দ্বিতীয় দরজা (ভৌতিক গল্প)
লেখক: মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণ: ভৌতিক গল্প
তারিখ: ২০ অক্টোবর ২০২৫
ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে পৌঁছালাম সমুদ্রপাড়ের রিসোর্টে।
ঢাকার ব্যস্ত শহর থেকে অনেক দূর—সৈকত বরাবর নিকষ মাটির রাস্তা পাড়ি দিয়ে, শেষমেশ এক ভাঙাচোরা গেটের সামনে দাঁড়ালাম।
সাইনবোর্ডে লেখা, “প্রাইভেট রিসোর্ট – অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ”। তবে বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা—যেমন জানি, আজ রাতের অভিজ্ঞতা সাধারণ হবে না।
রিসোর্টের মূল গেটটি যেন বছরের পর বছর খোলা থাকলেও কেউ সেখানে আসে না। ধুলো জমে থাকা লোহার হ্যান্ডেল, ভাঙা ঢালু সাইনবোর্ড, চারপাশের ঝোপঝাড়—সব মিলিয়ে এমন অভ্যর্থনা, যা সাধারণ মানুষের সাহস নাড়িয়ে দিতে পারে।
গাড়ি থামানোর সঙ্গে সঙ্গে শীতল সমুদ্রের বাতাস গায়ে লাগল। ঢেউয়ের ঢোল দূরে দূরে গর্জন করছে। হাওয়ায় লবণের গন্ধ, ফিসফিস করে বাতাসের শব্দ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা।
আমি ব্যাগ ও লাগেজ নিয়ে ধীরে ধীরে প্রবেশ করলাম।
প্রধান বাংলোর দরজায় লেখা “দ্বিতীয় দরজা”।
নামেই যেন অজানা ভয়ের আবহ। ধাক্কা দিয়ে দরজার হ্যান্ডেল নাড়লাম—লোহা ঠাণ্ডা, ভারী।
দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢোকার মুহূর্তে বাতাসে এক অদ্ভুত শিহরণ। যেন কেউ আমাকে ঘিরে রেখেছে।
ফ্ল্যাশলাইট জ্বালালাম। ঘরের মধ্যে অন্ধকার, কেবল মাটিতে পড়া ধূসর ছায়া, এবং ধুলো দিয়ে ঢাকা ফার্নিচারের আভা।
প্রতিটি ধাপেই ফিসফিস শব্দ, কাদামাটি মাটিতে ধুলোর আওয়াজ—সব মিলিয়ে হৃদয়কে দ্রুত স্পন্দিত করছে।
দূরের জানালার আড়ালে সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে ভেঙে শব্দ করছে—প্রকৃতির আওয়াজ, কিন্তু যেন কোনো প্রাণঘাতী নিঃশ্বাসের মতো।
আমি ধীরে ধীরে দ্বিতীয় দরজার দিকে এগোলাম।
দরজার হ্যান্ডেল হাতে নিলাম। আঙ্গুলের ছোঁয়ায় ঠাণ্ডা লাগল, লোহার মতো ভারী।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, দরজার ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। হৃদয়টা এমনভাবে দৌড়াচ্ছে, যা বহুদিন পর অনুভব করলাম।
এক ধাক্কা দিয়ে দরজা ঠেললাম। ভেতরে ঢুকতেই অদ্ভুত শীতল বাতাস, যেন ভূতের নিশ্বাস।
ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় দেখা যায়—কোণায় একটি আয়না। আয়নায় আমার প্রতিফলন।
কিন্তু চোখগুলো শূন্য, মুখে অর্ধেক হাসি, অর্ধেক কান্না।
এক মুহূর্তে মনে হলো—আমি একা নই। কেউ অতিপ্রাকৃতভাবে আমাকে দেখছে, আমার প্রতি নজর রাখছে।
প্রতি ধাপ, প্রতিটি শব্দ আমাকে আরও ভয়ে জড়াচ্ছে। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় দেখা যায়—ধূসর ছায়া ধীরে ধীরে সরছে।
শ্বাসরুদ্ধ, হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত, সমুদ্রের দূরদূরান্তের আওয়াজ যেন আমার কানে চেঁচিয়ে উঠছে।
একটু দূরে দেখি ছোট একটি লক। লক খোলার সঙ্গে সঙ্গে খসখসে শব্দ—হঠাৎ আমি সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে।
দূরে সূর্য অস্তাচল, বাতাস ঠাণ্ডা। আয়নায় ফিরে তাকাই—দূরে একজন দাঁড়িয়ে, চোখ শূন্য, মুখে অদ্ভুত হাসি।
আমি একা, তবে যেন অনেক চোখ আমাকে ঘিরে আছে।
রাত গভীর। সমুদ্রের ঢেউ গর্জন করছে।
ঘর ঘুরে ঘুরে অদ্ভুত শব্দ, বাতাসের খসখসানি—সবই ভয় তৈরি করছে।
একটি ধূসর হাত হঠাৎ আমার দিকে বাড়ানো হলো।
আমি তাকাই—ঘরে কেউ নেই। দরজা বন্ধ, বাতাস স্থির, শুধু আমার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত।
নিঃশব্দতা, সমুদ্রের গর্জন, বাতাসের ফিসফিস—সব মিলিয়ে মনে হলো, আমি বাস্তব আর অ-বাস্তবের মধ্যে আটকে আছি।
নয়নখোলা জানালার আড়ালে আলো—দূর থেকে রিসোর্টের মূল বাংলো দেখা যাচ্ছে। প্রাণ ফেরার ভয়, এবং কৌতূহল একসঙ্গে আমাকে টানে।
আমি হালকা হাঁটলাম। পায়ের নিচে মাটি কুঁচকে আওয়াজ করছে। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় কিছু ধূসর ছায়া একেবারে কাছে চলে আসছে।
হঠাৎ—কেউ আমার পেছন থেকে ফিসফিস করে ডাক দিলো, কিন্তু যখন ফিরে তাকাই, চারপাশ খালি।
হৃদয়টা যেন গলায় আটকে। ফ্ল্যাশলাইট জ্বলছে, কিন্তু আলোতে যেন কিছু নেই।
আমি অনুভব করলাম—দূরের ঘরগুলোতে অদ্ভুত আলো জ্বলছে, কিন্তু দরজা সব বন্ধ। শুধু ছায়া নাচছে।
এক মুহূর্তে মনে হলো, কেউ অদৃশ্যভাবে আমাকে ঘিরে রেখেছে।
আমি অদ্ভুত সাহস নিয়ে ধীরে ধীরে দরজাগুলো খুঁজতে লাগলাম। প্রতিটি কোণ, প্রতিটি কক্ষ, সবকিছুই অচেনা।
হঠাৎ—একটি দরজা নিজে নিজে খুলতে শুরু করলো। ভেতরে ঢুকতেই শীতল বাতাস, ফিসফিস, এবং অদ্ভুত হাহাকার।
একটি ছোট বাচ্চার কাঁদার আওয়াজ।
আমি এগোলাম—কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
হঠাৎ—দূরের জানালার আড়ালে দেখি ছায়ার মতো একটি শাড়িপরা মেয়ে। চোখ বড়, মুখ শূন্য। আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি চিৎকার করতে চাই, কিন্তু শব্দ বের হয় না। হৃদয় আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে।
সমুদ্রের ঢেউ যেন গর্জন করে আমার ভয়কে আরও তীব্র করছে। প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি শব্দ—সবই ভয়ের মধ্যে ডুবিয়ে দিচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আমি আর জীবিত নই।
ভোর। সূর্যের আলো। দরজা খোলা, বাতাসের মতো মুক্তি। আমি একা, কিন্তু বেঁচে আছি।
ভয় এখনও হৃদয়ে, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে।
কিছু লোক এসে আমাকে একটি চৌকিতে আবিষ্কার করল। মধ্যবয়সী একজন লোক বললেন, "আপনার কপাল ভালো, আপনি বেঁচে আছেন। আর আপনি এতো জায়গা থাকতে কেন গেলেন ঐ পরিত্যক্ত বাংলোতে?"
তিনি আরও বললেন, "ঐ বাংলোর মানে—দ্বিতীয় দরজায় যারা যায়, তারা আর কখনো ফিরে আসে না। সকালে তাদের মরদেহ পড়ে থাকে সাগরপারের বালুতে। দ্বিতীয় দরজা একটি অভিশপ্ত বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছয় মাসের এক বাচ্চাসহ সবাই ঐ বাড়িতে হত্যা করা হয়। তারপর থেকে ঐ আত্মাগুলো রাত হলে রক্তের জন্য ঘুরে বেড়ায়। মানুষ পেলেই তাদের শরীর থেকে রক্ত শুষে তাদের লাশ ফেলে দেয় সাগরপারে।"
আমি বেঁচে গেছি শুধু আমার সাহসের জন্য। “দ্বিতীয় দরজা” আমাকে শিখিয়েছে—কখনও কখনও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাই আমাদের সত্যিকারের শক্তি দেখায়।
#ভৌতিকগল্প #দ্বিতীয়দরজা #হররস্টোরি #বাংলাভূতেরগল্প #সমুদ্রপাড়েররিসোর্ট
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।