নিশ্ছিদ্র স্মৃতির নিঃশব্দ নীরব দূরত্ব
রফিক আতা
জীবনে কতজনকে হারালাম—এই হিসাব আর মেলাতে বসি না এখন। তবু হঠাৎ হঠাৎ বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন খাতা খুলে বসে, পাতার পর পাতা উল্টাতে থাকে। কত মানুষের সঙ্গে একসময় গভীর, উষ্ণ, নির্ভরযোগ্য সম্পর্ক ছিল। হাসি ছিল, ঝগড়া ছিল, অভিমান ছিল—সব মিলিয়ে ছিল প্রাণের চলাচল। আজ তাদের কারো সঙ্গে দেখা হয় না, কথা হয় না, যোগাযোগ নেই। সময় নামের ব্যস্ততা সবাইকে যে যার মতো করে টেনে নিয়েছে। কেউ সংসারের ঘেরাটোপে, কেউ দায়িত্বের ভারে, কেউ সাফল্যের দৌড়ে, কেউ নিছক বেঁচে থাকার ক্লান্তিতে।
জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু—যার থেকে দূরে যাওয়াকে একসময় প্রায় অসম্ভব মনে হতো—সেই প্রাণের বন্ধুর সাথেও কথা হয় না বিগত পাঁচটি বছর। ভাবতেই অবাক লাগে, একসময় যার কাছে না বললে দিন অসম্পূর্ণ লাগত, আজ তার নাম উচ্চারণ করলেও কণ্ঠে একধরনের অচেনা কাঁপুনি আসে। আরও কত কাছের মানুষ ছিল, যারা আমার জীবনের গল্পে একসময় সক্রিয় চরিত্র হয়ে অভিনয় করেছিল। আজ অনেকদিন হলো, তাদের কেউই আর আমার গল্পে নেই। চরিত্রগুলো নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছে, কোনো শেষ দৃশ্য না রেখেই। কী অদ্ভুত রকমের জীবন, তাই না?
এত এত সম্পর্কের বিচ্ছেদ, বন্ধুত্বের ফাটল—এসবকে আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছি। মেনে নেওয়ার অভ্যাসটা হয়তো বয়সের সাথে আসে, নয়তো হারানোর পুনরাবৃত্তি মানুষকে প্রশিক্ষিত করে তোলে। মানিয়ে নিয়েছি—এই শব্দটা শুনতে শান্ত, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে অনেক অপূর্ণ বাক্য, অনেক না বলা অভিযোগ। তবু চলতে হয়। জীবন থামে না কারো অপেক্ষায়।
কিন্তু একটা সম্পর্ক—একটাই—যার নাম মায়া। এই মায়ার সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ নেই, নেই স্পষ্ট বিদায়। যত দূরে যাই, যত নিজেকে ব্যস্ত রাখি, তবু কোথাও যেন নীরব, নিথর এক আকর্ষণ আমাকে তন্ময় করে দেয়। কোনো শব্দ ছাড়াই সে ডাকে। কোনো অভিযোগ ছাড়াই সে বাঁধে। আমি কতবার, কতভাবে তাকে ভুলতে চেয়েছি—কখনো যুক্তি দিয়ে, কখনো সময় দিয়ে, কখনো নিজেকে কঠোর করে। আফসোস! আমি তাকে ভুলতেই পারিনি।
মায়া বড় অদ্ভুত। সে স্মৃতির মতো নয়—যাকে ইচ্ছে করলে ঝেড়ে ফেলা যায়। সে ক্ষতের মতোও নয়—যা সময়ের সাথে শুকিয়ে যায়। মায়া থাকে বাতাসের মতো—দেখা যায় না, ধরা যায় না, অথচ শ্বাস নিলেই তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। দিনের ভিড়ে, রাতের নীরবতায়, হঠাৎ কোনো গান, কোনো গন্ধ, কোনো অসমাপ্ত বাক্য—সবকিছুর ফাঁক দিয়ে সে ফিরে আসে।
আজ বুঝি, মানুষ আসলে সবাইকে হারায় না। কেউ কেউ হারিয়েও থেকে যায়। নাম বদলায়, রূপ বদলায়, সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলায়—কিন্তু অনুভব থেকে যায়। জীবন এগোয়, গল্প বদলায়, চরিত্ররা আসে-যায়; তবু কোথাও একটা অদৃশ্য সুতো টানটান হয়ে লেগে থাকে। সেই সুতোই হয়তো মায়া। আর এই মায়ার সাথেই আমার সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে অমীমাংসিত সম্পর্ক।
দিনলিপি
তেরো, বারো, পঁচিশ ইং
শনিবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।