ধারাবাহিক গল্প
গোপন উত্তরাধিকার
পর্ব ৭: উত্তরাধিকার
২০ জুন, ২০২৬
লিফটটা নিচে নামছে।
নিশির হাতে খামটা। সাদা। পাতলা। ভেতরে দুটো কাগজের খসখস আওয়াজ।
অভিক বলল, "খোলো।"
নিশি তাকাল না। "না।"
"নিশি, আমাদের জানা দরকার।"
"তোমাদের? কার? তোমার? অর্ণবের?" নিশি খামটার দিকে তাকাল। "রায়ানের? মিতুর?"
কেউ উত্তর দিল না।
লিফট থামল। দরজা খুলল।
নিশি বের হলো না। বোতাম চেপে দরজা বন্ধ করে দিল। আবার উপরে।
অভিক বলল, "কী করছো?"
"ভাবছি।"
তিন তলা। চার তলা। পাঁচ তলা।
নিশি খামটা দুই হাতে ধরল। একটানে ছিঁড়ল। মাঝখান দিয়ে। তারপর আবার। চার টুকরো।
অভিক হাত বাড়াল। "নিশি!"
নিশি টুকরোগুলো কোটের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।
"আমি পড়িনি।"
"তাহলে ছিঁড়লে কেন?"
"কারণ তুমি পড়তে। অর্ণব পড়ত। তারপর তোমরা ঠিক করতে রায়ান কার ছেলে, মিতু কার মেয়ে। তারপর ওদের ভাগ করতে। এটা তোমার, এটা আমার।"
লিফট থামল। নিশি বের হলো।
"আমি ভাগ করব না। ওরা দুজনেই থাকবে। একসঙ্গে। আমার শর্তে।"
অভিক পেছন পেছন এলো। "তুমি জানতে চাও না রায়ান আমার ছেলে কি না?"
নিশি ঘুরল।
"চাই। খুব চাই। রাতে ঘুম আসে না এটা ভেবে। কিন্তু জানলে কী হবে? যদি ও তোমার ছেলে হয়, আমি ওকে বেশি ভালোবাসব? যদি অর্ণবের ছেলে হয়, আমি ওকে বের করে দেব?"
অভিক চুপ।
"আমি ওইরকম মানুষ না, অভিক। তুমি হতে পারো। আমি না।"
তিন সপ্তাহ পর। তেজগাঁওয়ের গুদাম।
এখন আর গুদাম নেই। সাইনবোর্ড বদলেছে। R.H Logistics। নিচে ছোট করে লেখা - A concern of Abhik Group.
ভেতরে ফর্কলিফটের আওয়াজ। মাল উঠছে নামছে।
অফিস রুমে রায়ান আর মিতু ঝগড়া করছে।
"তিনটা গাড়ি লাগবে।"
"দুটো। নিশি ম্যাডাম বলেছে দুটো।"
"নিশি ম্যাডাম এখানে থাকে না। আমি চালাই কোম্পানি।"
"আর আমি টাকা গুনি। টাকা আমার ম্যাডামের। সো, দুটো গাড়ি।"
নিশি দরজায় দাঁড়িয়ে শুনছিল। হাসল না। ঠোঁটের কোণ একটু কাঁপল শুধু।
কাশল। দুজনেই ঘুরল।
"ম্যাডাম।"
"ঝগড়া শেষ?"
রায়ান বলল, "ও শুরু করেছে।"
মিতু বলল, "ও বেশি তেল খরচ করছে।"
নিশি ফাইলটা টেবিলে রাখল। "গত মাসের প্রফিট। প্রথমবার প্লাসে গেছো।"
রায়ান ফাইলটা টেনে নিল। চোখ বড় হয়ে গেল। "সত্যি?"
"আমি মিথ্যা বলি না। তোমার বাবারা বলে।"
মিতু হেসে ফেলল। রায়ানও। নিশি হাসল না।
"পার্টি করবে না?"
নিশি বলল, "প্রফিট দিয়ে লোন শোধ করো। পার্টি পরে।"
বেরিয়ে আসছিল, রায়ান ডাকল।
"নিশি আন্টি।"
নিশি থামল। ঘুরল না।
"ম্যাডাম।"
"সরি। ম্যাডাম।" একটু থেমে, "থ্যাংক ইউ।"
নিশি বলল, "ওয়েলকাম না। কাল সকাল নয়টায় রিপোর্ট নিয়ে অফিসে আসবে। দুজনেই।"
"জি ম্যাডাম।"
রাতে। বাড়ি।
অভিক ডাইনিং টেবিলে বসে। সামনে দুটো প্লেট। ভাত ঠান্ডা হয়ে গেছে।
নিশি ঢুকল। ব্যাগ রাখল। হাত ধুল। বসল।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। শুধু চামচের আওয়াজ।
অভিক বলল, "রায়ান কেমন আছে?"
"ভালো। প্রফিট করেছে।"
"মিতু?"
"তোমার টাকা পাহারা দিচ্ছে। ভালোই পাহারা দিচ্ছে।"
অভিক হাসল। অল্প। "তুমি ওদের মা হয়ে গেলে নাকি?"
নিশি চামচ থামাল। তাকাল।
"না। আমি ওদের বস। মা ওদের একজন ছিল। রুবিনা। সে যথেষ্ট ছিল।"
"তাহলে তুমি কী?"
"আমি যে টাকা দিয়েছি সেটা ফেরত নেব। সুদসহ।"
অভিক মাথা নিচু করল। তারপর বলল,
"আমরা... আমরা ঠিক আছি?"
নিশি কিছুক্ষণ ভাত নাড়ল।
"না।"
অভিক তাকাল।
"তাহলে?"
"তাহলে খাচ্ছি। একসঙ্গে। কাল অফিস যাব। একসঙ্গে। তারপর পরশু আবার।"
"এটাকে কী বলে?"
"জানি না। ক্ষমা বলে না। বিশ্বাসও বলে না।" নিশি পানি খেল। "অভ্যাস বলে হয়তো। ভালো অভ্যাস। ভাঙতে ইচ্ছা করছে না।"
অভিক কিছু বলল না। হাত বাড়িয়ে নিশির হাতটা ছুঁতে গেল। নিশি হাত সরাল না। ধরতেও দিল না। মাঝখানে রেখে দিল।
"সময় লাগবে, অভিক।"
"আমি জানি।"
"অনেক সময়।"
"আমি আছি।"
নিশি মাথা নাড়ল। আর কিছু বলল না।
রাত দুটো।
অভিক ঘুমিয়ে গেছে।
নিশি বারান্দায়। হাতে একটা ছেঁড়া খাম। টেপ দিয়ে জোড়া লাগানো।
DNA রিপোর্ট। লিফটে ছিঁড়েছিল। পরে বাসায় এসে আবার জোড়া লাগিয়েছে। একা।
খুলেছিল। পড়েছিল।
এখন জানে। রায়ান কার ছেলে। মিতু কার মেয়ে।
কাউকে বলেনি। বলবেও না।
কাগজটা একটা স্টিলের বাটিতে রাখল। লাইটার জ্বালাল।
কাগজ ধরে গেল। কালো হয়ে গুঁড়ো হয়ে গেল। বাতাসে উড়ে গেল একটু।
নিশি ছাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
পেছন থেকে দরজা খুলল। অভিক।
"ঘুমাওনি?"
"আসছি।"
"কী পোড়ালে?"
নিশি ঘুরল।
"পুরনো বিল।"
অভিক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। হয়তো বুঝেছে। হয়তো বুঝতে চায়নি।
নিশি ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করল।
টেবিলে ফোন বাজছে। রায়ান। রাত দুটোয়।
নিশি ধরল। "কী হয়েছে?"
"ম্যাডাম, সরি এত রাতে... কালকের ডেলিভারি রুটটা... মিতু বলছে..."
নিশি চোখ বন্ধ করল। একটা নিঃশ্বাস নিল।
"রায়ান।"
"জি ম্যাডাম।"
"কাল সকালে অফিসে বলবে। এখন ঘুমাও।"
"জি ম্যাডাম। গুড নাইট।"
"গুড নাইট।"
ফোন রাখল।
অভিক বলল, "সব ঠিক আছে?"
নিশি লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।
"না। কিন্তু চলছে।"
"এটাই কি যথেষ্ট?"
অন্ধকারে নিশির গলা শোনা গেল। শান্ত। ক্লান্ত। জেদি।
"আপাতত হ্যাঁ।"
বাইরে মিরপুরের রাস্তায় একটা ট্রাক হর্ন দিল। তারপর সব চুপ।
সমাপ্ত
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।