সাজানো জীবনের সন্তান
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কিছু সন্তান ভবিষ্যতে ব্যর্থ হয় না; তারা ব্যর্থ হওয়ার সুযোগই পায়নি—কারণ তাদের জীবন সবসময় আগে থেকেই সাজানো ছিল।
সকাল কখন ঘুম থেকে উঠবে, কখন পড়বে, কখন খেলবে—সবকিছুর একটা সময় আছে। স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া, একটু বিশ্রাম, তারপর কোচিং। সন্ধ্যায় আরেকজন শিক্ষক। রাতে পড়ার টেবিল।
শুক্রবারও পুরোপুরি ছুটি নয়। ইংরেজির বিশেষ ক্লাস, না হলে গণিতের পরীক্ষা।
বাবা-মা খুশি। সন্তান সময় নষ্ট করছে না। ভবিষ্যতের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি চলছে।
শুধু একটা প্রশ্ন কেউ করছে না—
সে আসলে কী করতে চায়?
প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা নয়।
কারণ যার ছোটবেলা থেকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নিয়ে দিয়েছে, তার নিজের পছন্দ তৈরি হওয়ার সুযোগ কোথায়?
কোন স্কুলে পড়বে—বাবা ঠিক করেছেন। কোন বিষয়ে পড়বে—মা-বাবা ঠিক করেছেন। কোন কোচিংয়ে যাবে, কার সঙ্গে মিশবে, কখন বাইরে যাবে—সবকিছুরই একটা নির্দিষ্ট উত্তর আছে।
এমনকি অবসরও অনেক সময় অবসর থাকে না।
‘ফ্রি আছিস? ওই বইটা পড়।’
‘আজ পড়া কম হয়েছে, অঙ্কগুলো করে নে।’
‘এভাবে বসে আছিস কেন? সময় নষ্ট করিস না।’
শিশুটার দিন ভরে যায়।
শুধু তার নিজের জন্য ফাঁকা জায়গাটা কমতে থাকে।
অথচ মানুষের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয় সেই ফাঁকা সময়েই।
কোনো শিশু হয়তো এক বিকেলে অকারণে ছবি আঁকতে বসে বুঝতে পারে, রং তার ভালো লাগে। কেউ পুরোনো রেডিও খুলে আবার জোড়া লাগাতে গিয়ে যন্ত্রপাতির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। কেউ বন্ধুর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতে করতে বুঝতে পারে, মানুষের সঙ্গে কথা বলাই তার সবচেয়ে স্বাভাবিক ক্ষমতা।
এসবের কোনোটা পরীক্ষার খাতায় লেখা থাকে না।
তাই এগুলোকে আমরা অনেক সময় সময়ের অপচয় মনে করি।
পরিকল্পনা অবশ্যই দরকার। শিশুর জীবনে নিয়ম থাকা দরকার। পড়াশোনা, ঘুম, শরীরচর্চা, দায়িত্ববোধ—এসব শেখানো বাবা-মায়ের দায়িত্ব।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন পরিকল্পনা এত বেশি হয়ে যায় যে সন্তান নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাই পায় না।
শিশুর পছন্দ বদলাতে পারে। আজ যে কাজটি ভালো লাগছে, কিছুদিন পর সেটি আর ভালো নাও লাগতে পারে। একটি শখ শুরু করে ছেড়ে দেওয়া, কোনো বিষয় নিয়ে আগ্রহী হয়ে পরে অন্যদিকে চলে যাওয়া—এসবও নিজেকে চিনে নেওয়ার অংশ।
ইচ্ছা বদলানো ব্যর্থতা নয়।
কিন্তু প্রতিটি পথের শুরুতেই যদি বাবা-মা বলে দেন—‘এদিকে যাবে’, ‘ওদিকে যাবে না’, তাহলে সন্তান নিজের ভেতরের কথাটা শুনবে কখন?
আরেকটি সমস্যা আছে।
অতিরিক্ত পরিকল্পিত শৈশব অনেক সময় সন্তানকে নির্দেশ মানতে শেখায়, সিদ্ধান্ত নিতে নয়।
তারপর একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়।
কেউ আর বলে দেয় না কোন বিষয় নেবে। কোন বন্ধুত্বটা রাখবে। কোথায় চাকরির আবেদন করবে। কোন সুযোগটা গ্রহণ করবে, কোনটা ছেড়ে দেবে।
হঠাৎ সে থেমে যায়।
কারণ এতদিন সে ভুল করার চেয়ে সঠিক নির্দেশ মেনে চলতেই বেশি অভ্যস্ত ছিল।
জীবন অবশ্য কারও সময়সূচি মেনে চলে না।
একদিন চাকরি চলে যেতে পারে। কোনো সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে। পাঁচ বছরের পরিকল্পনা একটা ফোনকলেই বদলে যেতে পারে।
কখনো এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যার উত্তর বাবা-মায়ের কাছেও নেই।
সেদিন ভালো ফলাফল যথেষ্ট নয়। নিজের মাথায় ভাবতে জানতে হয়। অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সেখানেই বোঝা যায়, শিশুটাকে আমরা কতটা প্রস্তুত করেছি।
তাই সন্তানের জীবন থেকে সব অগোছালো সময় সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
কিছু বিকেল তার নিজের থাকুক।
কিছু সিদ্ধান্ত সে নিজে নিক।
কখনো ভুল করুক। কোনো বই পছন্দ না হলে মাঝপথে রেখে দিক। কোনো শখ কয়েক মাস পর ছেড়ে দিক। একদিন কিছুই না করে বসে থাকুক।
বিরক্ত হোক।
নিজের সঙ্গে একটু একা থাকুক।
হয়তো সেই ফাঁকা সময়েই তার ভেতর থেকে কোনো নতুন ইচ্ছা বেরিয়ে আসবে।
শিশুর প্রতিটি মিনিটকে উৎপাদনশীল করে তুলতে হবে—এই ধারণাটাও আমাদের নতুন করে ভাবা দরকার। মানুষ কোনো কারখানার পণ্য নয়, যার প্রতিটি ঘণ্টার হিসাব থাকবে।
বাবা-মা পথ দেখাবেন। সাবধান করবেন। প্রয়োজনে থামাবেন।
কিন্তু প্রতিটি বাঁক আগে থেকেই ঠিক করে দিলে সন্তান হয়তো ভুল পথে যাবে না।
শুধু নিজের পথটাও খুঁজে পাবে না।
হয়তো ভালো শৈশব এমন নয়, যেখানে প্রতিটি দিন সুন্দরভাবে সাজানো থাকে।
হয়তো ভালো শৈশব হলো এমন একটা সময়, যেখানে কিছু নিয়ম আছে, আবার কিছুটা অগোছালো আকাশও আছে।
যেখানে বাবা-মা সব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মাঝে মাঝে শুধু জিজ্ঞেস করেন—
‘তুমি কী করতে চাও?’
কারণ একদিন সেই প্রশ্নের উত্তরটা সন্তানকেই দিতে হবে।
সেদিন তার পাশে কোনো সময়সূচি থাকবে না।
থাকবে না আগে থেকে লেখা কোনো নির্দেশনা।
থাকবে শুধু তার নিজের জীবন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।