যোহরের নামাযের সমাপ্তি। চারদিকের পরিবেশ তখনও নামাজের রেশ টেনে নেয়া গভীর নিরবতায় ডুবে আছে। কার্নিশের নিচে কাচের ওপারে মিহি ধোঁয়ার মতো আলো পড়ে মসজিদের ভিতরটা যেন আরও শান্ত লাগছিল। আমি সুন্নাতের নিয়তে জায়নামাযে দাঁড়াতে যাচ্ছিলাম—ঠিক তখনই মাইকে স্পষ্ট একটি ঘোষণা ভেসে এলো—
“বাকি নামায শেষে জামেয়ার সকল সাথী ভাইদের কে বসার জন্য বলা হচ্ছে।”
শব্দটি কানে যেতেই বুকের ভেতর হালকা কাঁপন লাগলো। আজ তো বৃহস্পতি—এই দিনে এমনিতেই তো বসতে হয়;কিন্তু আজকের ঘোষণার টোনে যেন একটু আলাদা জোর ছিল। এমনকি আশপাশে তাকিয়ে দেখি—কয়েকজন সাথীর চোখেও আমার মতোই এক ধরনের অদ্ভুত প্রশ্ন জ্বলজ্বল করে উঠেছে।
সুন্নাত পড়া শেষ করেই সামনে গিয়ে বসলাম। দেখি মেহরাবের সামনের লম্বা খোলা জায়গায় দ্রুত চেয়ার সাজানো হচ্ছে। চেয়ারের পায়ের শব্দ মসজিদের কার্পেটে দমবন্ধ নীরব শব্দ তুলছিল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই নায়েব সাহেব হুজুর দা.বা., ফেনীর হুজুর দা.বা., এবং দারুল একামার সম্মানিত উস্তাদগণ মসজিদে প্রবেশ করলেন। তাদের প্রবেশের সাথে সাথে জামেয়ার বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে গেল।
মেহরাবের দিকে তাকিয়ে দেখি—সামনের কাতারে কয়েকজন সাথীকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের কারও মাথা নিচু, কেউ আবার স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে। মলিন মলিন মুখগুলোতে ক্লান্তি, লজ্জা, দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আবহ।
আর কিছুক্ষণ পরই সুস্পষ্ট হয়ে গেল— আজ يوم التنبيه অর্থাৎ সতর্কতা, তানবীহ, বিচার ও দীক্ষার দিন।
জামেয়ার ইতিহাসে এই দিনই মাদ্রাসার স্বকীয় চরিত্র। প্রথম যুগ থেকেই রশীদিয়ায় এই পদ্ধতি চলে আসছে—যদি কোনো সাথী নীতি, শারঈ আদেশ, বা প্রতিষ্ঠানের নেযাম লঙ্ঘন করে, তাকে মসজিদে দাঁড় করিয়ে সকলের সামনে সংশোধন করা হয়। যেন সে নিজে শিক্ষা পায়, আর বাকিরা চোখে দেখে সাবধান হয়ে যায়।
পূর্বরাতে পুরো মাদ্রাসায় তল্লাশি হয়েছিল—ডেক্সের ভিতরে, কাপড়ের ভাঁজে, বইয়ের পাতায়, কাঁথার রোলের ভেতর—কিছুই বাদ যায়নি। রাতভর করিডোরে টর্চের আলো, উস্তাদদের কড়া নজর, আর সাথীদের অস্থির নিঃশ্বাস—সবই যেন এক ভয়াল দৃশ্যের অবতার হয়ে এসেছিল গতরাতে।
যাদের কাছে মোবাইল ফোন, ইয়ারফোন, বা নেযাম-বিরোধী কোনো জিনিস পাওয়া গেছে—আজ তাদের বিচার। এবং সেই বিচার খুবই কঠোর ও প্রকাশ্য।
একসময় তালিকা পাঠ করা হলো। প্রথমে সাত
জন সাথীর নাম ঘোষণা হলো। প্রত্যেকেই সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তাদের মুখ-মণ্ডলে লজ্জা, ভয়, অনুশোচনা—সবকিছু রহস্যময়ভাবে মিলেমিশে আছে। এরপর নায়েব সাহেব ঘোষণা করলেন—
“তাদের অপরাধ প্রমাণিত। সিদ্ধান্ত—বহিষ্কার।”
এই শব্দটা পুরো মসজিদে যেন ঢেউ তুললো।
কারো নিশ্বাস ভারী হলো, কারো চোখে পানি এসে গেল। আর যাদের অপরাধ তুলনামূলক কম—তাদেরকে সামনে দাঁড় করিয়ে শাস্তি প্রদান করা হলো।
শাস্তি ঘোষণার আগে নায়েব সাহেব অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বললেন— “দোষের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো কেউ যদি চায়—শাস্তির পরিবর্তে বহিষ্কার গ্রহণ করবে—তবে তার ওপর শাস্তি আর প্রয়োগ হবে না।”
মুহূর্তে সারা মসজিদ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ নড়ল না। কেউ কিছু বলল না। সবাই শাস্তি গ্রহণ করল।
হয়তো তারা জানে— শাস্তি সাময়িক, কিন্তু বহিষ্কার আজীবনের বিচ্ছিন্নতা, পাঠের পাতা থেকে শুরু করে জীবনের পরবর্তী প্রতিটি পাতায় সেটা কালির মতো লেগে থাকে।
এরপর মাইকে দাঁড়িয়ে ফেনীর হুজুর দা.বা. বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেন— “যে প্রতিষ্ঠানে হুদুদ নেই—সেই প্রতিষ্ঠানের নেযাম একদিন না একদিন দরহাম বরহাম হয়ে যাবে, ভেঙ্গে পড়বে। নিয়মের প্রতি উদাসীনতা শুরু হলে—প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই শঙ্কায় পড়ে।”
তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, অথচ বুকে অনুভূতির উষ্ণতা লুকানো। তিনি একটু থামলেন, তারপর স্মৃতির খাতায় হাত বুলিয়ে বললেন—
“আগে যখন يوم التنبيه শুরু হতো—দোয়া, তাওবা, এবং আত্মসমালোচনার কান্নায় পুরো মসজিদ ভেসে যেত। অথচ আজ…”
তিনি আর বাক্য শেষ করলেন না। থামাটাই অনেক কথা বলে দিল। বুঝিয়ে দিলেন—আমরা হয়তো কোথাও দায়িত্ব, মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক শক্তি হারাতে বসেছি।
শেষে তিনি বললেন—
“এই নেযাম কোনো বোঝা নয়—বরং নিয়ামত। যে প্রতিষ্ঠানে নিয়ম শিথিল হয়—সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের চরিত্রও ধসে পড়ে।”
হুজুরের চোখ-মুখের দৃঢ়তা, উচ্চারণের কাঁপুনি, এবং অন্তরের কোমলতা—সব মিলিয়ে সেই মুহূর্তটি আমার হৃদয়ে যেন অদ্ভুত এক আলোড়ন এনে দিল।
এই তানবীহ, এই বিচার—কেউ ভাবে শাসন, কিন্তু আসলে এটিই জামেয়া রশীদিয়া র তরবিয়ত তথা দীক্ষার হাতেখড়ি। চরিত্রের ছাপ রাখার মেহেদী, যার রঙ সময়ের সাথে গাঢ় হয়।
_____________________________________________
: দিনলিপি
(বর্ধিত পরিমার্জিত ও সম্পাদিত সংস্করণ)
দুই–এগারো–তেইশ ইং
বৃহস্পতিবার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।