দুঃখিত বলতে শেখা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
যে সন্তান কখনো নিজের ভুলের জন্য ‘আমি দুঃখিত’ বলতে শেখেনি, সে একদিন সম্পর্ক হারিয়েও বুঝতে পারে না কেন।
ছোটবেলায় এসব খুব সাধারণ ঘটনা বলেই মনে হয়। খেলতে গিয়ে একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিল। কারও খেলনা নিয়ে টানাটানি হলো। রাগের মাথায় একটা খারাপ কথা বলে ফেলল। স্কুলে বন্ধুর খাতাটা ছিঁড়ে ফেলল।
মা বললেন, “যাও, ওকে সরি বলো।”
ছেলেটা মুখ ঘুরিয়ে রইল।
“সরি বললে কী হবে? ও-ই তো আগে আমাকে মেরেছে।”
মা হয়তো তখন বললেন, “আচ্ছা, থাক। আমি ওর মাকে বুঝিয়ে বলছি।”
বিষয়টা সেদিনের মতো মিটে গেল। কিন্তু শিশুটি কিছু একটা শিখে গেল।
সে শিখল, নিজের ভুলের সামনে দাঁড়ানোর দরকার নেই। বড় কেউ থাকলে বিষয়টা সামলে নেওয়া যায়।
এরপর এমন ঘটনা আরও অনেকবার ঘটে। স্কুল থেকে ফোন এলো—ছেলের সঙ্গে অন্য একজনের ঝামেলা হয়েছে। বাবা ছুটে গেলেন। শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললেন। অন্য অভিভাবকের সঙ্গে কথা বললেন। শেষে বললেন, “ও তো এমন ছেলে না। হয়তো পরিস্থিতির কারণে হয়ে গেছে।”
কখনো সন্তানের হয়ে টাকা দিয়ে দেওয়া হলো। কখনো তার বলা কথার ব্যাখ্যা বাবা-মা নিজেরাই দিলেন। কখনো এমনকি সন্তানের হয়ে ক্ষমাটাও চেয়ে নেওয়া হলো।
উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। বাবা-মা সন্তানকে বিপদ থেকে বাঁচাতে চেয়েছেন। কিন্তু অজান্তেই একটা গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস থেকে তাকে দূরে রেখেছেন—নিজের আচরণের দায় নেওয়া।
কারণ ক্ষমা চাওয়া শুধু একটা শব্দ শেখা নয়। এটা নিজের ভুলকে নিজের চোখে দেখার অভ্যাস।
একজন শিশু যখন নিজে গিয়ে বলে, “আমি তোমাকে ধাক্কা দিয়েছি। এটা আমার ঠিক হয়নি।”
তখন সে শুধু অন্য একজনের কাছে ক্ষমা চাইছে না। সে নিজের ভেতরেও একটা সীমারেখা তৈরি করছে—কোন আচরণটা ঠিক, আর কোনটা ঠিক নয়।
এই শিক্ষা খুব ছোট বয়সেই দরকার। নইলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাটাও বড় হয়।
বন্ধুর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হলে সে বলবে, “তুমিও তো সেদিন এমন করেছিলে।”
অফিসে নিজের ভুল ধরা পড়লে বলবে, “আমি একা তো এটা করিনি।”
সম্পর্কে কষ্ট দিলে বলবে, “তুমি এত সেনসিটিভ কেন?”
কেউ কষ্ট পেয়েছে—এটা স্বীকার করার বদলে সে কারণ খুঁজবে, ব্যাখ্যা দেবে, অন্যের ভুল বের করবে। কারণ ছোটবেলায় সে শিখেছিল, ভুল স্বীকার করার চেয়ে ভুলের একটা অজুহাত খুঁজে পাওয়া সহজ।
আরও বড় সমস্যা হয় যখন সে বুঝতে শেখে, ‘সরি’ বলা মানে নিজেকে ছোট করা।
তখন তার মনে প্রশ্ন আসে—“আমি কেন ক্ষমা চাইব?”
অথবা, “আগে ও ক্ষমা চাক।”
এই জায়গাটা খুব বিপজ্জনক।
কারণ ক্ষমা চাওয়া মানুষকে ছোট করে না। বরং নিজের আচরণের সামনে দাঁড়ানোর জন্য যতটা সাহস লাগে, অন্যকে দোষ দেওয়ার জন্য তার চেয়ে অনেক কম সাহস লাগে।
একদিন এই শিশুটিই বড় হবে।
তার বন্ধু থাকবে। সহকর্মী থাকবে। ভালোবাসার মানুষ থাকবে। সংসার হবে। সেখানে প্রতিদিন সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো হবে না। কখনো সে ভুল বলবে, ভুল করবে, কাউকে অকারণে কষ্ট দেবে।
সেই সময় বাবা-মা তার পাশে থাকবেন না। ফোন করে প্রতিটি সম্পর্ক মেরামত করে দেওয়ার সুযোগও থাকবে না।
তখন তাকে নিজেকেই বলতে হবে, “হ্যাঁ, এখানে আমার ভুল হয়েছে।”
অনেক সম্পর্ক আসলে কোনো বড় ঘটনার কারণে ভেঙে যায় না।
ভেঙে যায় অনেকগুলো অসমাপ্ত ‘দুঃখিত’-এর ভারে।
তাই সন্তান ভুল করলে সবসময় তার হয়ে কথা বলার দরকার নেই। পাশে থাকুন। তাকে বুঝিয়ে দিন কী ভুল হয়েছে। কিন্তু কথাটা যেন তার মুখ থেকেই আসে।
সে হয়তো প্রথম দিন ঠিক করে বলতে পারবে না। হয়তো শুধু বলবে, “সরি।”
সেখান থেকেই শুরু হোক।
ধীরে ধীরে সে শিখুক—
“আমি ভুল করেছি।”
“তোমাকে কষ্ট দেওয়া আমার ঠিক হয়নি।”
“আমি দুঃখিত।”
এই কয়েকটি বাক্য একজন মানুষকে দুর্বল করে না। বরং সম্পর্ক ধরে রাখার মতো পরিণত করে।
ক্ষমা চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়। নিজের অহংকারের চেয়ে সম্পর্ককে বড় করে দেখার ক্ষমতা।
একজন পরিণত মানুষ জানে, সব ভুলের ব্যাখ্যা দিতে হয় না। কিছু ভুলের সামনে শুধু মাথা নিচু করে বলতে হয়—
“হ্যাঁ, ভুলটা আমার ছিল।”
সন্তানের হয়ে প্রতিবার ক্ষমা চেয়ে নেওয়া খুব সহজ।
কিন্তু একদিন তার নিজের ভুলের সামনে দাঁড় করিয়ে বলা—
“এবার তুমি নিজেই বলো।”
হয়তো সেটাই বাবা-মায়ের আরও কঠিন, আরও প্রয়োজনীয় দায়িত্ব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।