ভবিষ্যতের ভয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
“এইভাবে চললে তোমার ভবিষ্যৎ শেষ।”
একটি শিশুর কানে এই বাক্য ভবিষ্যতের সতর্কতা নয়, ভবিষ্যতের ভয় হয়ে থেকে যেতে পারে।
পরীক্ষার খাতা হাতে নিয়ে বাবা দেখলেন নম্বর কম। মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
“এভাবে পড়াশোনা করলে জীবনে কিছুই করতে পারবে না।”
ছেলেটা চুপ করে রইল।
কয়েকটা নম্বর কম পেয়েছিল সে। কিন্তু কথাটার ভেতর দিয়ে হঠাৎ তার সামনে খুলে গেল একটা অন্ধকার ভবিষ্যৎ—চাকরি নেই, টাকা নেই, সম্মান নেই, কোথাও জায়গা নেই।
একটি ছোট ভুলের সঙ্গে তার পুরো জীবনটাকে জুড়ে দেওয়া হলো।
এমন কথা বাবা-মা অনেক সময় রাগ করে বলেন। সন্তানকে ভয় দেখানোই উদ্দেশ্য থাকে না। বরং তাঁরা ভয় পান—সন্তান যদি এখন থেকেই সচেতন না হয়, পরে যেন কষ্ট না পায়।
কিন্তু শিশুর মন সবসময় আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয় না।
সে শুধু বাক্যটা মনে রাখে।
“ফেল করলে সব শেষ।”
“ভালো চাকরি না পেলে জীবনে কিছু নেই।”
“এখন ঠিকমতো পড়তে না পারলে পরে আফসোস করবে।”
“অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়লে আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না।”
ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎ তার কাছে একটা খোলা মাঠ থাকে না।
হয়ে ওঠে একটা পরীক্ষার হল, যেখানে প্রতিটি ভুলের জন্য নাকি সারাজীবনের শাস্তি অপেক্ষা করছে।
তখন সন্তান শুধু সফল হতে চায় না।
সে ব্যর্থ না হতে চায়।
দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।
যে শিশু সফল হতে চায়, সে নতুন কিছু চেষ্টা করতে পারে। ভুল হতে পারে জেনেও হাত বাড়ায়।
কিন্তু যে শিশু ব্যর্থতাকে ভয় পায়, সে অনেক সময় নিরাপদ পথটাই বেছে নেয়।
যে বিষয়ে নিশ্চিত নয়, সেখানে যায় না।
যে কাজটা কঠিন, সেটা শুরু করার আগেই ভাবে—“যদি না পারি?”
নতুন কিছু করার আগে ভাবে—“যদি সবাই হাসে?”
কখনো কখনো বাবা-মা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে গিয়ে তার ভেতরের সাহসটাকেই ছোট করে ফেলেন।
কারণ ভয় মানুষকে সাবধান করে ঠিকই।
কিন্তু সবসময় এগিয়ে দেয় না।
ভয় দিয়ে সন্তানকে পড়তে বসানো যায়।
ভয় দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি করানো যায়।
ভয় দিয়ে কিছুদিন নিয়ম মানানো যায়।
কিন্তু ভয় দিয়ে তাকে জীবনের অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুত করা যায় না।
কারণ জীবন কখনো বাবা-মায়ের বানানো প্রশ্নপত্র অনুযায়ী চলে না।
একদিন পরীক্ষায় খারাপ ফল হবে।
একদিন পছন্দের চাকরিটা হবে না।
কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাবে।
কোনো পরিকল্পনা মাঝপথে থেমে যাবে।
কোনো দরজা খুলবে না।
সেদিন যদি সন্তানের মাথার ভেতর ছোটবেলা থেকেই এই বিশ্বাস বসে থাকে—“ব্যর্থতা মানেই শেষ”, তাহলে সে সমস্যার চেয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি ভয় পাবে।
অথচ বাবা যদি বলেন,
“এই ফলটা ভালো হয়নি। কোথায় সমস্যা হয়েছে, সেটা আমরা দেখি। সামনে আবার চেষ্টা করার সুযোগ আছে।”
তাহলে কথাটার অর্থ বদলে যায়।
মা যদি বলেন,
“এই চাকরিটা না হলে আরেকটা চেষ্টা করবে। একটা সুযোগ না পাওয়া মানে জীবন থেমে যাওয়া নয়।”
তখন সন্তান বুঝতে শেখে—ভবিষ্যৎ একটাই দরজা নয়।
একটা বন্ধ হলে অন্য দরজাও থাকতে পারে।
আর সব দরজা সঙ্গে সঙ্গে খুলবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।
কখনো অপেক্ষা করতে হয়।
কখনো পথ বদলাতে হয়।
কখনো নিজের ভুল স্বীকার করে আবার শুরু করতে হয়।
এই শিক্ষাটাই হয়তো ভবিষ্যতের সবচেয়ে দরকারি শিক্ষা।
সন্তানকে সবসময় বলতে হবে না, “তুমি পারবেই।”
কারণ সে সবসময় পারবে না।
কখনো সে পারবে না।
কখনো হেরে যাবে।
কখনো অন্য কারও চেয়ে পিছিয়ে থাকবে।
তার বদলে তাকে এটুকু বিশ্বাস দেওয়া দরকার—
“যদি না-ও পারো, তবু আমরা দেখব এরপর কী করা যায়।”
এই একটি বাক্যের মধ্যে ভবিষ্যতের প্রতি ভয় নয়, ভবিষ্যতের সঙ্গে লড়াই করার সাহস আছে।
কারণ বাবা-মায়ের কাজ সন্তানের সামনে ভবিষ্যৎকে সুন্দর বলে সাজিয়ে দেওয়া নয়।
আবার ভয়ংকর বলেও দেখানো নয়।
তাঁদের কাজ হলো তাকে শেখানো—ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সেখানে ভালো দিন থাকবে, খারাপ দিনও থাকবে। কিছু দরজা খুলবে, কিছু দরজা বন্ধ হবে। কিন্তু কোনো একটি ব্যর্থতা পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে না।
শিশুকে ভয় দেখিয়ে হয়তো আজ পড়ার টেবিলে বসানো যায়।
কিন্তু একদিন যখন তাকে একা সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তখন পাশে থাকবে না বাবার গম্ভীর মুখ, মায়ের সতর্কবাণী, কিংবা সেই পুরোনো বাক্য—
“এইভাবে চললে তোমার ভবিষ্যৎ শেষ।”
থাকবে শুধু তার নিজের ভয়।
তাই সন্তানকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার আগে একবার ভাবুন—
আপনি কি তাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাগুলো দেখতে শেখাচ্ছেন, নাকি ভবিষ্যতের বিপদগুলো গুনতে শেখাচ্ছেন?
ভয় দিয়ে শৃঙ্খলা তৈরি করা যায়।
কিন্তু ভয় দিয়ে সাহস তৈরি করা যায় না।
আপনি সন্তানকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছেন, নাকি ভবিষ্যৎকে ভয় পেতে শেখাচ্ছেন?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।