হরেক রকম বুলি আওড়াতে আওড়াতে একটি সিএনজি হুস করে চলে যেত বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে। আমরা কয়েকজন খালি পায়ে ছুটতাম তার পিছু পিছু। সিএনজি থেকে উড়ে আসত রঙচঙা পোস্টার। বাতাসে উড়তে উড়তে সেগুলো এসে পড়ত আমাদের হাতের মুঠোয়।
সেই পোস্টার জমাতে জমাতে একসময় বেশ অনেকগুলো হয়ে যেত। তারপর বিকেলের রোদ নরম হলে, উঠানের এক কোণে আমরা বানাতাম ছোট্ট একটা ঘর—কাগজের ঘর। দেয়াল পোস্টারের, ছাদও পোস্টারের। সেটাই ছিল আমাদের খেলাঘর, আমাদের স্বপ্নের সংসার।
রাজনীতি তখন বুঝতাম না, প্রতীক বুঝতাম না—শুধু রঙ চিনতাম, আর কাগজের গন্ধে খুঁজে পেতাম আনন্দ।
শৈশবের সেই ভোটস্মৃতি যতই রঙিন হোক, তনুমনে কোথাও যেন এক অদৃশ্য আতংকও বাসা বেঁধেছিল। শেষ দুই নির্বাচনের স্মৃতি আজও অগোছালোভাবে লিপিবদ্ধ আছে মনের খাতায়। বড়দের কথাবার্তা, চাপা স্বর, দরজা বন্ধ করে আলোচনা—সব মিলিয়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর সময়।
মনে পড়ে, ভোটের আগের দিন সেনাবাহিনী এসে কেন্দ্র পরিদর্শন করে যেত। বিকেলের দিকে পুলিশ, আনসার—অনেকেই আসত। রাস্তায় হঠাৎ হঠাৎ কড়া জুতোর শব্দ শোনা যেত। আমার ছোট্ট মনে তখন প্রশ্নের ভিড়—কেন এত লোক? কেন এত টানটান ভাব?
বড়দের মুখে শুনতাম নানা অভিযোগ, নানা ভয়। কেউ কারও নাম উচ্চারণ করত ফিসফিসিয়ে। তখন বুঝতাম না রাজনীতি কী, কিন্তু ভয়টা ঠিকই বুঝতাম। সেই সময় থেকেই ইউনিফর্ম দেখলে কেমন যেন একটা অচেনা শঙ্কা কাজ করত মনে।
মনে পড়ে, আমার কাছে একটা খেলনা পিস্তল ছিল। প্লাস্টিকের, রঙিন। ভোটের দিন রাস্তা দিয়ে পুলিশ বাহিনী যাচ্ছিল। আমি দূর থেকে খেলনা পিস্তল তাক করে “ঠাস!” করে শব্দ করলাম। মনে হয়েছিল—আমি বুঝি খুব বড় কোনো কাজ করে ফেলেছি!
কিন্তু হায়, আমার প্লাস্টিকের গুলি তো কারও গায়ে লাগে না—লাগে শুধু শৈশবের কল্পনায়। আজ ভাবি, সেটাও ছিল এক ধরনের শিশুসুলভ প্রতিবাদ; না-বোঝা বয়সের সরল দম্ভ।
ভোটের দিন চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা থাকত। দোকানপাট আধা খোলা, মানুষজন চাপা স্বরে কথা বলছে। খানিক পরপর সেনাবাহিনী এসে কেন্দ্র দেখে যেত। কখনো দেখতাম কাউকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, কোথাও ছোটখাটো ধাক্কাধাক্কি। এসব দৃশ্য শিশুমনে গেঁথে যেত গভীর দাগ হয়ে।
তবু বিকেল নামলে আমরা আবার কাগজের ঘরে ফিরতাম। পোস্টারের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম—এই কাগজের ঘরটাই যেন আমাদের সত্যিকারের দেশ। যেখানে ভয় নেই, কড়া জুতোর শব্দ নেই; আছে শুধু রঙিন কাগজ আর অবুঝ হাসি।
আজ বড় হয়ে বুঝি—সেই পোস্টারগুলো ছিল ক্ষমতার ভাষা, আর আমাদের কাগজের ঘর ছিল স্বপ্নের ভাষা।
ভোট তখন ছিল আতংকের ছায়া, আর শৈশব ছিল তার মাঝেও রঙ খুঁজে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। কিন্তু কাগজের সেই ছোট্ট ঘরটি আজও ভাঙেনি—সে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতির উঠানে, রঙচঙা পোস্টারের দেয়াল নিয়ে, শৈশবের এক নিরীহ অথচ দৃঢ় সাক্ষী হয়ে।
রাত পোহালেই নির্বাচন। সবদিকে ঈদ ঈদ রব। এত্তো বচ্ছর পর মানুষ ছুটছে নির্বাচনের উদ্দেশ্যে—কারও চোখে প্রত্যাশা, কারও মুখে সংশয়, তবু সবার ভেতরেই যেন এক অদ্ভুত আলোড়ন।
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি—সময় কত বদলে দিয়েছে দৃশ্যপট, অথচ কিছু অনুভূতি একই রয়ে গেছে। রঙিন পোস্টার আজও উড়ে বেড়ায়, স্লোগান আজও ভেসে আসে বাতাসে; শুধু আমি আর সেই খালি পায়ের শিশুটি আর এক নই। এখন প্রতীক বুঝি, রাজনীতির ভাষা বুঝি, ক্ষমতার কৌশলও কিছুটা বুঝি। তবু কোথাও যেন সেই কাগজের ঘরটাকে খুঁজে ফিরি—যেখানে ভোট মানে ছিল রঙিন কাগজ, আর দেশ মানে ছিল খেলাঘর।
আজ বুঝি, নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়—এটা মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার উৎসবও। ভয় আর সংশয়ের মাঝেও মানুষ লাইনে দাঁড়ায়, আঙুলে কালি লাগায়, নিজের ছোট্ট অধিকারটুকু প্রতিষ্ঠা করতে চায়। হয়তো এটাই আমাদের বড় হয়ে ওঠার গল্প—শৈশবের রঙ থেকে বাস্তবের ধূসরতায়, আবার সেই ধূসরতার মাঝেই নতুন রঙ খুঁজে নেওয়া।
স্মৃতির উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা কাগজের ঘরটি আজও আমাকে শেখায়—ভয় যতই থাক, স্বপ্নের জায়গা কখনও ফাঁকা রাখা যায় না। কারণ দেশের গল্প শুধু ক্ষমতার নয়, মানুষেরও; শুধু কড়া জুতোর শব্দের নয়, খালি পায়ের ছুটে চলারও।
হয়তো কাল সকালেও কোথাও কোনো শিশু উড়ে আসা পোস্টার কুড়িয়ে নিয়ে বানাবে তার ছোট্ট কাগজের ঘর। আর সেই ঘরেই জন্ম নেবে এক নতুন দেশের স্বপ্ন—ভয়হীন, স্বচ্ছ, মানুষের জন্য।
শৈশবের ভোটস্মৃতি তাই কেবল আতঙ্কের নয়; তা এক আশাবাদের বীজ, যা জুলাইয়ের রক্তে চাপা পড়ে কাল হয়তো মাথা তুলে দাঁড়াবে।
দিনলিপি
এগারো, দুই, ছাব্বিশ ইং
বুধবার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।