উপন্যাসঃ-ছইয়ের নিচে জীবন
গল্প-৭ -সন্ধ্যার আগুন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৬ জুলাই, ২০২৬
সূর্য ডোবার পর ছোট্ট আগুন ঘিরে যে গল্প শুরু হয়, তা কোনো বইয়ে লেখা থাকে না।
গোধূলির লালচে আলো যখন পদ্মার বুকে মিশে যেতে শুরু করে, তখনই নদীতীরের বাতাসটা হু হু করে ওঠে। হিমেল হাওয়া ছই তোলা কাঠের নৌকার ফাঁকফোকর গলিয়ে শরীর ছুঁয়ে গেলে বেদে বহরের ঘাটজুড়ে নেমে আসে রাতের নীরবতা। সারাদিনের ধুলো, মাইলের পর মাইল হাঁটার ক্লান্তি আর ঘরে ঘরে ঘুরে পাওয়া অবহেলার গ্লানি মুছে দেয় এই সময়টা। পশ্চিম আকাশের শেষ আলোটুকু হারিয়ে গেলে চরের বালুর ওপর জ্বলে ওঠে ছোট্ট এক টুকরো আগুন। কাসেম বহরদার শুকনো ডালপালা আর কাঠের টুকরো কুড়িয়ে এনে উনুনের স্ফুলিঙ্গ দিয়ে যে আগুন জ্বালান, সেই সামান্য উত্তাপটুকুই মুছে দেয় সারাদিনের হাহাকার।
শহরের দালানে ড্রয়িংরুমের ঝলমলে বাতি কিংবা দামি সোফার আরাম যা দিতে পারে না, নদীর চরে জ্বলা এই কাঠের আগুনের কুণ্ডলী যেন তাই পরম নিশ্চিন্তে এনে দেয়। সারাদিন যে যার মতো ডাঙায় ছড়িয়ে থাকা মানুষগুলো সন্ধ্যার পর এক এক করে ফিরে আসে বহরের আস্তানায়।
আগুন ঘিরে সবাই গোল হয়ে বসে। কারও হাতে চা ভর্তি অ্যালুমিনিয়ামের মগ, কেউ ছাইয়ের ওপর রুটি সেঁকছে কিংবা ভাতের জোগাড় করছে। আগুনের লালচে ছায়া যখন তামাটে মুখগুলোর ওপর পড়ে, তখন ফুটে ওঠে এক পরম শান্তি আর আপনত্বের আবহ। সেখানে কোনো ভেদাভেদ নেই, নেই কোনো সামাজিক কৃত্রিমতার দেয়াল।
আগুন যত তীব্র হয়, তত জমে ওঠে গল্পের আসর। প্রবীণদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে কত অজানা কিচ্ছা — নদীর গভীরে ভেসে থাকা জলপরীদের গল্প, কালনাগিনী সাপের রহস্য, কিংবা কোনো ঝড়ের রাতে কীভাবে পুরো বহর নদী পার হয়েছিল সেই রোমাঞ্চকর বিবরণ। কখনো কেউ কাঠের টুকরোয় টোকা দিয়ে মৃদু সুরে গেয়ে ওঠে ভাটিয়ালি — "নদী এক কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা..."। কাঠের আগুনের চটচট শব্দ আর নদীর টলটলে জলের মৃদু ঢেউ মিলে তৈরি হয় এক অপার্থিব সুর। বাচ্চারা বড়দের ঘেঁষে বসে চোখ বড় বড় করে সেই গল্প শোনে আর আনন্দে হেসে ওঠে।
বেদেদের এই সন্ধ্যার দৃশ্য আমাদের এক গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জীবনের আসল সুখ কোনো বিশাল প্রাচুর্য কিংবা অগাধ অর্থের মধ্যে আটকে থাকে না। আধুনিক মানুষ যখন সুখের খোঁজে সারাজীবন দৌড়ে বেড়ায়, সব পেয়েও অতৃপ্তিতে ভোগে, তখন এই নদীর পাড়ের মানুষগুলো সামান্য চাল-ডাল আর একটু উনুনের আগুন ঘিরেই পেয়ে যায় জগতের সবচেয়ে বড় আনন্দ। অল্পে সন্তুষ্ট থাকার এই শিক্ষা কোনো পাঠ্যবই কিংবা বিলাসবহুল সেমিনারে শেখানো যায় না। তা আসে জীবনকে কাছ থেকে চেনার মধ্য দিয়ে, প্রকৃতিকে ভালোবেসে সহজভাবে বাঁচার অভ্যাস থেকে।
সবকিছুর মূলে যে জিনিসটা মায়ায় টিকে থাকে, তা হলো পরিবারের বন্ধন। শত অভাব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর সমাজের তাচ্ছিল্য সত্ত্বেও তারা যে প্রতিদিন নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ায়, তার মূল শক্তি হলো সন্ধ্যার এই একসঙ্গে হওয়ার মুহূর্তটুকু। দিনের শেষে ঘরের মানুষগুলো যখন একসঙ্গে বসে, হাত বাড়িয়ে পরস্পরের দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেয়, তখন যেকোনো বৈরী পরিস্থিতি জয় করার মতো মনের জোর তারা পেয়ে যায়। এই সন্ধ্যার আগুন কেবল শীত বা অন্ধকার কাটায় না, তাদের হৃদয়ের ভেতরের সম্পর্কগুলোকে বছরের পর বছর ভালোবাসার তাপে সজীব রাখে।
রাত বাড়ে, উনুনের আগুন আস্তে আস্তে নিভে এসে লাল ছাই হয়ে যায়। তবে সেই নিভে যাওয়া আগুনের উষ্ণতা আর হাসিমুখের স্মৃতিগুলো বহরের মানুষের বুকের ভেতর থেকে যায় আগের মতোই সজীব হয়ে। যা তাদের পরদিন সকালের নতুন এক অনিশ্চিত লড়াইয়ে বেঁচে থাকার সাহস জোগায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।