অপেক্ষা করতে শেখা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সবকিছু সময়মতো এনে দিতে দিতে বাবা-মা কখনো কখনো সন্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাটাই নষ্ট করে দেন—অপেক্ষা করার ক্ষমতা।
বাবা বললেন,
“এখন না। কয়েকদিন পর কিনে দেব।”
ছেলের মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।
বাবা বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না। পরদিনই খেলনাটা কিনে আনলেন।
মেয়েটা মোবাইল চাইছে। মা বললেন,
“একটু পরে দেব।”
মেয়েটা বিরক্ত হলো।
কিছুক্ষণ পর মা মোবাইলটা তার হাতে দিয়ে দিলেন।
বাচ্চা কাঁদছে। কোনো কিছু নিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছে। তাকে একটু সময় দেওয়া, অন্যদিকে মন ফেরানো কিংবা নিজের অস্বস্তিটা সামলানোর সুযোগ দেওয়ার বদলে দ্রুত তার হাতে কিছু একটা তুলে দেওয়া হলো।
ঘটনাগুলো খুব ছোট।
কিন্তু এগুলোর ভেতর দিয়ে একটা বড় শিক্ষা তৈরি হতে থাকে—
“আমি কিছু চাইলে আমাকে অপেক্ষা করতে হয় না।”
চাইলে পাওয়া যায়।
বিরক্ত হলে কিছু পাওয়া যায়।
কষ্ট হলে কেউ এসে ঠিক করে দেয়।
সমস্যা হলেই সমাধান হাজির।
শিশুর চাওয়া থাকবে, আবদার থাকবে, অধৈর্যতাও থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। সমস্যা চাওয়ায় নয়।
সমস্যা হয় তখন, যখন আমরা প্রতিবার তার অস্বস্তিটা সহ্য করার আগেই সরিয়ে দিই।
আজ খেলনা।
কাল নতুন পোশাক।
তারপর মোবাইল।
তারপর ভালো ফল।
তারপর চাকরি।
তারপর জীবনের আরও অনেক কিছু।
প্রতিবার যদি তার ভেতরের তাগিদটা হয়—“আমি এখনই চাই”, তাহলে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষা তার কাছে শুধু দেরি মনে হবে না; মনে হবে, তাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
তখন সে শুধু সফল হতে চাইবে না।
সে দ্রুত সফল হতে চাইবে।
পড়াশোনা শুরু করে ফলের জন্য অস্থির হবে।
কাজ শুরু করে সঙ্গে সঙ্গে স্বীকৃতি চাইবে।
কয়েকবার চেষ্টা করে ফল না পেলে আবার চেষ্টা করার বদলে অন্য পথে চলে যেতে চাইবে।
কারণ ছোটবেলা থেকেই তার ভেতরে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে—
“যা চাই, তা দ্রুত না পেলে কোথাও একটা সমস্যা আছে।”
অথচ জীবনের বড় অর্জনগুলোর প্রায় সবকিছুর জন্যই অপেক্ষা করতে হয়।
বীজ মাটিতে পুঁতে পরদিন গাছ পাওয়া যায় না।
একটা সম্পর্ক গভীর হতে সময় লাগে।
একজন মানুষ কোনো কাজে দক্ষ হতে সময় নেয়।
নিজেকে তৈরি করতেও সময় লাগে।
কখনো মাস যায়, কখনো বছর।
অপেক্ষার ভেতরেই মানুষ কিছু অমূল্য জিনিস শেখে।
অপূর্ণতা সহ্য করতে শেখে।
নিজের ইচ্ছাকে একটু থামাতে শেখে।
আজ না হলে কাল হতে পারে—এই বিশ্বাস তৈরি হয়।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সে বুঝতে শেখে—সব ইচ্ছা পূরণ হওয়া জরুরি নয়।
বাবা-মায়ের জন্য অবশ্য এটা সহজ নয়।
সন্তান কষ্ট পেলে বুকটা কেঁপে ওঠে। কাঁদলে কিছু একটা করে দিতে ইচ্ছে করে। সামর্থ্য থাকলে সন্তানকে কেন অপেক্ষা করাবেন—এই প্রশ্নও আসে।
কিন্তু সামর্থ্য থাকা আর প্রতিবার সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেওয়া এক জিনিস নয়।
কখনো বাবা বলতে পারেন,
“তুমি এটা চেয়েছ, আমি জানি। কিন্তু এখনই কিনছি না। কিছুদিন পরে কিনব।”
সন্তান হয়তো মুখ ভার করবে। রাগ করবে। বারবার চাইবে।
তবু তাকে সেই অপেক্ষাটুকুর মধ্য দিয়ে যেতে দিন।
মা যদি বলেন,
“তুমি এখন খুব বিরক্ত হচ্ছ। একটু সময় দাও। তারপর আমরা কথা বলব।”
তাহলে তিনি সন্তানের কষ্টকে অস্বীকার করছেন না।
শুধু শেখাচ্ছেন—কষ্ট হলেই সঙ্গে সঙ্গে কিছু একটা দিয়ে সেই কষ্ট বন্ধ করতে হয় না।
এটা নিষ্ঠুরতা নয়।
এটা জীবনের জন্য প্রস্তুত করা।
কারণ একদিন বাবা-মা সবকিছু করে দিতে পারবেন না।
চাকরির ফল প্রকাশের জন্য সন্তানকে অপেক্ষা করতে হবে।
কোনো উত্তর আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
কোনো স্বপ্ন পূরণের জন্য মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে।
সেদিন পাশে কেউ থাকবে না যে বলবে,
“মন খারাপ করো না, এখনই তোমার যা চাই তা এনে দিচ্ছি।”
থাকবে শুধু সে আর তার অপেক্ষা।
তাই সন্তানকে সবকিছু সময়মতো দেওয়া ভালোবাসা।
কিন্তু সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেওয়া সবসময় ভালোবাসা নয়।
কখনো ভালোবাসা মানে সন্তানের চাওয়ার সামনে একটু থেমে দাঁড়ানো।
তার বিরক্তিটাকে সঙ্গে সঙ্গে মুছে না দেওয়া।
তার অপূর্ণতাকে একটু জায়গা দেওয়া।
কারণ যে শিশু অপেক্ষা করতে শেখে, সে শুধু ধৈর্যশীল হয় না।
সে বুঝতে শেখে—
সবকিছুর একটা সময় আছে।
সব দরজা সঙ্গে সঙ্গে খোলে না।
সব চেষ্টার ফল তাড়াতাড়ি আসে না।
আর দেরি হওয়া মানেই ব্যর্থ হওয়া নয়।
জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু জিনিসের জন্য অপেক্ষা করতেই হয়।
তাই একবার নিজেকে প্রশ্ন করুন—
আপনি সন্তানকে সবকিছু সময়মতো দিচ্ছেন, নাকি তার চাওয়ার আগেই সবকিছু দিয়ে দিয়ে তাকে অপেক্ষা করতে ভুলিয়ে দিচ্ছেন?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।