অগ্রহায়ণ তুমি এসোনা: স্মৃতিগদ্য
—রফিক আতা—
দেখতে দেখতেই ডিসেম্বরের রঙবদল ছুঁয়ে দিচ্ছে অগ্রহায়ণ কে। অগ্রহায়ণ এলে মনে পড়ে যায় বুড়ো দাদির কথা। কনকনে শীত জমা ভোর উন্মোচিত হতেই "রশিঘরে" আগুন জ্বলে উঠতো। কী যেন একটা পিঠা বানাতেন—আজকের দিনে নামটা আর মনে নেই। গোল গোল। সম্ভবত গ্রামের ভাষায় “ছাইন্না হিডা” বলে।আমরা চুলার পাশ ঘিরে বসে থাকতাম। দাদি বলতেন— "সরে ব নইলে পুড়ে যাবি"। আমাদের দৃষ্টি কেবল চুলার দিকে। শুকনো কাঠের অগ্নিদগ্ধ চুলা থেকে পিঠা নামানোর পর গরম পিঠায় হাত রাখা যেত না।
আমরা ছোটরা সেখানে বড় কৌশলের পরিচয় দিতাম। পরিষ্কার দেখে একটি শলা নিতাম, তারপর একটা একটা করে পিঠাগুলো শলায় গেঁথে নিতাম। ফু দিয়ে দিয়ে ঠান্ডা করার প্রয়াস চলতো খানিকক্ষণ। মনে হতো যেন অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে স্বাদের রাজ্যে প্রবেশ করছি। ধীরে ধীরে পিঠা ঠান্ডা হয়ে যেত। মুখে ফুরতে ফুরতে শূন্যে চলে আসতো; আর আমাদের চেহারায় ফুটে উঠত ক্ষুদে বিজয়ের হাসি।
এখনও অগ্রহায়ণ আসে ঠিকই। কিন্তু স্বযত্নে পিঠা বানানোর সেই বুড়ো দাদিটাকে আর দেখি না। কোন ফাঁকে, অযত্নে-অবহেলায় আমাদের ছেড়ে দিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন কবরনগরে। শুধু মাটির ঢিবি আর শিশিরস্নাত ঘাসফুল তার ঠিকানা। আজ আর স্মৃতির শীতল বাতাসে পিঠার গন্ধ নেই, নেই শলায় গাঁথা শৈশবের চঞ্চল হাসি।
অগ্রহায়ণ, তুমি এসো না। এসো না এই গ্রামীণ জনপদে—
যেখানে বুড়ো দাদি নেই,
যেখানে পিঠাপুলি আর শলায় গাঁথা শৈশব নেই…
সেখানে অগ্রহায়ণ, তুমি এসো না।
যেখানে স্মৃতি আছে, বাস্তব নেই…
যেখানে উপচে পড়া স্বাদ আছে, কিন্তু স্বাদের জননী নেই…
সেখানে অগ্রহায়ণ, তুমি এসো না আর।
কারণ তোমার আগমনেই হারিয়ে যাওয়া মুখ আর সময়গুলোর স্মৃতি আরো প্রখর হয়ে ওঠে, বুকের ভেতর শীত আরো গভীর হয়ে জমে—আর আমরা অক্ষম হয়ে যাই কান্নার তাপ দিয়ে সেই শীত গলাতে।!!
স্মৃতিলিপি
দশ, বারো, পঁচিশ ইং
বুধবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।