অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ৬: যে কথাগুলো শুধু ছেলেটা শুনত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
মা, তুমি ওনাকে দেখছ না?
চার বছরের রুদ্র ড্রয়িংরুমের কোণার বেতের চেয়ারটার দিকে আঙুল তুলল। চেয়ারের হাতলে বিকেলের রোদ পড়ে চকচক করছে। পুরোনো চেয়ারটা মায়ের বিয়ের সময় এসেছিল বলে মনে করা হয়।
নিশি সবজি কাটা থামিয়ে ঘুরে তাকাল। খালি চেয়ার। পাশে টি টেবিলে গতকালের পেপার পড়ে আছে।
সে হাসল, কোথায় সোনা? কেউ তো নেই। তোমার নতুন গাড়ি এসেছে বুঝি?
রুদ্র কপাল কুঁচকাল। অবাক। যেন নিশি ইচ্ছে করে দুষ্টুমি করছে।
এই তো। বসে আছেন। নীল পাঞ্জাবি পরা। তোমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। বলছেন, তোমার হাতে কেটে যাবে, সাবধানে। বটিটা ধার।
নিশির বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। ওর বাঁ হাতের তর্জনীতে তখনই বটির আগা লেগেছে। এক ফোঁটা রক্ত টেবিলের উপর পড়ল। টমেটোর লাল রঙের সাথে মিশে গেল।
ও তাড়াতাড়ি বলল, ইমাজিনারি ফ্রেন্ড। বাচ্চাদের থাকে। আমার ছোটবেলায়ও ছিল পুতুলের নাম রেখেছিলাম টুনি।
কিন্তু রাতে অভিককে বলার সময় গলাটা কেঁপে গেল। কাঁচের গ্লাসে পানি খেতে গিয়ে দাঁত লেগে গেল।
মাস গেল। ‘ইমাজিনারি ফ্রেন্ড’ গেল না।
রুদ্র দুপুরে একা একা লেগো দিয়ে বাড়ি বানায়। প্লাস্টিকের লাল ইট, নীল ছাদ। হঠাৎ কাজ থামিয়ে মাথা কাত করে। যেন কেউ কানে কানে নামতা বোঝাচ্ছে। তারপর মাথা নেড়ে বলে, আচ্ছা। বুঝেছি। বলে দেব। আমি মনে রাখব।
অভিক একদিন পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। শেভিং ক্রিমের গন্ধ।
কাকে বলে দিবি রে ব্যাটা? পাশের বাসার টিটুকে?
রুদ্র না ঘুরেই বলল, উনাকে।
উনি কে?
রুদ্র লেগোর লাল টুকরোটা হাতে নিয়ে বলল, উনি বলেন, তোমরা বড়রা দেখতে পাও না। শুধু ছোটরা পায়। কারণ ছোটদের চোখে ময়লা কম। টিভি দেখো না তো।
অভিক হো হো করে হাসল। কিন্তু রাতে নিশিকে বলল, ছেলেটা কেমন অদ্ভুত কথা বলে, না? আমার দাদুও বলতেন, বাচ্চারা জিন দেখে।
নিশি উত্তর দিল না। ওর মনে পড়ল, দুপুরে রুদ্র বলেছিল, মা, উনি বলছেন আজ বাইরে যেও না। বৃষ্টি হবে। রিকশা পাবে না। আকাশ পরিষ্কার ছিল। সাদা তুলার মতো মেঘ। তবু নিশি ব্যাগে ছাতা নিয়েছিল। বিকেলে কলাবাগান, ধানমন্ডি ২৭ ভেসে গেছে। সিএনজির ভেতর পানি ঢুকেছে।
রুদ্রের ছয় বছর।
স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা রেখেই সে ঘরে ঢোকে। দরজা ভেজিয়ে দেয়। ভেতর থেকে ফিসফাস। একা একা হাসি। কখনো আবার গম্ভীর গলা, তুমি ভুল করছ।
রাতে খাওয়ার সময় নিশি দেখল, রুদ্র তার প্লেটের পাশে এক ইঞ্চি জায়গা ফাঁকা রাখে। ভাত মাখতে মাখতে ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি মাছ খাবে না? আচ্ছা। শুধু ডাল নাও। আলু ভর্তা দিই?
নিশি আর পারল না। রাতে অভিকের বুকে মাথা রেখে বলল, আমার ভয় লাগে অভিক। ও যদি… যদি মায়ের মতো হয়?
অভিক ওকে থামিয়ে দিল। কপালে হাত বুলিয়ে দিল। কালই ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিচ্ছি। আমার বন্ধু আছে মিতালি।
ডা. তানিয়া রহমান। চাইল্ড সাইকিয়াট্রিস্ট। চেম্বার গ্রিন রোডের একটা পুরোনো বিল্ডিংয়ের তিন তলায়।
তিনি তিন সপ্তাহ রুদ্রের সাথে খেললেন। ছবি আঁকালেন। পাপেট শো করলেন। রঙিন বল দিলেন। রুদ্র ‘উনার’ কথা বলল। বলল, উনি রাতে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। হাত ঠান্ডা। বলেন, ভয় পাস না। আমি আছি। অঙ্কে ভুল হলে ঠিক করে দেন।
শেষ সেশনে ডাক্তার আমাদের ডাকলেন। তার টেবিলে একটা ছোট ক্যাকটাস।
দেখুন, ৯০ শতাংশ বাচ্চার ইমাজিনারি ফ্রেন্ড থাকে বলে কিছু রিসার্চ বলে। ৭ বছর বয়সের মধ্যে চলে যায় সাধারণত। এটা হেলদি হতে পারে। বাচ্চারা এভাবে স্ট্রেস কপ করে, একাকিত্ব কাটায়। সামাজিক স্কিল শেখে। ভয়ের কিছু নেই।
তিনি থামলেন। চশমাটা খুলে মুছলেন। তারপর নরম গলায় বললেন, কিন্তু যদি এই ‘বন্ধু’ ওকে ঘুমাতে না দেয়, স্কুলে যেতে বারণ করে, বা বিপজ্জনক কিছু করতে বলে, ছাদে উঠতে বলে, তখন আমরা ইন্টারভেন করব। ওষুধ না, বিহেভিয়ারাল থেরাপি। এখন শুধু অবজার্ভ করুন। ওকে জাজ করবেন না। বকবেন না। বলবেন, তোমার বন্ধুর কথা শুনতে ভালো লাগে। আমার বন্ধুর নাম ছিল মিতু। ও যেন ভয় না পায়। যেন লুকিয়ে না রাখে।
বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে কেউ কথা বলল না। রুদ্র জানালা দিয়ে বাইরে দেখছিল। হঠাৎ বলল, ডাক্তার আন্টি ভালো। কিন্তু উনি বলেন, আন্টি সব জানে না। আন্টির বাসার বিড়ালটার নাম পুশি।
আমার স্টিয়ারিং ধরা হাতটা কেঁপে গেল। গাড়িটা একটু বাঁক নিল।
এরপর আমরা নিয়ম মানলাম। বকা না। উড়িয়ে দেওয়া না।
রুদ্র বলত, উনি আজ রাগ। আমি হোমওয়ার্ক করিনি বলে। অঙ্ক ভুল করেছি।
নিশি বলত, ওনাকে বলো, রুদ্র এখনই করবে। সরি বলবে। চকলেট দেবে।
রুদ্র বলত, উনি দুই দিন আসেননি। ওনার শরীর খারাপ। জ্বর।
আমি বলতাম, ওনার জন্য দোয়া করি আমরা। স্যুপ খেতে বলো।
থেরাপি চলল। ছয় মাস। রুদ্র স্বাভাবিক। স্কুলে ফার্স্ট হয় মাঝে মাঝে। বন্ধু আছে, নাম সামি। হাসে, খেলে। ইউটিউবে কার্টুন দেখে। শুধু রাতে ঘুমানোর সময় বিছানার এক কোণে হাত বুলিয়ে বলে, এখানে শোও। গল্প বলো। কালকেরটা। আজ রাক্ষসের গল্প না।
আমরা ভাবলাম, আমরা জিতে গেছি। ‘উনি’ এখন শুধু ঘুমপাড়ানি গল্প। হার্মলেস।
এক বিকেল। শনিবার।
আমি অফিসে। একটা প্রেজেন্টেশন করছি। নিশি বাসায়। রুদ্র ডাইনিং টেবিলে আঁকছে। মোম রং। একটা নদী, একটা নৌকা, একটা লাল ডায়েরি। পানিতে হাঁস।
হঠাৎ রুদ্র রং থামিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। চোখ স্থির। বড়দের মতো। চশমা পরলে যেমন দেখায়।
মা…
বলো বাবা। নিশি সবজি কাটছে।
উনি বলছেন, তুমি ক্লাস নাইনে থাকতে একটা লাল ডায়েরি লুকিয়ে রেখেছিলে। বাবার বাড়ির কাঠের আলমারির তিন নম্বর তাকের নিচে, পেছনের কাঠ খুলে। ওখানে তুমি ‘শুভ্র’ নামের ছেলেটাকে চিঠি লিখতে। কাউকে বলোনি। রাত জেগে লিখতে।
নিশির হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল। ঝনঝন। গরম চা ছলকে পায়ে পড়ল, ও টের পেল না। ফোস্কা পড়ল।
লাল ডায়েরি। শুভ্র। প্রথম প্রেম। ভিকারুননিসায় পড়ত। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল এইচএসসির আগে, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। ডায়েরিটা নিশি কারও সামনে বের করেনি। অভিকও জানে না। পাতায় পাতায় কবিতা। ডায়েরিটা এখনো ওখানেই আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর ওই আলমারি খোলা হয়নি দশ বছর। তালা দেওয়া। চাবি হারিয়ে গেছে।
রুদ্র আবার আঁকায় মন দিল। যেন সে দোকানের লিস্ট বলেছে। ডাল, চাল, তেল, পেঁয়াজ। নদীতে ঢেউ আঁকছে।
নিশি টলতে টলতে চেয়ার ধরল। তার বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটাচ্ছে। ঠান্ডা স্রোত নামছে শিরদাঁড়া দিয়ে। ঘামে জামা ভিজে গেছে।
সে ছেলের মাথায় হাত রাখল। রুদ্র স্বাভাবিক। গুনগুন করছে। টুম্পা সোনা।
নিশির মাথায় একটাই প্রশ্ন। একটাই।
এই কথাটা রুদ্র জানল কীভাবে? আলমারির কথা, তাকের কথা, শুভ্রর নাম।
ফোন করল আমাকে। গলা কাঁপছে। কান্না চাপা। অভিক, তুমি এখনই বাসায় আসো। এখনই। গাড়ি নিয়ে।
আমি আসছি। মিটিং ফেলে। গাড়ি চালাচ্ছি। কিন্তু আমার হাত কাঁপছে। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছি।
কারণ আমি জানি, আমি বাসায় গিয়ে রুদ্রকে কী জিজ্ঞেস করব।
আর আমি ভয় পাচ্ছি, রুদ্র উত্তরে কী বলবে। কীভাবে বলবে।
(চলবে… গল্প ৭: পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটা)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।