বিকেলরা ফুরিয়ে যায় সন্ধ্যার ধ্বনিতে
—রফিক আতা—
আজকের গোধূলি মনের দেওয়ালে চির অঙ্কিত হয়ে থাকবে। আমরা কয়েকজন বের হয়েছিলাম অপরাহ্নে গ্রাম ভ্রমণে। হেমন্তের বিকেলটা তখন ঠিক যেন এক খণ্ড অলসতার মধ্যে আটকে থাকা—সবকিছু ধীর, শান্ত, স্থির। ক্ষীণ কুয়াশার সাদা অনুকণা ধীরে ধীরে ঢেকে নিচ্ছে সমগ্র গ্রামকে, মাঠ, পথ, বাড়িঘর—সবকিছু মিশে যাচ্ছে এক ধোঁয়াটে নিস্তব্ধতায়।
এই সময় দাঁড়িয়ে মনে হলো—সময় যেন অবাধ্য কোনো স্রোত, যা কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করে না। হেমন্তের এই শান্ত, নীরব দৃষ্টি প্রতিমুহূর্তে গিলে নেয় ঝরে পড়া আলো, আর পৃথিবী ঢেকে যায় সন্ধ্যার সিক্ত আড়ালে। নিশির সমাগমে মনে হলো—এখানে কখনো যেন পূর্ণ দিন ছিলই না।
গ্রামের সরু পথ ধরে আমরা হাঁটতে থাকি। সারি সারি লাল ইট বুকে নিয়ে সলিং রাস্তা বাঁকা হয়ে চলে গেছে পশ্চিমে, ভুলুয়া নদীর দিকে। পথের শুরুতে ঘন বৃক্ষের ছায়া—সবুজের চাপা গাঢ়ত্ব। তারপর ধীরে ধীরে ফাঁকা জমি খুলে যায়—অবারিত ধানক্ষেতের বিস্তার। ঠিক সেই মুহূর্তে সামনেই এসে পড়ে এক নারী। আমাদের দেখেই সে আতকাতে আতকাতে আঁচল ঠিক করে নেয়, তারপর তড়িঘড়ি সরে দাঁড়ায় টিনের বেড়ার আড়ালে।
দৃশ্যটি খুব সাধারণ, তবুও এ আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিচিত্র। গ্রামবাংলার বউঝিদের সরলতা, সততা, পর্দাপ্রিয়তা—এগুলো এখনও এসব গ্রামে দেখা যায়। এখানকার মানুষজন ধর্মানুরাগী, লজ্জাশীল; শহুরে সভ্যতার ভিড়ে এমন দৃশ্য এখন প্রায় বিলীন।
পথ এগিয়ে যায়—আর আমাদের কথার গোলকধাঁধাও এগিয়ে চলে। ভুলুয়া নদী তখন আর দূরে নয়। এমন সময় দেখি আরেকটি দৃশ্য—যা সাথে সাথেই আমাদের টেনে নিল শৈশবের অংকুরে। রাস্তার কিনারে একটি বাড়ি। দরজার সামনে দুইটি ছোট্ট ছেলে। আর তাদের স্বপ্নবীজ রোপণ করা একটি ছোট্ট দোকান— মধুবন,চিট, চকলেট, আচার, লজেন্স—স্বপ্নের দোকান সাজানো শৈশবের রঙিন স্মারক দিয়ে।
আমরা কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানে। বলয়ের মতো মনে জড়িয়ে গেলো নিজেদের শিশুকাল। আমরা কিছু খরিদ করলাম—আর লক্ষ্য করলাম ওদের ছোট মুখে আনন্দের আলো ছড়িয়ে গেলো। সেই হাসিতে লুকিয়ে ছিল ছোট স্বপ্নের সাফল্য, ছোট দোকানের সম্মান, আর বড় হতে চাওয়ার সহজ আকাঙ্ক্ষা।
তারপর এগিয়ে গিয়ে পৌঁছালাম ভুলুয়ার তীরে। শীতের আগ্রাসনে হেমন্ত তখন ব্যতিব্যস্ত—নদীতে জোয়ার নেই, তবে হাঁটু জল আছে। উপরে বাঁধানো বাসের সাঁকু। সাঁকু পার হলেই বিশাল বিল। সেখানে ধানক্ষেত—দুলছে মৃদু সমীরণে। শিশির ভেজা আধপাকা ধানের সুগন্ধে পূর্ণ প্রকৃতি। বিল পেরোলে বিস্তৃত কলোনি; ঘরগুলোতে একে একে জ্বলতে থাকে আলোর কণা। আর এভাবেই—
বিকেলরা ফুরিয়ে যায় সন্ধ্যার ধ্বনিতে।
আর আমরা ফিরি মাগরিবে।
এই গ্রাম যেন রবীন্দ্রনাথের সেই অমর কবিতার চরণে জেগে ওঠে—
“আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে…”
আজকের বিকেলের হাঁটু জল, ধানক্ষেতের বাতাস, গ্রামীণ বিনয়ী মানুষের দৃশ্য—সবকিছু যেন ঠিক সেই নদীর ধার থেকে উঠে এসে দাঁড়ায় হেমন্তের নিস্তব্ধ জ্যোৎস্নায়। সময় পাল্টায়, দৃশ্য বদলায়, তবে গ্রামের সেই চিরন্তন আবহ—নদীর মতোই এখনও বইতে থাকে বাঁকে বাঁকে।
দিনলিপি
পঁচিশ, এগারো, পঁচিশ
মঙ্গলবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।