উপন্যাস-ছইয়ের নিচে জীবন
গল্প-৮ -মানুষের চোখে মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৬ জুলাই, ২০২৬
তাদের পরিচয় 'বেদে' নয়, তারাও আমাদের মতোই স্বপ্ন দেখা মানুষ।
আমরা একটা মানুষকে তার নামে চিনি না, চিনি তার গায়ে লাগানো তকমা দিয়ে। এটাই আমাদের সমাজের সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে নিষ্ঠুর বৈষম্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নদী থেকে নদীতে ভেসে বেড়ানো যে মানুষগুলোকে আমরা এক কথায় 'বেদে' বা 'যাযাবর' বলে পাশ কাটিয়ে যাই, তাদের দেখলেই আমাদের মনে এক অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়। অথচ চটের ছাউনির নিচে, মেঠোপথের ধুলোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ওই মানুষগুলোর বুকেও আমাদের মতোই একটা হৃদয় ধুকপুক করে। সেই হৃদয়ে সুখ আছে, কষ্ট আছে, অভিমান আছে, ভালোবাসা আছে, আর আছে আগামীকাল নিয়ে অগাধ স্বপ্ন।
এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীটা আমাদের সমাজে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে অবহেলার শিকার হয়। শহরের চকচকে ফুটপাতে বা গ্রামের কোনো গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে তারা পা রাখলেই চারপাশের চোখগুলো বদলে যায়। সেই চোখে থাকে চাপা তাচ্ছিল্য, অকারণ ভয় আর অবিশ্বাস। তাদের সাপ খেলা দেখতে আমরা ভিড় করি, তাদের হাতের বাঁশির সুরে আমরা রোমাঞ্চ খুঁজি, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাদের প্রাপ্য ন্যূনতম সম্মানটুকু দিতে গেলেই আমাদের হাত গুটিয়ে যায়। শুধু ভিন্নভাবে জন্ম নেওয়ার জন্য, ভিন্নভাবে বাঁচার জন্য সমাজ যে বিচ্ছিন্নতার দেয়াল তাদের উপহার দেয়, সেই আঘাতটা তাদের ক্ষুধার কষ্টের চেয়েও অনেক বেশি গভীর।
আমরা ভুলে যাই, মানুষের জন্মস্থান কখনো তার মেধা বা মনুষ্যত্বের মাপকাঠি হতে পারে না। নদীর ওপর নৌকা বেঁধে বড় হওয়া শিশুটিও রাতের আকাশে তারার দিকে তাকিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার অধিকার রাখে। কিন্তু যখন আমরা শুরুতেই তার গায়ে 'বেদের ছেলে' বলে একটা সিলমোহর মেরে দিই, তখন তার সেই নরম স্বপ্নগুলো ডানা মেলার আগেই ভেঙে যায়। এই মানসিকতা শুধু একটি গোষ্ঠীকে পিছিয়ে দেয় না, আমাদের পুরো সভ্যতাকেই ছোট করে দেয়।
সমাধানটা আসলে এক জায়গায় নয়, দুটো জায়গায় একসাথে করতে হবে।
প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন নদীর বুকে ভাসতে থাকা প্রতিটি শিশু স্কুলে যেতে পারে। তাদের জন্য ভ্রাম্যমাণ স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক, এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের পৈতৃক পেশা সাপ খেলা বা কবিরাজির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে হস্তশিল্প, নৌকা তৈরি বা অন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিলে তারা সম্মানের সাথে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে জরুরি হলো, আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আইন দিয়ে ঘর দেওয়া যায়, কিন্তু মনের দরজা খুলে দেওয়া যায় না। যতদিন আমরা তাদের 'অন্য' ভাবব, ততদিন কোনো প্রকল্পই কাজে আসবে না। আমাদের শিখতে হবে, একজন মানুষের পরিচয় তার পেশায় নয়, তার মনুষ্যত্বে।
মানবিকতার আসল পরীক্ষা চেনা মানুষকে সম্মান করার মধ্যে নয়। পরীক্ষা হলো, সমাজের এক কোণে পড়ে থাকা অচেনা মানুষটাকে কৌতূহল দিয়ে নয়, মমতা দিয়ে বুকে টেনে নিতে পারছি কি না। যেদিন আমরা সাপের বাঁশি আর জীর্ণ নৌকার আড়ালে থাকা মানুষটাকে দেখতে পাব, সেদিনই আমাদের সমাজটা সত্যিকার অর্থে সুন্দর হবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।