সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প২-আমার জন্য কিছু রেখো না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
সংসারের সবাইকে দেওয়ার পর নিশির নিজের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। মাসের শেষে অভিক খাতা খুলে বসত। হাতে কলম। একে একে হিসাব নামত—বাড়িভাড়া, বাজার, মেঘের স্কুলের ফি, কোচিংয়ের টাকা, মিশির বই, বিদ্যুৎ বিল। অঙ্কগুলো কিছুতেই মিলত না। তবু অভিক মিলিয়ে নিত। এখান থেকে একটু কমিয়ে, ওখানে একটু বাঁচিয়ে।
নিশি পাশে বসে থাকত। মাঝেমধ্যে আস্তে করে বলত, “এই মাসে মেঘের জুতাটা বদলাতে হবে।” অভিক খাতার দিকে তাকিয়েই বলত, “হ্যাঁ, কিনে দেব।”
নিশি আবার বলত, “মিশির রং শেষ হয়ে গেছে।”
অভিক মাথা নেড়ে বলত, “ওটাও নিয়ে আসব।” সবশেষে হিসাবটা আবার দেখে অভিক জিজ্ঞেস করত,
“তোমার কিছু লাগবে?”
নিশি খুব স্বাভাবিক গলায় বলত,
“আমার তো কিছু দরকার নেই।”
কথাটা এতবার বলা হয়েছে যে, একসময় বাড়ির সবাই ধরে নিল—সত্যিই নিশির কিছু লাগে না।
অথচ একসময় নিশির বই পড়ার খুব শখ ছিল। নতুন শাড়ি কিনলে তার মন ভালো হয়ে যেত। বিকেলে এক কাপ কফি নিয়ে জানালার পাশে চুপচাপ বসে থাকাও ছিল তার নিজের একটা ছোট্ট আনন্দ। এখন কফির দাম দেখলেই সে মনে মনে হিসাব করে—এই টাকায় মিশির দুটো খাতা হয়ে যাবে। একটা শাড়ি পছন্দ হলে ভাবে, আগের শাড়িগুলো তো আছে। একটা বই কিনতে ইচ্ছে হলে ভাবে, এখন না, পরে কিনবে। এভাবেই “পরে” শব্দটা তার জীবনের সবচেয়ে ব্যবহৃত শব্দ হয়ে উঠেছে।
মেঘ বড় হচ্ছে। কলেজে পড়ার স্বপ্ন দেখে। মিশি নাচ শিখতে চায়। অভিকও আগের চেয়ে বেশি সময় কাজ করে। সংসারের খরচ বাড়তে থাকায় নিশি নিজের ছোট অনলাইন কাজটাও একসময় ছেড়ে দিয়েছে। কেউ তাকে ছাড়তে বলেনি। সে নিজেই বলেছিল, “এখন সংসারটাই আগে।” তারপর নিজেকেই বুঝিয়েছে, “পরে আবার শুরু করব।” কিন্তু সেই “পরে” আর আসেনি।
একদিন আলমারি গোছাতে গিয়ে নিশির হাতে তার পুরোনো নীল শাড়িটা এল। অনেক বছর আগে নিজের পছন্দে কিনেছিল। শাড়িটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। শেষ কবে পরেছিল, মনে করতে পারল না। হঠাৎ মনে হলো, আজ শাড়িটা পরবে। তারপরই আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তে হেসে ফেলল। কোথায় যাবে?
কার জন্য সাজবে?
শেষ পর্যন্ত শাড়িটা আবার যত্ন করে ভাঁজ করে তুলে রাখল।
সেদিন রাতে মেঘ হঠাৎ বলল,
“মা, তুমি সারাক্ষণ শুধু আমাদের জন্য করো।”
নিশি হেসে বলল,
“তোমরাই তো আমার সব।”
কথাটা মিথ্যে নয়। কিন্তু কথাটার ভেতরে একটা জায়গা ফাঁকা রয়ে গেল। কয়েক দিন পর এক সন্ধ্যায় অভিক খেয়াল করল,
নিশি জানালার পাশে চুপ করে বসে আছে। সে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
নিশি আগের মতোই বলল, “কিছু না।”
অভিক আর কিছু বলল না। কিন্তু এবার কথাটা তার কানে আটকে রইল।
পরদিন বাজার থেকে ফেরার সময় অভিক একটা ছোট বই নিয়ে এল। খুব দামি কিছু নয়, শুধু একটা বই। নিশির হাতে দিয়ে বলল, “তোমার না বই পড়তে ভালো লাগে?”
নিশি বইটার মলাটে হাত বুলিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“আমার জন্য?” অভিক হেসে বলল, “হ্যাঁ, তোমার জন্য।”
সেদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর নিশি বইটা নিয়ে বারান্দায় বসেছিল। অনেকদিন পর নিজের জন্য কিছু হাতে নিয়ে তার কেমন অদ্ভুত লাগছিল। সে ভাবল, সবাইকে দিতে দিতে সে নিজের কাছেই কত কিছু বাকি রেখেছে—একটা বই, একটা শাড়ি, একটু সময়, একটা নিরিবিলি বিকেল। খুব বড় কিছু নয়। অথচ এই ছোট ছোট জিনিসই মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, সে শুধু কারও মা নয়, কারও স্ত্রী নয়, শুধু সংসারের দায়িত্বও নয়। সে নিজেও একজন মানুষ।
পরদিন সকালেও সংসারের কাজ আগের মতোই চলল। মেঘের টিফিন, মিশির দুধ, অভিকের নাশতা—কিছুই বদলায়নি। শুধু নিশি বইটা রান্নাঘরের কোনো তাকে লুকিয়ে রাখল না। বারান্দার টেবিলের ওপর রেখে দিল। দুপুরে কাজ শেষ হলে সে দশ পৃষ্ঠা পড়বে। দশ পৃষ্ঠা। তার বেশি না হলেও চলবে।
কারণ সেদিন নিশি প্রথমবার বুঝেছিল, সবাইকে সবকিছু দিয়ে দেওয়ার নামই ভালোবাসা নয়। নিজের জন্য সামান্য কিছু রেখে দেওয়াও ভালোবাসার অংশ। হয়তো নিজের প্রতিও।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।