্দুই ছিল এই জিলাপি! জিলাপি হাতে পেয়ে খুশিতে বুক ভরে যেত। কেউ কেউ তখন বাড়ি ফিরতেন, আবার কেউ মসজিদেই থেকে যেতেন ইবাদতে। আমরা বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়তাম।
কিন্তু ঘুমের মাঝেও চোখে পড়ত—আম্মু ঘরের এক কোণে বসে অনেক রাত পর্যন্ত নফল নামাজ পড়ছেন, কান্নায় ভিজছে তাঁর দোয়াগুলো। ভোরে সাহরির জন্য উঠতাম, তারপর রোজা রাখার চেষ্টা। কিন্তু সে রোজা পূর্ণ হতো কই! ক্ষুধার কাছে হার মানতাম আমরা ছোটরা।
দিনভর আম্মু তেলাওয়াত করতেন, আর আমরা দাদির সঙ্গে বসে তাসবিহ পড়তাম। ক্লান্তি যেন আমাদের ছুঁতেই পারত না। এইভাবেই এক অনন্য আমেজে কেটে যেত শবেবরাত—আমাদের শৈশবের কোমল, স্নিগ্ধ শবেবরাত।
আজ বহু বছর পেরিয়ে গেছে। শবেবরাতে আর শৈশবের বন্ধুদের নিয়ে পুকুরে নেমে আনন্দ উল্লাসে গোসল করা হয় না। হোক না সে গোসল সওয়াবহীন, তাৎপর্যহীন—তবু স্মৃতির রোমন্থন তো হতো! আজও মসজিদে শবেবরাতে জিলাপি বিতরণ হয়, কিন্তু সেই শৈশবের উৎসবমুখর মখমল অনুভূতিটা কোথাও আর পাওয়া যায় না।
জীবনের রকমারি ব্যস্ততার ভিড়ে রাতজেগে মায়ের ইবাদত, সালাত আর দিনভর তেলাওয়াত শোনা হয় না। আর সেই বুড়ি দাদি—যাঁর সঙ্গে সারাদিন তাসবিহ পড়ে কেটে যেত সময়—তিনি এখন পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন রাস্তার পাশের কলাবাগানের মাটির ঘরে।
শৈশবের শবেবরাত তাই আজ শুধুই স্মৃতি—মধুর, ম্লান, তবু অমূল্য।
দিনলিপি
তিন, দুই, ছাব্বিশ
মঙ্গলবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।