বৃষ্টিস্নাত শরতের রাত
—রফিক আতা—
শুক্রবারের ধূসর অপরাহ্ন। দিনশেষের আকাশ। একটু বাদেই নামবে রাত্রি। আমি নীরবে তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে। নিশির আগমনে যেমন প্রকৃতি আঁধারে সিক্ত হয়, তেমনি কয়েক খণ্ড কালো মেঘের আগমনে পৃথিবীও হয়ে উঠেছে নিকষে ঋদ্ধ। দূরের দিগন্তে সন্ধ্যাতারা মৃদু আলোয় কাঁপছে, বাতাসে কাশফুলের গন্ধ মিশে আছে। মাগরিবের সালাত শেষে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম।
ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই আমাকে স্পর্শ করল হিমেল বাতাস—যার গায়ে বৃষ্টির ঘ্রাণ লেগে আছে গভীর মায়ায়। দূরের আকাশে একটি নিঃসঙ্গ চাঁদ ধীরে ধীরে লুকিয়ে গেলো মেঘের আড়ালে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাসের শব্দে পাতার ঝিরঝির নৃত্য শুরু হলো, যেন শরতের বুকে বৃষ্টি নামার আগমনী সঙ্গীত।
কামরায় ফিরতে না ফিরতেই, প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। জানালার কাচে আছড়ে পড়া ফোঁটাগুলো বাজাচ্ছে এক অদ্ভুত সংগীত—নিঃশব্দ রাতের বুকে বৃষ্টির ছন্দ যেন কোনো অজানা তবলার তান। শরৎ ও হেমন্তের সন্ধিক্ষণে এমন অপ্রত্যাশিত বর্ষণ— যেন কালক্ষেপণের কবিতা।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা ধীরে ধীরে টুপটাপ করে গাছের পাতায় নেমে আসে, নরম মাটির গন্ধে ভরে যায় চারদিক। ভেজা কাশবনের দোলায় হালকা আলো ঝিলিক দিয়ে ওঠে, মনে হয় যেন আকাশও এই রাতে প্রেমে পড়েছে। ঠিক এমন এক মুহূর্তে বর্ষার স্মরণ আমাকে ব্যাকুল করে তুলল। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম অসময়ের বৃষ্টিস্নিগ্ধ ক্যাম্পাসের দিকে। শত মাইল দূর হতে আগত বৃষ্টির দল যেমন আছড়ে পড়ছিল প্রকৃতির বুকে, তেমনি আমিও যেন আছড়ে পড়ছিলাম আমার নিজস্ব অতীতের ভেতর।
স্মৃতির দুয়ারে হানা দেয় বিস্মৃতি। সেইসব বিস্মৃতির কোণঠাসা দেওয়াল টপকে, আমি খুঁজে ফিরি ঝাপসা, আবছা, বৃষ্টিমুখর শৈশবের লিপি।
কখনো দেখি—
একটি ছোট্ট বালক বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। ভেজা জামায় ঘরে ফিরছে। মায়ের বকাবকির সামনে অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে—ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে আছে। বৃষ্টি আর কান্না মিশে গেছে একসাথে।
আবার দেখি—
ছোট্ট রফিক কাঁথা গায়ে শুয়ে আছে কোনকালের ভাঙা একটি চৌকিতে। বাদল দিনের ভেজা ভেজা গল্প। টিনের চালের টুপটাপ শব্দে একপ্রকার ঘুমের আহ্বান। বাইরের অন্ধকারে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে—তারপর সব শান্ত। শিশুমনের নিঃশব্দে মিশে থাকা এক আশ্চর্য প্রশান্তি।
আরেকদিনের কথা—
বেলা প্রায় বারোটা। আমি তখন ক্লাস টু-য়ের ছাত্র। বারোটা বাজতেই ইশকুল ছুটি। কিন্তু ছুটির খানিক আগেই শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। বাড়ি ফিরতেই হবে। শার্ট খুলে বইয়ে জড়ালাম, কখনো পলিথিনে ভরালাম, আর বুকে চেপে পিছন না ফিরে, ভোঁ দৌড় দিলাম বৃষ্টিভেজা রাস্তায়। কাদা ছিটকে লাগছে হাঁটুতে, তবু মন ভরে আছে আনন্দে। মনে হচ্ছিল—এই বৃষ্টিই যেন আমার প্রথম বন্ধু।
আজ, এইসব স্মৃতির শুকনো বিশীর্ণ ঝরাপাতা উল্টালে হৃদয়টা ব্যথায় হাহাকার করে ওঠে। চোখের পানি ও বৃষ্টির পানি যেন মিশে যায় একসাথে—ভিজিয়ে দেয় স্মৃতির সেই শুকনো পাতা। বাতাসে আজও ভেসে আসে শৈশবের সেই মাটির গন্ধ—যেন সময় থেমে গেছে ঠিক সেই বিকেলে।
অন্যূন বিশ মিনিট পর—
বৃষ্টি থেমেছে। পৃথিবীটা এখন ভীষণ হিমে শীতল। বৃক্ষের পাতায় পাতায় বৃষ্টির চিহ্ন ঝুলে আছে, ঝোপে ঝোপে জোনাকি জ্বলে উঠেছে। এখানে-ওখানে ছোট ছোট খাদে জমে আছে পানি। নিস্তব্ধতায় শুনি, দূরে কোথাও ব্যাঙের সুরে রাত জেগে ওঠে। ভাবলাম—অকালে, অসময়ে আসা এই একফালি বৃষ্টি-বিলাসই যেন আমাকে তন্ময় ও বিভোর করে তুলল! স্মৃতির ভাটা পড়া দরিয়ায় এনে দিলো হঠাৎ জোয়ারের ঢেউ।
বিশ্বাস করতে মন চায় না—
শরতের বুকে বাদল হাওয়ার এই অগোছালো একখণ্ড অনুভূতি আজও ডায়েরির কাছে নিজেকে সঁপে দেয়।
এই কিছুদিন আগেও, ডায়েরির কোনো এক পাতায় লিখেছিলাম—
“শরতের বুকে বৃষ্টি!”
তখন মনে হয়েছিল, এ যেন ঋতুরই নিয়ম লঙ্ঘন, বৃষ্টির জন্য এক বড় গোস্তাখি।
ডায়েরির পাতায় সেদিন আমি অসময়ে আসা বৃষ্টির বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলাম নীরব প্রতিবাদ।
কিন্তু আশ্চর্য—
আজ সেই আমিই বৃষ্টির প্রেমে ভীষণভাবে ঋদ্ধ!
জানি না, এটি কি কেবল সময়ের দর্শন, নাকি মনখারাপেরই কোনো নীরব নিদর্শন!
শরতের বৃষ্টি, কাশফুলের দোলা, চাঁদের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া রাত—সব মিলেমিশে আজ আমার ভেতর এক অনন্ত একাকীতার সুর বাজিয়ে চলে।
বৃষ্টিলিপি
দশ, দশ, পঁচিশ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।